প্রথম বিসিএসেই প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম

মো. ইসমাইল হোসেন

মো. ইসমাইল হোসেন। ৩৬তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকারকারী। প্রথম বারেই দেশ সেরা হওয়ার পিছনে কী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন । কীভাবে নিয়েছিলেন প্রস্তুতি? কোন বৈশিষ্ট্য তাঁকে দেশের লাখো বিসিএস পরীক্ষার্থীর তুলনায় এগিয়ে রাখল? তার সহজ পরামর্শ-  পরিশ্রম করতে হলে সেটা সঠিক পদ্ধতিতে করতে হবে। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তার এই সফলতার গল্প লিখেছেন- এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

 

ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়া
এ এফ এম কবির আহমেদ ও মাতা ফয়েজুন্নেছার কোল জুড়ে পৃথিবীর মুখ দেখেন ইসমাইল হোসেন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে নিজেদের বাড়ি হলেও ইসমাইল বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। ছোট বেলা থেকেই পড়ুয়া ছাত্র ছিলেন। ফলে ভালো ছাত্র এরকম একটা তকমা গায়ে লেগে যায়। ২০০৬ সালে ঢাকার যাত্রাবাড়ি আইডিয়াল হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে জিপিএ ৫.০০ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোন। তারপর ঢাকার সরকারী বিজ্ঞান কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন, এই কলেজ থেকে ২০০৮ সালে জি.পি.এ ৫.০০ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের চৌকাঠ পেরোন। তারপর স্বপ্ন দেখেন বড় ডাক্তার হবেন।

ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘কোন কিছু না বুঝেই বড় হয়ে ডাক্তার হব, এই বদ্ধমূল ইচ্ছার সৃষ্টি হয় ছোটবেলায়। আমাদের পারিপার্শ্বিকতা এবং বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার পিছনে অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়ার পর এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না করতে পারায় প্রথমবাারের মতো কল্পনার রাজ্য থেকে মাটিতে নেমে আসি। সেবার আমি এতই আশাহত হয়েছিলাম যে কোথাও ভর্তি হইনি।’

২য় বার আরো অধিক পরিশ্রম করেও যখন এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেলেন না, তখন এতটাই ভেঙ্গে পড়েন যে কোথাও ভর্তির জন্য সুযোগ পাচ্ছিলেন না। তারপর মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। ইসমাইলের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সব সময় মনে হতো এমন কিছু করবেন, যা তাকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে। মনের মধ্যে তার একটা জেদ সব সময় কাজ করতো। রসায়ন পড়তে ভালো লাগত না। তবু বাধ্য হয়েই পড়তেন। প্রথম কয়েকটি সেমিস্টারে ভালো ফলাফল করলেও পরবর্তীতে সে ভালো ফলাফল আর ধরে রাখতে পারেননি।

বিসিএস শুরুর গল্প
বিসিএস পরীক্ষা কী, কেন, কীভাবে এই ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে ৪র্থ বর্ষের পূর্বে তার কোন ধারনাই ছিল না। ৪র্থ বর্ষে উঠার পর দেখলেন সহপাঠীরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ বিসিএস দেবে, কেউ ব্যাংকার হবে, কেউ বা রসায়নভিত্তিক চাকুরীর জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। ইসমাইল সবার ব্যাপারগুলো দেখতেন। কিন্তু নিজে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তার বোন জান্নাত আরা ( সরকারী হাইস্কুল এর সহকারী শিক্ষক) প্রথম তাকে বিসিএস সম্বন্ধে বলে। তারপর ধীরে ধীরে সব বুঝতে শুরু করেন। বিসিএস দেবেন এই সিদ্ধান্তটা নেন ২০১৪ সালের নভেম্বর ২৪ তারিখ। ইমাইল তার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। সেই থেকে প্রস্তুতি শুরু।

প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পূর্বে এই পথে যারা সফল হয়েছেন তাদের গল্পগুলো পড়তেন। বিশেষ করে ৩০ তম বিসিএসে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম সুশান্ত পাল (বিসিএস কাস্টমস) গল্প, লেখাগুলো তাকে অনুপ্রেরণাা যুগিয়েছে। তার বাবা-মা তাকে ওই সময়গুলোতে অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন। বাবা ব্যবসা করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। তবুও কখনও বাবা-মা তার ভালো কিছু হওয়ার পূর্বে সংসারের হাল ধরার জন্য চাপ সৃষ্টি করেননি।

পরিবারের বড় ছেলে ইসমাইল। ২ বোন , দুই ভাই। বোনদের বিয়ে হয়েছে। বড়বোন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী আর ছোট বোন ৩৪ তম বিসিএস-এ ননক্যাডারে সরকারি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষিকা, ছোট ভাই এইচএসসির পর পড়াশুনা অব্যাহত রেখেছেন। ইসমাইল মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া করেন। কারণ তার মনের আশা তিনি পূরন করেছেন। মহান আল্লাহর ইবাদত করার চেষ্টা করেছেন সব সময়।

ইসমাইল বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা কাউকে নিরাশ করেন না। ৩৬ তম বিএসএসের ফলাফল দেখার পর এই বিশ্বাস আরো গভীর হয়। এটা আমার জীবনের প্রথম কোনো চাকরির পরীক্ষা ছিল।সিভিল সার্ভিসে আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পন করা হবে আমি আমার শতভাগ দেওয়ার মাধ্যমে তা পালন করব। আমি মনে করি, সিভিল সার্ভিসটা হচ্ছে সরকারী সেবা জনগনের নিকট পৌঁছে দেওয়া। সেক্ষেত্রে মানুষের সেবা করাটাই হচ্ছে সিভিল সার্ভেন্টদের কাজ। মানুষের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকে তাদের যাবতীয় সমস্যা সমাধান করার জন্য আপ্রান চেষ্টা ও সদিচ্ছা থাকবে সবসময়।’

ইসমাইলের প্রথম পছন্দ ছিল প্রশাসন ক্যাডার । এই ক্যাডারসহ প্রায় সকল ক্যাডারের প্রায় সকল অফিসারগণ স্বপ্ন দেখেন একদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হবেন। তিনিও সেরকম স্বপ্নই দেখেন।

ইসমাইলের কৌশল
প্রথম বারেই দেশ সেরা হওয়ার পিছনে কী ধরণের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল জানতে চেয়েছিলাম ইসমাইল হোসেনের কাছে। কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি? কোন বৈশিষ্ট্য তাঁকে দেশের লাখো বিসিএস পরীক্ষার্থীর তুলনায় এগিয়ে রাখল? তাঁর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আগামী দিনগুলোতে যাঁরা বিসিএস পরীক্ষা দেবেন, তাঁদের জন্য পরামর্শ হিসেবে কাজ করবে। ইসমাইল যা বললেন:

* আমি মনে করি যেকোনো কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য খুব ভালো পরিকল্পনা দরকার। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পরিকল্পনা আমি আগেই সাজিয়ে নিয়েছিলাম।

* এলোমেলোভাবে পরিশ্রম করলে সেটা কোনো কাজে আসে না। পরিশ্রম করতে হলে সেটা সঠিক পদ্ধতিতে করতে হবে। বিসিএস পরীক্ষার ক্ষেত্রে কৌশলী হতে পারলে সেটা ভালো ফলাফলে সহায়ক হয়।

*পড়াশোনায় মন দেওয়ার জন্য আমি বন্ধুদের সঙ্গে অহেতুক আড্ডা বাদ দিয়েছিলাম। এটা হয়তো অন্যদেরও কাজে আসতে পারে।

*নিজেকে নিজে পুরস্কৃত করেছি। বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। তারপর ছোট ছোট কাজগুলোতে সফল হলে নিজেকে ছোট ছোট পুরস্কার দিয়েছি।

*অনেক বেশি মডেল টেস্ট দিয়েছি। এতে করে আমার দুর্বলতাগুলো জানতে পেরেছি। আত্মবিশ্বাসও একটু একটু করে বেড়েছে।

আরো পড়ুন: আমার পাঁচ বিসিএস ব্যর্থতার গল্প


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ