আলীম এখন হাসতে পারেন

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আব্দুল আলীম পড়ালেখার খরচ জোগান শরবত ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার বানিয়ে বিক্রি করে। এখন সাহায্য করছেন নিজের পরিবারকেও। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন অনি আতিকুর রহমান।

টানাপড়েনের সঙ্গে পরিচয় শিশুকালেই। বাবার জীবনযুদ্ধ দেখে ছোটবেলায়াই ‘বড় কিছু’ হওয়ার স্বপ্ন জাগে মনে। কিন্তু ‘কী’ হবেন সেটা জানতেন না নিজেও। মেধাবী হওয়ায় কষ্টের মধ্যেও চালাতে থাকেন পড়াশোনা। একপর্যায়ে ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসজীবনে এসে আবিষ্কার করলেন পড়ালেখার খরচ মেটানোই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।

ইংরেজি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল আলীম। আলীম ক্যাম্পাসে এসেই শেখা শুরু করেন একাধিক ভাষা এবং পড়তে থাকেন বিশ্বসেরা সব উদ্যোক্তার গল্প। তিনি জানান, এ পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে এ ধরনের ৪০টির মতো বই পড়ে ফেলেছেন। কর্নেল স্যান্ডার্স, স্টিভ জবস, কার্লস হেলু, ল্যারি এলিসন, চার্লস কথ, ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস, জেফ বেজোস, মাইকেল ব্লুমবার্গ, জ্যাক মা, মার্ক জাকারবার্গদের দেখে অনুপ্রাণিত হন। পড়তে ভালোবাসেন ডেল কার্নেগি, পিটার থিয়েল, রবার্ট কিয়োসাকি, মুনির হাসানদের বই।

ভাবতে থাকেন—কিভাবে ছাত্রাবস্থায়ই নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায়? শুরুতেই পার্শ্ববর্তী এলাকায় শুরু করেন টিউশনি। মফস্বল এলাকা; সম্মানী সীমিত। কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। বিকল্প কিছু করার চিন্তা করতে থাকলেন। একসময় নিজেই বাতলে ফেললেন সেই পথ।

নিজের ফাস্ট ফুড ও শরবতের দোকানে আলিম

 

তখন গরমকাল। লজ্জা আর সংশয়কে দূরে ঠেলে শুরু করলেন শরবত বিক্রির কাজ। বড় দুই বোনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে শুরু হলো স্বপ্ন বুননের প্রাথমিক কাজ।

শিক্ষার্থী ও খুদে ব্যবসায়ী আলীম নিজের সময়গুলো ভাগ করে নিলেন দুই ভাগে। দিনের বেলা ক্লাস-পরীক্ষা আর বিকেল থেকে শুরু করেন ‘উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের আয়োজন। নানা স্বাদের শবরত আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশনের সুবাদে দ্রুতই ক্যাম্পাসে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় আলীমের ‘এএফসি’ (আলিম ফুড কর্নার)।

২০১৮ সালের ২২ মার্চ শুরু হয় আব্দুল আলীমের ব্যবসার যাত্রা। শুরুর দিকে কষ্ট এতটাই ছিল যে তার চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যেত। চাপা ভাঙা, চোখ দুটো গর্তে ঢোকানো। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে জানালেন, ‘ক্যাম্পাসজীবনে তিন দিন না খেয়ে ছিলাম। ২০১৮ সালে দুদিন এবং ২০১৯ সালে এক দিন। কিন্তু এখন অনেক ভালো আছি।’

পুরোটা গ্রীষ্ম চলল জুস আর শরবতের ব্যবসা। কিন্তু সময় তো আর থেমে থাকবে না। গ্রীষ্ম পেরিয়ে আসে শীত। এরই মধ্যে জুসের ব্যবসা থেকে বোনদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ পরিশোধ শেষে দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন নিজের পুঁজি।

সময়ের পরিবর্তনে আলীমও ভিন্নতা নিয়ে আসেন তাঁর খাবারে। জুসের টেবিলে তোলেন নিজের তৈরি ফাস্ট ফুড আইটেম।

এগিয়ে চলার পথে তথ্য-প্রযুক্তিকেই ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ মনে করেন আলীম। নিত্যনতুন রেসিপিও যেমন অনলাইনেই শেখেন; তেমনি পণ্যের বিজ্ঞাপনও দেন ফেসবুকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকেও আলীমের রেসিপির স্বাদ নিতে ক্যাম্পাসে আসেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাজমুল হক জানান, ‘ক্যাম্পাসে তেমন ফাস্ট ফুড আইটেম পাওয়া যায় না। কোনো বন্ধু ঘুরতে এলে তাকে একটু ভালো আপ্যায়ন করতে চাইলে ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হতো। কিন্তু এখন আলীম ভাইয়ের কাছেই সেটা পাই। খাবারগুলোও বেশ পরিচ্ছন্ন ও সুস্বাদু।’

আলীমের শিক্ষক ও ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম শোয়েব। তিনি মাঝেমধ্যেই স্বাদ নেন ছাত্রের তৈরি রেসিপির। উত্সাহ ও সাহস দেন কাজটি এগিয়ে নেওয়ার। তিনি বলেন, ‘ছাত্রাবস্থায় জড়তা আর লজ্জার কারণে অনেকেই যা করার সাহস করতে পারে না, আলীম তা করে চলেছে। দরিদ্র পরিবারের বহু শিক্ষার্থীর প্রেরণা হতে পারে তার এই গল্প।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্রিকেট মাঠ ঘেঁষে জিয়া হল মোড়ের এক কোণে দুটি টেবিল নিয়ে স্বপ্ন বুনতে বসেন আব্দুল আলীম। যে সময়টায় বন্ধুরা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরা আড্ডা কিংবা খেলাধুলায় ব্যস্ত; তখন জীবনযুদ্ধে লড়ে চলেন আব্দুল আলীম। নিজেই যেহেতু রেসিপি তৈরি ও রান্নার কাজ করেন; তাই প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু তাতে ক্লান্তি নেই তাঁর। জানালেন, ‘কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। অন্যরা খেলে যে আনন্দ পায়; আমি সম্ভবত কাজের মধ্যেই সেই আনন্দ খুঁজে পাই।’ পরিশ্রমের ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। এখন অভাব ঘুচেছে তাঁর। নিজে স্বাচ্ছন্দ্যে চলার পাশাপাশি মা-বাবাকেও পাঠাতে পারেন খরচ।

বন্ধুদের সঙ্গে

 

আলীমের বাড়ি বগুড়ার ধুনটে। স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়েছেন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকেই। বাবা খোরশেদ আলী একজন কৃষক। তবে মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ব্যবসাও করেন। মা মাহেলা খাতুন গৃহিণী। তিন বোনের সবাই বিবাহিত।

আব্দুল আলীম বলেন, ‘আমি স্বাধীনচেতা মানুষ। আমার ইচ্ছা কারো অধীনে চাকরি করব না; বরং আমিই কাউকে চাকরি দেব।’ আলীমের জিদ কিছুটা বাস্তবায়ন হয়েছে। তাঁর দোকানে এখন দুজন কাজ পেয়েছেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘দুজন তো আছেই। আরো একজন শিগগিরই নিয়োগ দেব।’

নিজের ব্যবসা নিয়ে হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে লেখাপড়াও থেমে নেই আলীমের। ফার্স্ট ক্লাসসহ নিজেকে ধরে রেখেছেন সেরা পাঁচে। জ্ঞানার্জন আলীমের আরেক নেশা। বিজ্ঞান কল্প কাহিনি দারুণ পছন্দ। এ ছাড়া ভাষা শিক্ষা তাঁর আরেকটি আগ্রহের বিষয়। বললেন, ‘গুগল ও ইউটিউবের কল্যাণে আমি ইংরেজি, চীনা, জাপানিজ, কোরিয়ান, মালয়েশিয়ান, হিন্দি, উর্দুসহ প্রায় সাত-আট ভাষায় প্রাথমিক ভাব বিনিময় করতে পারি। এই শেখাটা এখনো চলমান আছে।’

আরো বললেন, ‘আমার কোনো শত্রু নেই। আমাকে সবাই সহযোগিতা করেন। শিক্ষক-বন্ধু-পরিবার সবাই। ক্যাম্পাসে এ কাজের শুরুতে দু-একজন একটু-একটু কথা বললেও এখন সবাই অনুপ্রেরণা দেন। দোকানে এসে কেউ কেউ আবার মামা বলে ডাকে। শুরুতে একটু কষ্ট পেতাম। কিন্তু পরে ভাবলাম, ওরা তো আর আমাকে চেনে না। অবশ্য পরিচিতজনরা যখন বলে দেয় যে আমিও তাদের মতোই শিক্ষার্থী, তখন স্যরি বলে। তাদের আমার প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়। কেউ আমার দোকানে বাকি নেন না। অনেক সময় আমি বিল নিতে ভুলে গেলেও তাঁরাই দিয়ে যান।

রবার্ট কিয়োসাকির ‘রিচ ড্যাড পোর ড্যাড’ পড়ে সবচেয়ে বেশি উত্সাহিত হয়েছেন আলীম। জানালেন, ‘সেখানে ধনী বাবা আর গরিব বাবাদের যে তত্ত্ব কিয়োসাকি দিয়েছেন, তা-ই মূলত আকর্ষণ করে আমাকে। আমি ধনী বাবার সন্তানের তত্ত্বকেই গ্রহণ করেছি। এ ক্ষেত্রে ধনী বাবা হলেন তিনি, যিনি সন্তানকে নিজে কিছু করার পরামর্শ দেন। বলেন, নিজে কারো অধীনে কাজ না করে তার চেয়ে মেধাবীদের চাকরি দিতে।’ মুনির হাসানের ‘শরবতে বাজিমাত’-এর তিন বন্ধুর গল্পও তাঁকে দারুণ অনুপ্রাণিত করে।

ভবিষ্যতেও ব্যবসার সঙ্গেই থাকতে চান আব্দুল আলীম। জানালেন, ‘চাকরি করার ইচ্ছা নেই। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে ‘ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রো’ (খাদ্য ও কৃষি) সেক্টরে থাকতে চাই। নিজ এলাকায় থিতু হওয়ার প্রবল ইচ্ছা আমার। সুযোগ পেলে সেখানেই নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই।’

আলীম নিজের মানবিক উদ্দেশ্যের কথাও জানান। ‘আমি নিজে অনেক কষ্ট করেছি। ফলে এটা খুব ভালো করে জানি। এ জন্য আমার খারাপ সময়গুলোতে যেমন সবাই পাশে দাঁড়িয়েছেন; তেমনি আমিও আমার মেধা ও অর্থ দিয়ে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

পেশাটা নিয়ে কোনো লজ্জা বা সংশয় কাজ করে কি না জানতে চাইলে আলীম বলেন, ‘আমি আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভোর। আমি এগুলোর কোনো তোয়াক্কাই করি না। বরং এটি আমার সাহস ও গর্বের জায়গা, কারণ আমি কিছু একটা করছি।

কী কী পাওয়া যায় আব্দুল আলীমের দোকানে : শীতকালে ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবারের মধ্যে পাওয়া যায়—নুডলস, চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চপ প্রভৃতি। আর গরমকালে বিভিন্ন ফলের রস, শরবত ও লাচ্ছি। ছোট ব্যবসা হলেও আয় ছোটখাটো চাকরির চেয়ে কম নয়। এককথায় জানালেন, রোজগার দিয়ে ভালো আছেন তিনি। এখন প্রাণখুলে হাসতে পারেন, বুকভরে শ্বাস নিতে পারেন। স্বপ্ন দেখতে পারেন আকাশ ছোঁয়ার। (সূত্র: কালের কণ্ঠ)


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ