স্কলারশিপ পেতে নিজেকে যেভাবে গড়বেন!

এসএম নাদিম মাহমুদ

গতকাল মনোবুশো স্কলারশিপ আগ্রহীদের জন্য পোস্ট দেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত শতাধিক ইমেইল-ইনবক্স রিসিভ করেছি। সামনে কয়েকদিন গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকার জন্য আগ্রহীদের উত্তর দেয়ার যথেষ্ট পাচ্ছি। আমি চেষ্টা করি, সবার-ইমেইলের উত্তর দিতে। কিন্তু প্রায় আশি শতাংশ প্রশ্ন আসছে, খুবই কমন। আর এইসব কমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভাবছি, আমাদের এই ছেলে-মেয়েরা ফেইসবুকে ডিজিটালি শক্তি দেখাতে সক্ষম হলেও তথ্য আরোহনে পুরোটাই ব্যর্থ। স্নাতক কিংবা স্নাকোত্তর পড়ুয়ারা যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, আমি কি পারবো? ডেন্টাল/মেডিকেলে কি একই নিয়ম? ‘গবেষণাপত্র’ কী? অধ্যাপকদের কিভাবে চিনব, এইসব দেখার পর, নিজেকে অসহায় লাগছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার সাথে হয় তো পরিচয় হতে পারলেও আমাদের একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে ভীত ছাড়া কেবল পাঠ্যবইয়ে চোখ বুলিয়ে।

যাই হোক এইসব ব্যাখ্যা করতে গেলে শেষ হবে না। আসল কথায় আসি। যারা গতকাল থেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, কিভাবে অধ্যাপক, ইমেইল আইডি, সিভি, কভার লেটার লিখতে হবে, তার বিস্তারিত নিয়ে আমি বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলাম। গুগলে সার্চ দিলেই তথ্যগুলো পাওয়া যেত। এরপরও কেউ তা না পড়েই রেডিমেট তথ্য পাওয়ার জন্য অস্তির হয়ে গিয়েছে, তাদের জন্য কিছু তথ্য তুলে ধরছি।

# মাস্টার্স বা পিএইচডি যে কেউ যেকোন রিলেটেড বিষয়ে করতে পারবেন। আপনি ডেন্টালে পড়েন আর মেডিকেলেই পড়েন, আপনি যদি বায়োলজিক্যাল সায়েন্স উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চান তাহলে, আপনি তা নিতে পারবেন। মনে রাখবেন, পিএইচডি করার জন্য নূন্যতম ১৭/১৮ বছরের শিক্ষা সমাপ্ত হতে হয়। কেউ মেডিকেলে পড়লে অনেক সময় সরাসরি পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারেন, সেটা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কোর্স ও অধ্যাপকদের ইচ্ছের উপর। কারও কারও মাস্টার্স করার প্রয়োজন পড়ে।

# আপনি জাতীয়তে পড়েন, কিংবা বেসরকারিতে পড়েন তাতে কোন সমস্যা নয়। সমস্যাটা মনে করে ঘরে বসে থাকাটা হলো বড় সমস্যা। তাই আপনি যদি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হোন আপনি মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে পারবেন, তাহলে অবশ্যই আপনার লেগে থাকা জরুরি।

# বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল কখনও স্কলারশিপ পাওয়ার মানদণ্ড নয়। অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কাছে আপনার উপস্থাপনা ও ইংরেজিতে পারদর্শীতা আপনার অন্যতম বড় মানদণ্ড। সেই সাথে যে বিষয়ে আপনি বাইরে পড়াশোনার জন্য আসতে চাচ্ছেন, সেই বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান কতোটুকু আপনার নিয়ন্ত্রণে, তার উপর নির্ভর করে। একথা সত্য যে বিশ্বের প্রথম সারির অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্কুলে ভর্তি করাতে একটি নির্দিষ্ট সিজিপিএ জুড়ে দেয়, তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। আপনার যদি ফলাফল খারাপ হয়, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এড়িয়ে চলুন। আপনার জন্য অনেক পথ খোলা রয়েছে। অনেক দেশ রয়েছে আপনাকে সাদরে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। তাদেরকে খোঁজ করুন। আপনি যদি লেগে থাকেন, অবশ্যই স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে পারবেন।

# গবেষণাপত্র বা প্রকাশনা কি, সেটার উত্তর দিতে কিছুটা ইতঃস্তবোধ করলেও আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে আমি লিখছি। গবেষণাপত্র হল, আপনি যখন কোন নিদিষ্ট বিষয়ে নতুনত্বের সন্ধানে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য/উপাত্ত এবং বিশ্লেষণ করে কোন বিজ্ঞান সামায়িকীতে প্রকাশ করবেন কিংবা থিসিস আকারে উপস্থাপন করবেন,সেটি হবে আপনার গবেষণাপত্র বা একাডেমিক প্রকাশনা

# এইবার আসি, অধ্যাপক ম্যানেজ করবেন কিভাবে, সেই বিষয়ে। অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি হলো অধ্যাপকদের সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তাই এই ইমেইল আইডিটি আপনি বিভিন্নভাবে পেয়ে যাবেন। আমার দেওয়া দুইটি কৌশল অনুসন্ধান করলে আপনাদের অন্য কোনো নিয়ম অনুসরণ করতে হবে বলে আমি মনে করি না। অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি সাধারণত জার্নাল পেপারগুলোতে থাকে।

০ সেই অনুযায়ী ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন’ হচ্ছে তথ্যভাণ্ডার। এই ওয়েব সাইটে পাবমেডে গিয়ে পেয়ে যাবেন অধ্যাপকদের ঠিকানা ও ইমেইল আইডি।

০ প্রথমে এই www.ncbi.nlm.nih.gov লিংকে গিয়ে উপরের দিকে সার্চ অপশন পাবেন। সেখানে গিয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত শব্দটি দিয়ে নিমিষে পেয়ে যাবেন কয়েকশ জার্নাল। ধরুন, আপনার সাবজেক্ট জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং। এই ক্ষেত্রে আপনি জেনেটিক্সের কোনো বিষয় দিয়ে দিলে অনেকগুলো জার্নাল পেয়ে যাবেন। অথবা আপনি ইচ্ছে করলে আপনার কাঙ্ক্ষিত দেশ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লিখেও সার্চ দিতে পারেন।

০ এবার একেকটি জার্নাল পেপার খুলুন। মূল শিরোনামের পরে ‘অথর ইনফরমেশন’ নামে একটি অপশন আছে। সেখানে গিয়ে দেখবেন যে অথরের ইমেইল আইডি দেওয়া আছে।

০ এই পেপারগুলোতে শুধুমাত্র অ্যাবস্টাক্ট থাকে। অনেক সময় ইমেইল আইডি নাও থাকতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ডানদিকে ফুলটেক্সট অথবা ফ্রি টেক্সট নামে পিডিএফ অপশন আছে। ওই মূল পেপারে অবশ্যই ইমেইল আইডি পাওয়া যায়।

এভাবে এই মেইল আইডি সংগ্রহ করে অধ্যাপকদেরকে ইমেইল করা শুরু করুন।

# বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একসাথে কিভাবে পাবেন তার জন্য আপনি এই লিংকে গিয়ে পেয়ে যাবেন পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা। http://www.4icu.org এই লিংকে গিয়ে আপনার মহাদেশ অনুযায়ী আপনার পছন্দের দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংক পেয়ে যাবেন।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংকে গিয়ে সেখানে দেখুন, ফ্যাকাল্টি ও ডিপার্টমেন্ট অপশন রয়েছে। ওই অপশনে গিয়ে ক্লিক করলে পেয়ে যাবেন বিস্তারিত তথ্য। অনেক সময় অধ্যাপকদের ল্যাব ঠিকানাও পাওয়া যায়। আর সেখানে গিয়ে খুঁজে নিন অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি।

# এইবার আসি মটিভেশন লেটারের প্রতি। অনেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, কিভাবে এটি লিখবেন। আর সেই জন্য আপনি কিছু মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পারেন। আগেও বলেছি আবারও বলছি, একজন অধ্যাপককে ম্যানেজ করার জাদুমন্ত্রটি হলো একটি সুন্দর মটিভেশন লেটার। এই পত্রটির ভাষাই বলে দেবে- আপনি কেমন, আপনার মেধা-মনন সবকিছু ফুটে উঠবে। মনে রাখবেন, আপনি অধ্যাপককে দেখনেনি, এমন কি প্রফেসরও আপনাকে দেখেনি। সুতরাং আপনাদের দুই জনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার হাতিয়ার এটি। এই দুরূহ কাজটি করার অভিপ্রায় নিজে নিজে নিয়ে ফেলুন।

সেখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করবেন। আপনার বর্তমান পড়াশোনার অবস্থা, গবেষণার অবস্থা, ভবিষ্যৎ ইচ্ছা, আপনি কেনো সেই অধ্যাপককে পছন্দ করেন ইত্যাদি। এজন্য আমার পরামর্শ থাকবে, গুগলে গিয়ে ডেমো দেখে নিতে পারেন। আর বায়োডাটা অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। চাকুরির বায়োডাটা আর স্কলারশিপে বিদেশে পড়াশোনার বায়োডাটা কখনও এক হতে পারে না।

এক্ষেত্রে আপনি আপনার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ছাড়াও আপনার কোনো সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা থাকলে সেই সেমিনারগুলোর টাইটেলও যোগ করতে পারেন। তবে অভিজ্ঞতার অপশনে অবশ্যই আপনি ব্যবহারিক পড়াশোনার অংশবিশেষ তুলে ধরতে পারেন। মোট কথা, বায়োডাটা অবশ্যই গবেষণা করার কিছু নমুনা তুলে ধরা যেতে পারে।

# অনেকে আবার জিজ্ঞাসা করেছেন, আপনি নিজ খরচে পড়াশুনা করতে চান, সেটা পারবেন কিনা। দেখুন টাকা থাকলেও যে নিজ খরচে পড়াশুনা বাহিরে করতে পারবেন তা নয়, আপনাকে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সেটা আপনি নিজ খরচে পড়েন আর স্কলারশিপ নিয়ে পড়েন। তাই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সবকিছু ভাবুন। এরপরও সিদ্ধান্ত নিবেন। মনে রাখবেন, এটি আবেগীয় কোন সিদ্ধান্ত নয়, আপনার ভবিষ্যত নির্ভর করবে এই সিদ্ধান্তে।

# অনেকে জানতে চেয়েছেন, পিএইচডি শেষ করে কি করবেন। দেখুন পিএইচডি শেষ করে আপনি বিশ্বের যে কোন দেশে একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন। সেই সাথে বড় বড় কোম্পানিগুলোতে রিসার্চ আন্ড ডেভলপমেন্ট বিভাগে চাকরি পেতে পারেন। দেশে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে/কলেজে শিক্ষকতা করতে পারেন। মনে রাখবেন, পিএইচডি করে চাকরির জন্য অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। নিজের যোগ্যতাই হল বড় সম্পদ।

এরপরও যদি কারও জানার আগ্রহ থাকে তাহলে আপনি আমাকে লিখতে পারেন [email protected]

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ