এক চোখ তোলার পর আরেকটা ভিক্ষা চেয়েছিলাম, পাইনি

সুন্দর গড়ন, সাড়ে ৫ ফিট উচ্চতা আর লম্বা ঘনকালো চুলের সাথে কালো চশমায় দেখতে বেশ মানানসই গোলাম কিবরিয়া। কথায় কাজে সাধারণ মানুষের মতই চালচলন। কিন্তু হঠাৎ হাতে থাকা সাদা স্টিকটা বড় করে সামনে হাতিয়ে হাটতে শুরু করলেন। নিমিষেই সুন্দর মানুষটার সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা দৃশ্যমান হয়ে গেলো। মনে হলো, এত সুন্দর মানুষটা হয়তো নিজের সৌন্দর্য কখনো দেখার সুযোগ পাননি। এর চেয়ে কষ্টের আর কি'বা হতে পারে!

গোলাম কিবরিয়ার অনুভূতিটা জানার ইচ্ছে হচ্ছিলো খুব। পরিচয় দেওয়ার পর প্রথমেই প্রতিবন্ধী হওয়ার সময়কার জানতে চাইলাম। সঙ্গে সঙ্গেই বলে ফেললেন ২০১৬ সালে ২১ জুলাই। ধারণার বিপরীত কিছু শুনতে পেয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে আপনি জন্মান্ধ নয়? এরপর যা শুনলাম, সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা তো হবেই।

বাকিটা গোলাম কিবরিয়ার মুখ থেকেই শোনা যাক— ২০১৬ সালের ২০ জুলাই রাতের ঘটনা। আমি তখন ঢাকার তামিরুল মিল্লাত থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই। পাশাপাশি দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। একদিন রাতে নিজের কাজকর্ম সেরে বাসায় ফেরার সময় কয়েকজন মিলে আমাকে একটি মাইক্রোতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আমাদের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে মারধর শুরু করেন। মারধরকারীরা সম্পর্কে আমার চাচা এবং চাচাতো ভাইসহ বেশ কয়েকজন ভাড়াটে লোক। তাদের মধ্যে কেউ একজনকে ছেলেপেলে দিয়ে মারধর করার অভিযোগেই সারারাত নির্মমভাবে মারধর করা হয় আমাকে।

একপর্যায়ে আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছিলো। ওরা আমাকে মারধর করে ক্লান্ত হলে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আবার মারধর শুরু করে। এভাবে সারারাত মারধরের পর চোখ তুলে নেয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর যথারীতি আমার একটি চোখ তুলেও ফেলেন তারা। চোখটা যখন তাদের হাতে। আমি তখন ভীষণ যন্ত্রণা নিয়েও তাদের কাছে আরেকটা চোখ ভিক্ষা চাইতে লাগলাম। বললাম, চাচা প্রয়োজনে মেরে ফেলেন আমাকে। না হয় আমার অন্তত একটা চোখ ভিক্ষা দিন। অথচ আমার আত্মীয় নামের আত্ময়ীদের মনে একটুও মায়ার উদয় হলো না। বাকী চোখটাও ছুরি মেরে বের করে ফেললেন তারা।

এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আমাকে সেখানেই রেখে চলে যান তারা। পুলিশের কাছে ছিনতাইকারী হিসেবে আমাকে তুলে দেওয়া হয়। আমার শরীরে যত ক্ষত আছে সবি নাকি গণপিটুনির অংশ। আমার তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও হারিয়ে গিয়েছিলো।

এটাই ছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়ার চোখ হারানোর গল্প। কত নির্মম! কত নৃশংস! সেটা হয়তো মুখের ভাষায় প্রকাশ করার মত না। গোলাম কিবরিয়ার চেহারাতেই সেই ভয়াবহতার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিলো। এখানেই শেষ নয়। এরপরেই চলতে থাকে উপর মহলের ইন্ধনে আদালত আর কারাগারের হয়রানি।

জীবনের এত বড় ট্রাজেডির পরেও ঘটনার তিন মাসের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ৩য় বর্ষে অধ্যয়নরত গোলাম কিবরিয়া। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলার ভ্রাহ্মণপাড়া থানার মল্লিকার দিঘি গ্রামে।

বাবা মো. আব্দুল হাকিম ২০০৪ সালে মারা যান। এরপর থেকে মা সালেখা বেগম ৫ ছেলে ও এক মেয়ের দেখাশোনা করতে থাকেন। মূলত গোলাম কিবরিয়ার বাবা মারা যাওয়ার পর জায়গা সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায় বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের একটি পক্ষ। যদিও এই দ্বন্দ্বের সূচনা অনেক আগ থেকেই ছিলো। তবে শেষপর্যন্ত দ্বন্দ্বের বলি হলেন গোলাম কিবরিয়া।

পরিকল্পিত ভাবে সবকিছু হওয়ার পর ডাকাতির অভিযোগে গোলাম কিবরিয়াকে বিক্ষত অবস্থায় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য পুলিশি হেফাজতে কুমিল্লা হাসপাতাল থেকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সপ্তাহখানেক পর গোলাম কিবরিয়া পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই আবার তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে গোলাম কিবরিয়ার পুরো ফ্যামিলির বিরুদ্ধে মামলা করে সেই হামলাকারীরাই। ফলে কিবরিয়া সঙ্গে দেখা করতেও কেউ যেতে পারতেন না। মারধরের আঘাতে কারাগারে হুইলচেয়ারে চলাচল করতে হতো গোলাম কিবরিয়ার। ওয়াশরুমে যেতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন তিনি। কোমরের নিচ থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত রক্ত জমাট বেধে পা ফুলে যায়। ফলে প্যান্ট কেটে পা বের করেছিলেন ডাক্তাররা।

অসম্ভব যন্ত্রণার মধ্যেও একমাস কারাগারে হুইলচেয়ারে কাটান তিনি। এরমধ্যেও নিজের পড়াশোনার কথা ভুলে যাননি তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আর কোনো সুযোগ আছে কিনা সেটাই খুঁজতে লাগলেন।

একদিন মাকে আবারও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। মা সরাসরি নিষেধ করে দিয়ে বললেন, ‘তোর আর পড়াশোনা করতে হবে না বাবা। তুই চিন্তা করিস না, আমি মারা যাওয়ার আগে তোর জন্য কিছু করে দিয়ে যাবো। যাতে তুই চলতে পারিস।’ কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর আগ্রহ স্বপ্নের পথে আরও একধাপ এগিয়ে দেন গোলাম কিবরিয়াকে। বন্ধুদের সহযোগিতায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম ফিল আপ করেন তিনি।

এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাক পান। সাথে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়ে ভুলে যান সব দুঃখ কষ্ট। আবারো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন গোলাম কিবরিয়া।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবন্ধী ছাত্র সমাজ’র নির্বাচিত শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা গোলাম কিবরিয়া নিজের স্বপ্ন নিয়ে বলেন, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। প্রতিবন্ধীদের সকল প্রতিবন্ধকতা ছাড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাই বাকী জীবন। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্নটাই সবচেয়ে বেশি দেখেন তিনি। হোক সেটা কোনো বিশ্বিবদ্যালয়ে বা কলেজে অথবা অন্য কোথাও।


মন্তব্য