দরিদ্রতাকে জয় করে রিপনের কলেজে ভর্তি হওয়ার গল্প

দরিদ্রতাকে জয় করে রিপনের কলেজে ভর্তি হওয়ার গল্প

অদম্য ইচ্ছা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় অবশেষে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলেন রিপন হোসেন। রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ মহা. হবিবুর রহমানের সহায়তায় এটি তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। তবে এ কলেজে ভর্তি হওয়ার পেছনে তার রয়েছে এক অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প।

কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাতে টানা এক বছর ইট ভাটায় কাজ করেন রিপন হোসেন। রাতদিন খেটে ৩০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রচণ্ড শীতে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পরলে অপারেশন বাবদ ১৫ হাজার টাকা চলে যায়।

অপারেশনের পর দীর্ঘ বিশ্রাম নিতে হয় তাকে। বাকি টাকা সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। শেষে বন্ধুদের সহায়তায় গ্রামের একটি কলেজে ভর্তি হন রিপন। কিন্তু বইপত্র কেনার টাকা না থাকায় নিজে থেকেই কলেজে যাওয়া বাদ দেন।

গত বছর অনলাইন আবেদন করে রাজশাহী কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়। কিন্তু ফি জমা দিতে না পারায় ভর্তি হতে পারেনি সে। এরপর শুরু হয় ভর্তি এবং রাজশাহীতে থাকা-খাওয়ার টাকা জোগাড়ের মিশন।

দ্বিতীয় দফায় রাজশাহী কলেজে ভর্তি হওয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। নানা প্রচেষ্টায় এক বছরেও কলেজে ভর্তির টাকা জোগাড় করতে পারেননি। এর মধ্যে দ্বিতীয় দফায় রাজশাহী কলেজে তার বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির সুযোগ হয়।

কিন্তু টাকা না থাকায় ভর্তি হতে পারছিল না রিপন। পরে একই উপজেলার কয়লাবাড়ির বাসিন্দা ও রাজশাহী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন মোল্লা তাকে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

পরে ওই শিক্ষকরে কথা মতো রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ  ‍মুহা. হবিবুর রহমানের সাথে দেখা করলে তাকে ভর্তির ‍সুযোগ করে দেন।

জানা গেছে, রিপনের গ্রামের বাড়ি  মান্দা উপজেলার কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের আন্দারিয়াপাড়ায়। তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে ঢাকায় যখন চলে যান তখন তার বয়স তিন বছর। বাবা হারা হয়ে বেড়ে উঠেছেন রিপন।

পরে রিপন দাদা কলিম উদ্দিন প্রামাণিকের আশ্রয়ে বেড়ে উঠেন। বসতভিটা ছাড়া কোনো সম্পত্তি নেই তাদের। বৃদ্ধ বয়সে কাজ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন তার দাদা। অবশেষে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে দাদাকে হারান রিপন।

ছোটবেলা থেকে রিপনের লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। ২০১৯ সালে নওগাঁর মান্দা উপজেলার চকউলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে সে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পায় সে।  ইংরেজিতে পাঁচ নম্বর কম পাওয়ায় গোল্ডেন এ-প্লাস ছুটে যায় তার। অষ্টম শ্রেণিতে একই বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পায় সে।

রিপন বলেন, ‘আমি তৃতীয় শ্রণিতে পড়ার সময় ইটভাটায় কাজ শুরু করি। টানা ছয় বছর কাজ করেছি ইটভাটায়। এই ভাটায় কাজ করে কলেজে ভর্তির টাকা জমিয়েছি। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই টাকা চিকিৎসায় ও এবং সংসারে খরচ হয়ে যায়।’

‘তবে অবশেষে কলেজে ভর্তি হতে পেরে আমি আনন্দিত। স্যারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি পড়াশুণা শেষ করে একজন ব্যাংকার হতে চাই’, যোগ করেন রিপন।

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ জানান, ছেলেটির অদম্য আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে তার জীবন থেকে মূল্যবান একটি বছর হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এবারও যদি সাহস করে কলেজে না আসতো তাহলে সে ভর্তি হতে পারতো না। আগামীতে তার পাশে থাকবে রাজশাহী কলেজ।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ