স্কলারশিপের আশায় ৩ বছরে অনেক রাত ঘুমাইনি

গত তিন বছরে অনেক রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। কেঁদেছি। বাদ পড়ার কান্না। প্রতি বছর ৫-৭টি স্কলারশিপ আর ফেলোশিপে আবেদন করেছি আর বাদ পড়েছি। কোথাও কোথাও ইন্টারভিউ দিয়েও বাদ পড়েছি। টানা ৩ বছর ৫টা কোর্স পড়িয়ে বৃত্তির আবেদন করতে যে কেমন লাগে, এটা যে করে সে জানে!

আমার চোখের পানির সাক্ষী জাহাঙ্গীরনগরের প্রশস্ত দীর্ঘ রাস্তার পাশের গাছগুলো। প্রতিরাতে হাঁটতে বের হয়ে কোন একসময়ে ব্যর্থতার তীরগুলো আমাকে বিদ্ধ করতো, আর চোখের পানি চলে আসতো। প্রতিরাতে আমি অ্যারোপ্ল্যানের বাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম আমার দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ কি হবে?

ধৈর্য’র চরম পরীক্ষা দিয়ে প্রথমে সিলেক্টেড হলাম আমেরিকান ফুলব্রাইটের একটা ফেলোশিপের জন্য (১৫ আগস্ট ২০১৮)। ৯ মাসের ফেলোশিপ দেখে মন টানছিলো না। আমার প্রফেশনে ভ্যালু অ্যাড করবে না। তবু ভাবলাম নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো এটাতেই যাবো। এই প্রোগ্রামে যেতে হবে ২০১৯ এর আগস্টে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আবার অন্য বৃত্তির জন্য আবেদন করা শুরু করলাম।

ডিসেম্বরের ১৩/১৪ তারিখে কমনওয়েলথের ভাইভায় পাশ করলাম। কিসের কি? এটা তো মাত্র প্রথম ধাপ। ৩ ধাপের দ্বিতীয় ধাপে বাদ পড়লেই বাদ।

১৬ এপ্রিল প্রোভিশনালি সিলেক্টেড হলাম। শুনলাম এতেও নাকি লাভ নাই। আরো ধাপ আছে। এদিকে এগুলো সংবাদ আপনি না জানাতে চাইলেও মানুষ জানবে এবং আপনাকে টেনশনে ফেলবে। ফুলব্রাইট মেইল পাঠাচ্ছে ভিসার আবেদন করতে অথবা ফেলোশিপ ডিক্লাইন করতে। কমনওয়েলথ কনফার্ম না জেনেও আমি ফুলব্রাইট ডিক্লাইন করেছি। আর প্রায় প্রতিদিন কিসের মধ্য দিয়ে গিয়েছি জানি না।

২৪ জুন কমনওয়েলথ বৃত্তির নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড পেলাম। ভাবলাম আমাকে আর পায় কে? ইমেইলে বলা হলো আরো ধাপ বাকি আছে! জুলাইয়ের ৮ তারিখ স্কলারশিপ কনফার্ম হলো। এবার অপেক্ষা হার্ড কপির। উনি আসলেন দ্রুতই। ভিসার আবেদন করে আবার অপেক্ষা। মানুষজন ৩-৭ দিনে ভিসা পেলো আর আমি পেলাম ১৬ দিনে। তাও আবার প্রচুর জল ঘোলা করে। টিকিট সবাই পেয়েছে ২ দিনে আমি পেয়েছি ৯ দিনে।

এই ব্রেথটেকিং স্টেপসের মধ্যে আমি হাইপ্রেশারের রোগী হয়ে গেলাম। কমনওয়েলথ কমিশন বৃত্তির পাশাপাশি আমাকে অসুস্থতাও উপহার দিলো।

তবুওতো ভালো আমার প্রায় ৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ঈশ্বরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, পাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা, ১৯ বছর থেকে নিজের ভাগ্য নিজে হাতে নিয়ে চলা, জীবনের প্রতি পদক্ষেপে কঠিন পরীক্ষার স্বীকার হওয়া আমাকে অকৃতি অধম জেনেও যিনি অশেষ করেছেন। আমি ঠিক করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে তারপর এই কাহিনী লিখবো। তাই পদে পদে আলহামদুলিল্লাহ লেখা আর চেক ইন দেয়ার লোভ সামলেছি। তবে সহকর্মী আর ছোটোরা স্ট্যাটাস দিয়েছে এর মধ্যেই।

আমার তিন বছরের যাত্রার প্রতিটি ধাপে আমাকে সাহস যুগিয়েছে শাহান। প্রতিটি বৃত্তিতে রিজেক্টেড হয়েছি আর সেই মানুষটা আমাকে সাহায্য করেছে আবার ঘুরে দাঁড়াতে। তুমি জানো আমার জন্য তুমি কি। ঘোষণা দিয়ে বলা আমার স্বভাবে নাই (হিহিহি)।

কমনওয়েলথের আবেদন থেকে শুরু করে একেবারে ইংল্যান্ড আসা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যে মানুষকে প্যারা দিয়েছি তিনি নিশা আপু। এমনও হয়েছে নিশা আপু র থিসিস সাবমিশনের সময়ও আমি উনাকে যন্ত্রণা দিয়েছি। এই মানুষটার সাথে আমার সরাসরি দেখা হয় নি অথচ আপু আমার জন্য যা করলেন আমি কখনোই ভুলবো না। আপনাকে ভালোবাসি সোনিয়া ইসলাম নিশা আপু।

আসাদ স্যারকেও প্রচুর জ্বালিয়েছি গত দুই বছর। স্যার আমাকে রিকমেন্ডেশন লেটার তো দিয়েছেনই পাশাপাশি প্রতিনিয়ত আমাকে ভরসাও দিতেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও যখনই পরামর্শ চেয়েছি স্যার সহায়তা করেছেন।

খোরশেদ আলম স্যারও উনার অনেক ব্যস্ততার মধ্যে আমাকে রিকমেন্ডেশন দিয়েছেন। স্যারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।

জাহাঙ্গীরনগরের কলা অনুষদের ডিন মোজাম্মেল সময় স্যারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে স্যারকে জ্বালাই। ছুটির বিষয়েও স্যার সাহায্য করেছেন।

ফয়সল চাচ্চুর কথা বেশি লিখলে উনি দেশে ফিরলে মাইর দিতে পারেন। আপনার কাছে আমার জীবন পরিমাণ ঋণ। আপনি আছেন বলেই আমি রিস্ক নিতে ভরসা পাই।

আর কৃতজ্ঞতা যারা চূড়ান্ত অসহযোগিতা করেছেন নানা সময়ে নানা ধাপে। আপনার অসহযোগিতা করেন বলেই আমার জেদ চাপে, ভালো করার উৎসাহ পাই। একই কথা প্রযোজ্য যারা স্কলারশিপের বিষয় নিয়ে আমাকে নানা সময়ে টিটকারি করেছেন। ধন্যবাদ।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ