৫০ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন পরিবর্তন করেছে যে স্কলারশিপ

অনার্স শেষ করেছেন। ভাবছেন ইউরোপের কোনো দেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন। কিন্তু তখনই পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি না থাকার বিষয়টি আপনার মাথায় চলে আসলো। তাহলে কি এখানেই থেমে যাবে আপনার স্বপ্নের পথচলা? না, আপনার স্বপ্ন থামবে না। যদি মেধাবী ও অধ্যাবসায়ী হন তাহলে ইউরোপে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনার খুব ভালো বাহন হতে পারে ইউরোপীয় কমিশনের ‘ইরাসমাস মুন্ডুস’ স্কলারশিপ। 

১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর এই স্কলারশিপের আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থীর ইউরোপে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তাই গত ৩০ বছর ধরে এটি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই স্কলারশিপের অধীনে ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমত বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ পেয়ে থাকেন। 

ইরাসমাসমুন্ডুস স্কলারশিপের আওতায় একজন শিক্ষার্থী মাসিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা, স্বাস্থ্যবীমা ও গবেষণা সম্পর্কিত সকল খরচ পেয়ে থাকেন। আর এই জন্যই শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের কাছে এটি এত বেশি জনপ্রিয়। এছাড়াও একজন শিক্ষার্থী এবং গবেষক তার ভর্তি থেকে শুরু করে সকল ধরনের টিউশন ফি, লাইব্রেরি ফি, পরীক্ষা ফি, গবেষণা সংক্রান্ত সব কিছুই একেবারে ফ্রিতে পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই স্কলারশিপ পাওয়া এক প্রকার ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার মতই। 

ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ প্রতিবছর তিনটি ভাগে শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। আশার কথা হচ্ছে, ২০১৭-২০১৮ সেশনে ইরাসমাসমুন্ড স্কলারশিপ প্রকল্পের আওতায় সারা পৃথিবীতে স্কলারশিপ প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। একশন-১ এ ৬১ টি স্কলারশিপ পেয়ে এই স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একশন-২ ও একশন-৩ মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট স্কলারশিপ প্রাপ্তির সংখ্যা ৮৯ টি।

বাংলাদেশের অদম্য শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর এই স্কলারশিপের আওতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছেন। তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছেন। তৈরি করছেন সম্ভাবনার নতুন সুযোগ। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত যথাযথ জ্ঞান না থাকা ও তথ্য না জানার কারণে হাজারো সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু ঘটছে। সঠিক তথ্য এবং নিজের ওপর আস্থা থাকলে বাংলাদেশের অদম্যরা খুব সহজেই পেতে পারেন এই স্কলারশিপ। 

আবেদন প্রক্রিয়া: কাজের ক্ষেত্রে ইরাসমাস মুন্ডুস এতোটাই প্রফেশনাল, তারা প্রত্যেকটি প্রোগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন ওয়েবসাইট খুলে রেখেছেন। যেন আবেদনকারীরা প্রত্যেকটি প্রোগ্রামের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আবেদন করতে পারেন। কারা কারা আবেদন করতে পারবেন সেই সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য, আবেদনকারীর ন্যূনতম যোগ্যতা, আবেদন করার সময়সূচী, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া থাকে প্রত্যেকটি প্রোগ্রামের নিজস্ব ওয়েবসাইটে।

ইরাসমাসমুন্ড স্কলারশিপে আবেদন করার ক্ষেত্রে আপনাকে আইইলটিএস-এ উপযুক্ত স্কোর করতে হবে। তবে কারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি ইংরেজি মাধ্যমের হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠারে মিডিয়াম অফ ইন্সট্রাকশন পত্র দিয়ে আবেদন করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিভাগে ইমেইল করে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।

অনলাইনের মাধ্যমে এই স্কলারশিপের বেশির ভাগ প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে হয়। ভাল খবর হল- অনলাইনে আবেদন করতে হলেও আবেদন করার জন্য কোনো প্রকার টাকা খরচ করতে হয় না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে অনলাইন ফর্মের নির্ধারিত স্থানে আপলোড করতে হয়। এছাড়া কেউ চাইলে ইমেইল করেও প্রয়োজনীয় সকল ডকুমেন্টস পাঠাতে পারবেন।

মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদনের ক্ষেত্রে সর্বশেষ আপনি যে বিষয়ে পড়েছেন তার সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট, জীবনবৃত্তান্ত, ইংরেজি ভাষাশিক্ষার স্কোর, শিক্ষার্থীর কাঙ্খিত পড়ালেখা সম্পর্কিত মোটিভেশন লেটার ও শিক্ষার্থী সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখেন এমন দুজন যোগ্য ব্যক্তির সুপারিশপত্র (রিকমেন্ডেশন লেটার) দিয়ে আবেদন করতে হয়। দেশি বিদেশি জার্নালে আপনার প্রকাশিত গবেষণাপত্র যদি থাকে তাহলে তা জমা দিলে অনেক এগিয়ে থাকবেন আপনি। 

যেই প্রোগ্রামে পড়ালেখা করতে আগ্রহী সেই প্রোগ্রামের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা এ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কো-কারিকুলার কার্যক্রম আবেদন প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজস্ব প্রস্তাবিত গবেষণা কাজ জমা দিতে হয়। একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ তিনটি প্রোগ্রামে আবেদন করতে পারবেন। 

জেনে রাখুন

১। ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের জন্য জীবন বৃত্তান্তের ক্ষেত্রে (Curriculum Vitae) ইউরোপাস ফরমেট ব্যবহার করাটা সুবিধাজনক।

২। একশন-১ এর অধীনে আবেদন করার জন্য সঠিক সময় হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস।

৩। মোটিভেশনাল লেটারকে ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোটিভেশনাল লেটার ২/৩ পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ভাল। এ লেটার শিক্ষার্থীকে তার একাডেমিক বা প্রফেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড, অভিজ্ঞতা, কেন সে নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে আবেদন করতে আগ্রহী, ওই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলে নিজের দেশ বা প্রতিষ্ঠান কিভাবে উপকৃত হবে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার লক্ষ্য-সংকল্প করতে হয়। 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ