ভাইভা শুধু প্রশ্ন-উত্তরের বোর্ড না

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন। ৩৬তম বিসিএস পরিসংখ্যান ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। বর্তমানে তিনি ক্যাডার সার্ভিসে কর্মরত রয়েছেন। এম এম মুজাহিদ তার সঙ্গে বিসিএস ভাইভার পরামর্শ নিয়ে কথা বলেছেন।

ভাইভায় আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য শুরুতেই চাকরি প্রত্যাশীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ভাইভায় আমন্ত্রণ পাওয়ার অর্থ হলো আপনার চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা মোটামুটি প্রমাণিত। এবার আপনার সাথে কথা বলে আপনার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, আপনার সদাচরণ, বিনয়ীভাব, দেশপ্রেম, ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি সিভিল সার্ভিসের জন্য আপনাকে তৈরী করা যাবে ইত্যাদি ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পালা।

এতদূর পার হয়ে এসেছেন, আর মাত্র একটা ধাপ! এই ধাপটি সুন্দরভাবে অতিক্রম করতে পারলেই এতদিনের কষ্টগুলো যথার্থ। তাই একটি সুন্দর ভাইভার প্রত্যাশায় আপনাদের সাথে কিছু বিষয় শেয়ার করছি। বিশ্বাস করি, প্রতিটি শব্দই আপনাদের উপকারে আসবে।

চলুন মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। বিসিএস ভাইভা শুধু প্রশ্ন আর উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাইভা বোর্ডের সব প্রশ্নের উত্তর পারা বা কোন প্রশ্নের উত্তর না পারার সাথে সফলতা বা ব্যর্থতা সেভাবে জড়িত নয়। বোর্ডের বিজ্ঞ চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ আপনার অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করবেন। তাই বিনয়ী, ইতিবাচক, বুদ্ধিভিত্তিক ও যৌক্তিক থাকার চেষ্টা করুন। কথাবার্তা বা আচরণে হঠকারী হলে বোর্ড বিরক্ত হবে। যেহেতু সব প্রশ্নের উত্তর পারা জরুরী নয়, সেহেতু অস্থির হওয়ার কিছু নাই। মুদ্রাদোষ এড়িয়ে চলুন, স্থির থাকুন এবং নিজের স্বাভাবিকতা বজায় রাখুন, ব্যস।

পোশাক ভাবনা: পোশাক মার্জিত হতে হবে। কালো জুতার সাথে সাদা শার্ট এবং কালো প্যান্ট পরেছিলাম আমি। এর সাথে মানানসই টাই। দুইবার বিসিএস ভাইভায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। দুইবার দুই রঙয়ের টাই পরেছি। শীতের মৌসুমে কমপ্লিট স্যুট পরে গিয়েছিলাম। সরকারি অফিসে গরম মৌসুমে (মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত) স্যুট পরা হয় না। ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্যই রুচিবোধ ঠিক রেখে মার্জিত পোশাক পরিধান করা চাই। মেয়েরা হালকা রঙয়ের শাড়ি পরতে পারেন। আপনার কনফিউশন তৈরি করে এমন পোশাক এড়িয়ে চলুন। সাদামাটা, সিম্পল চিন্তা করুন। নতুন পোশাক ভাইভার দিনই উদ্বোধন করতে যাবেন না। আগে দুই একবার ব্যবহার করা বা ট্রায়াল দেয়া পরিষ্কার এবং গোছানো পোশাক ভাইভার জন্য বাছাই করুন। চুল কাটতে হলে অন্তত এক সপ্তাহ আগেই কেটে রাখুন। শক্তিশালী সুগন্ধি ব্যবহার করার প্রয়োজন নাই।

বাসা থেকে যখন বের হবেন: প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র আগেভাগেই গুছিয়ে রাখুন। বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে কাগজপত্রসহ সবকিছু নেয়া হয়েছে কিনা অবশ্যই চেক করে নিবেন। কলম এবং হাতঘড়িও নিয়ে নিন। একটু সময় নিয়ে বের হবেন। দেশের প্রথম সারির কয়েকটি পত্রিকার ওই দিনের শিরোনাম ও দুই একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর এবং বাংলা, ইংরেজি ও আরবি তারিখ অবশ্যই দেখে যাবেন।

বোর্ডে প্রবেশ: সকালে বিপিএসসিতে একটি ওয়েটিংরুমে সকলকে বসানো হবে। পরে লটারি করে আপনার বোর্ড নির্ধারণ করা হবে। তারপর একজন ব্যক্তি এসে আপনাকেসহ ১৫ জনের একটি গ্রুপের রেজিস্ট্রশন নম্বর ডেকে নির্ধারিত বোর্ডে নিয়ে যাবেন। সেখানে কাগজপত্র জমা নেয়ার পর ভাইভা শুরু হবে।

আপনার সিরিয়াল আসলে, দরজা খুলে ইংরেজি বা বাংলায় অনুমতি নিন। আপনি ইংরেজি ভাষায় অনুমতি চাইলে বোর্ড ইংরেজি ভাষায় ভাইভা নিতে পারে আবার বাংলায়ও নিতে পারে। অনুমতি পাওয়ার পর ভিতরে প্রবেশ করবেন এবং সালাম দিবেন। বসতে বললে, বসবেন। সোজা হয়ে বসবেন, সটান হয়ে না। দরজা খোলা ও দরজা বন্ধ করা এবং চেয়ারে বসা বা উঠার সময় শব্দ করা এড়িয়ে চলুন। সম্বোধনে ম্যাডাম বলে কিছু নাই, সবাই স্যার। কথা বলার সময় হাত-পা নাড়াবেন না। প্রশ্নে যা চাওয়া হবে শুধু তা উত্তর করবেন।

প্রাসঙ্গিক কিছু ভালোভাবে জানা থাকলে, তবেই আপনার উত্তরে সেটা যুক্ত করুন। সম্পূরক প্রশ্ন হবে। সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উত্তর করবেন। রাষ্ট্র, সরকার, ধর্ম, গোত্র বা কোন সম্প্রদায় বিরোধী কথা বলবেন না। কোন প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে বিনয়ের সাথে বলুন ‘সরি স্যার, এই প্রশ্নটির উত্তর আমার জানা নাই’। আপনার কোন ঠিক তথ্যকে যদি বোর্ড নাকচ করে দেয়, বিনয়ের সাথে বলুন, ‘স্যার, আমি এমনটাই জানি/জানতাম’। জানেনই তো, এটা বিতর্কের নয় বিনয়ের মঞ্চ। যিনি প্রশ্ন করবেন তাঁর দিকে তাকিয়ে উত্তর করবেন, তিনি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলে যিনি আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে উত্তর করুন।

যে ভাষা ব্যবহার করবেন: বিসিএস ভাইভায় অনুমতি চাওয়ার সময় আপনার বাংলা বা ইংরেজি ব্যবহারের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এরপর বোর্ড যখন যে ভাষায় অপনাকে প্রশ্ন করবে, আপনি তখন সে ভাষায় উত্তর দিবেন। নিজের সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে, নিজ জেলা, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত/কুখ্যাত কিছু ঘটনা, দেশের উন্নয়ন, নিজ শিক্ষা জীবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক হল, নিজের পঠিত বিষয়ের সাথে পছন্দের ক্যাডারের সম্পর্ক, ক্রম অনুযায়ী প্রথম তিন ক্যাডার পছন্দের কারণ, নিজের শখ, গতরাত থেকে এখন পর্যন্ত কী কী করেছেন, সকালে কী কী করেছেন, কীভাবে বোর্ড পর্যন্ত আসলেন ইত্যাদি বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় চর্চা করে যাবেন। এই প্রশ্নগুলো সাধারনত ইংরেজিতে করা হয়, বাংলায়ও হতে পারে। যাদের পররাষ্ট্র প্রথম পছন্দ, তারা সবকিছুই ইংরেজিতে চর্চা করে যাবেন।

যা কিছু দেখে যাবেন:
১. আপনার নিজের গ্রাম, উপজেলা, জেলা, জেলার নামকরণ, পর্যটন, আয়তন, জনসংখ্যা, স্থাপনা, পত্রিকা, নদনদী, নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হল এবং এসবের সাথে জড়িত বিখ্যাত ঘটনা, স্থান, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানুন। এখান থেকে উঠে আসা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, কবি-সাহিত্যিক ও তাঁদের কর্ম, সুরকার-গীতিকার-শিল্পী-নির্মাতা এবং তাঁদের গান-চলচ্চিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে জানুন।

আপনার এলাকায় সরকার কর্তৃক গৃহীত যে কোন বিশেষ প্রকল্প, উন্নয়ন কার্যক্রম, বিখ্যাত স্থাপনা, শিল্পকর্ম সম্পর্কে জানুন। মুক্তিযুদ্ধে আপনার এলাকার সেক্টর, সেক্টরের কমান্ডার, বিখ্যাত ঘটনা এবং আপনার এলাকা শত্রুমুক্ত হওয়ার তারিখ, কয়েকজন ভাষাসৈনিক, কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং কয়েকজন রাজাকার সম্পর্কে জানুন।

জাতীয় নির্বাচনে আপনার এলাকার আসন নম্বর ও বর্তমান সংসদ সদস্য সম্পর্কে জানুন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং আপনার ওয়ার্ডের সদস্য বা কমিশনারের নাম ও কৃতিত্ব সম্পর্কে জানুন।

আপনার এলাকার বর্তমান জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সার্কেল এএসপির নাম ও কৃতিত্ব ইত্যাদি জেনে রাখবেন।

২. নিজের পঠিত বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। অনেকের ভাইভা শুধু নিজের পঠিত বিষয়ের উপরই অনেকাংশে শেষ হয়ে যায়। আপনার বিষয়ের উত্থান, ইতিহাস, জনক, জনকের অবদান ও গ্রন্থ, অন্যান্য বিখ্যাতদের অবদান, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওই বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিক ধারণা ইত্যাদি দেখে যাবেন। আপনার বিষয়ের প্রাথমিক কনসেপ্টগুলো সহজ ও সংক্ষিপ্ত উপায়ে উপস্থাপনের জন্য এখনই গুছিয়ে নিন। এর জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে পড়া বইগুলো থেকে নোট করে নিতে পারেন। প্রভাষক নিবন্ধন গাইডেরও (যদি থাকে) সহযোগিতা নিতে পারেন। একই বিষয় উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে থাকলে সেই বই থেকেও নোট নিতে পারেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়া বাংলা গদ্যাংশ দেখে যাবেন, দুই একটি কবিতা আবৃত্তি করার প্রস্তুতিও রাখবেন।

৩. নিজের পছন্দক্রমের প্রথম ৩টি ক্যাডার সম্পর্কে জানতে হবে। কেন পছন্দ, এই কাডারে গেলে তোমার কী লাভ হবে, এই ক্যাডারের কাজ কী, এই ক্যাডারের বিশেষ বিশেষ কৃতিত্ব, সাম্প্রতিক অর্জন বা অবদান, চ্যালেঞ্জ কী, এই ক্যাডারের হায়ারার্কি, অর্গানোগ্রাম, তুমি এই ক্যাডারে গেলে বিশেষ কী করবা ইত্যাদি প্রশ্নোত্তর গুছিয়ে রাখবেন।

পররাষ্ট্র প্রথম পছন্দ হলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি , গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদ ও এর তাৎপর্য, বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে অ্যানালাইসিস ভিত্তিক পড়াশোনা করুন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন ও দূতাবাস সম্পর্কে জানুন। বিশ্বরাজনীতি, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, বিচার এবং চলমান বিশ্বের আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক জানুন। বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট এর সামনে নিজেকে ডিপ্লোম্যাট হিসেবে উপস্থাপন, Letter of Credence, The Commonwealth of Nations, The Commonwealth of Independent States, অ্যাম্বাসেডর ও হাইকমিশনার, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, ভিয়েনা কনভেনশন, জেনেভা কনভেনশান, মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা, চীন-ভারত-পাকিস্তান স্বার্থদ্বন্দ্ব, সিরিয়া সমস্যা, ইরান সমস্যা, তাইওয়ান ও ইসারইলের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক, ফিলিস্তিন সমস্যা, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, সংগঠন, আয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন হতে পারে।

প্রশাসন ক্যাডার প্রথম পছন্দ হলে সহকারী কমিশনার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসি (ল্যান্ড), উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব, পরিধি ও এখতিয়ার সম্পর্কে জানতে হবে। বর্তমানে সিনিয়র সচিব কতজন, তাঁদের নাম ও কর্মস্থান, সচিব কতজন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বা বিভাগসমূহের সচিবের নাম, জেলা প্রশাসক পদের নাম বৈচিত্র ও সৃষ্টির ইতিহাস ইত্যাদি জানুন।

পুলিশ ক্যাডার প্রথম পছন্দ হলে পুলিশ ক্যাডারদের দায়িত্ব, একজন ওসির দায়িত্ব ও এখতিয়ার, পুলিশ-জনগন বন্ধুত্ব ও অনুপাত, সেবার মান বৃদ্ধিতে আপনার পরামর্শ, পুলিশ নিয়ে লেখা বা পুলিশের লেখা বই, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান, আন্তার্জাতিক পরিসরে পুলিশের অবদান, বাংলাদেশ, ভারত, ইউকে ও ইউএসএ এর পুলিশ প্রধানের পদের নাম, উপমহাদেশে পুলিশের ব্যবস্থা চালু, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, এফবিআই, মোসাদ, জঅড, ওঝও ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে যাবেন।

প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারের জন্যCrPc, CPC, Penal Code, Mobile Court Act-2009, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, কারফিউ, ১৪৪ ধারা, জরুরী অবস্থা, নিবর্তনমূলক আটক, প্যারোল, রিট ইত্যাদি বিষয়েও পড়াশোনা করে যেতে হবে।

একইভাবে অন্য ক্যাডার প্রথম পছন্দ হলে তার সাথে রিলেটেড বিশেষ বিশেষ দিক, দায়িত্ব, সফলতা, এখতিয়ার ইত্যাদি বিষয়গুলো চর্চা করে যাবেন। (চলবে ধারাবাহিক ভাইভা প্রস্তুতি পর্ব ২)

 


মন্তব্য