করোনাকালে ক্যাম্পাসে ঈদ

এম এস শাহীন (উপরে), কাওসার আহমেদ পিয়াল (ডানে), রুমান আহমেদ রুবেল (নিচে বায়ে) এবং আঃ আহাদ (নিচে ডানে)  © টিডিসি ফটো

করোনার কারণে প্রায় ২ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার সকল গণপরিবহন। আর এ কারণে অনেকেই ক্যাম্পাস থেকে যেতে পারেননি নিজের বাড়িতে। পরিবার ছাড়াই কাটিয়েছেন পবিত্র ঈদুল ফিতর। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কয়েকজন শিক্ষার্থীর এবারের ঈদে ভিন্ন রকম অনুভূতি তুলে ধরছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’র প্রতিনিধি শাহাদাত বিপ্লব

এম এস শাহীন, ইংরেজি বিভাগ: পড়ালেখার জন্য বাড়ি যাইনি। ভেবেছি হয়তো লকডাউন উঠে যাবে। কিন্তু করোনা যেন আমাদের সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। আর তাই ঈদ করেছি পরিবার ছাড়াই। ইট পাথরের শহরে পরিবারের বাইরে ঈদ করাটা যেমন কষ্টের, তেমনি আবার স্বস্তিরও। কারণ এখন যদি আমি বাড়িতে যাই, হয়তো আমার মাধ্যমে পরিবারের অন্য কেউ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে।

শহরের মানুষের প্রতি একটা খারাপ ধারণা ছিল যে তারা নির্দয় হয়। কিন্তু তা ভুল প্রমাণ করলেন শহরের এক আংকেল। নিজেদের সাধ্যের মধ্যেই পরম যত্নে ভুলিয়ে দিয়েছেন নিজের পরিবারের কথা। রেখেছেন মা-বাবার ভুমিকা। যদিও সকালে পরিবারের সবার সাথে কথা বলেছি, তবুও নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। অজান্তেই চোখে জল চলে আসে।

পরিবারের বাইরে ঈদ যে বড় বেমানান, অক্ষরে অক্ষরে বুঝলাম। আর নিজেকে সামলে নিয়েই অভয় দেখিয়েছিলাম এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফোনের ওপারের মানুষগুলোকে। মোট কথা পরিবারের প্রতি ত্যাগ আর দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করেই পরিবারের বাইরে এই প্রথম ইদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কাওসার আহমেদ পিয়াল, বাংলা বিভাগ: ঈদ! হ্যা সত্যিই এমন ঈদ আর আগামীতে হবে কিনা জানি না। এ এক ঐতিহাসিক ঈদ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অমানিশার ঈদ আর হবে কিনা সৃষ্টিকর্তা সেটা ভালো জানবেন। যেখানে প্রতিটি মানুষ সারাটি বছর অপেক্ষা করে এই দিনটির জন্য। সকল ব্যস্ততাকে বিসর্জন দিয়ে ছুটে চলে দিকবিদিক, ট্রেনের ছাদ, বাড়তি ভাড়া, যাত্রীর উপচে পড়া ভিড়কে সরাজ্ঞান করে নাড়ীর টানে বাড়ি ফেরে, এবার স্বপ্ন আর বাড়ি যায়নি কারো দুঃস্বপ্নের ভয়ে।

যেখানে অসুস্থ আপনজনকে দেখতেই নানা দুর্ভোগ নিয়ে বাড়ি ফিরি, আজ সেখানে তাকে নিরাপদ রাখতে দূরে থাকি, এ কেমন ঈদ! কোলাকুলি, করমর্দন, সেলফি তোলা এর কোনোটাই ছিল না এ ঈদে। করোনা পরিস্থিতিতে সকল প্রাণীরই মূল্য আছে, কেবল মানুষ ব্যতীত। আজকের ঈদের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো, মসজিদের গেটে এতিম-অনাথ যারা সামান্য কিছু সাহায্যের জন্য হাত পাতে, তাদের দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মুখে মাস্ক নেই বলে। ঠিক যেমনটি করে বিশেষ প্রাণী তাড়ানো হয়।

অথচ ঈদ তো ছিলো তাদের মাথায় হাত বুলানোর জন্য, মান-অভিমান বিভেদ ভুলে নতুন সমাজ গড়ার। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, আগে ধনীতে-গরীবে বিভেদ হতো। আজ ধনীতে-ধনীতে, আপনে-আপনে বিভেদ হচ্ছে। সবাই সবার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। যেন কেউ কারো নয়!

করোনাকে অনেকে স্রষ্টার আযাব বলতে পারেন, তবে আমি বলি করোনা উৎকৃষ্ট শিক্ষক। এই করোনা আমাকে যা শিক্ষা দিয়ে গেল, পৃথিবীর কোনো শিক্ষক আমাকে এ শিক্ষা দিতে পারেনি। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলল তুই একা। স্রষ্টা ছাড়া তোর আর কেউ নেই। দেখিসনি? ছেলে হয়েও বাবার লাশ ফেলে রেখে গেছে।

যাইহোক এই প্রথম জীবনে বাড়ির বাইরে ঈদ উদযাপন করলাম। কোনোকিছুরই কমতি ছিলো না কিন্তু এটাকে কখনোই আমার ঈদ মনে হয়নি। এটা করোনার ঈদ। করোনা হাসছে আর আমরা কাদছি মনোবেদনা নিয়ে।

রুমান আহমেদ রুবেল, অর্থনীতি বিভাগ: ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ আমাদের সেই আনন্দের ঈদ। তবে আমরা সবাই জানি, এবারের ঈদ কেমন ঈদ! কারণটাও সবার জানা। পৃথিবীতে মহামারি করোনার ভয়াল থাবা। পৃথিবীব্যাপী লকডাউন চলছে, আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দূর্ভাগ্যবশত আমরা লকডাউনে আটকে গেলাম কুমিল্লাতেই।

ঈদ ঠিকই চলে এসেছে সঠিক সময়ে, কিন্তু আমরা বাসায় যেতে পারিনি। তাই বাড়ির বাইরেই জীবনে প্রথমবারের মতো কাটিয়ে দিতে হলো ঈদ। এমনিতেই পরিবারের একটা টেনশন ছিলো এতদিন ধরে আছি, কীভাবে আছি? কেমন আছি? আর ঈদ উপলক্ষে তো আরো খারাপ লাগা। নিজেদেরও খারাপ লেগেছে, মিস করেছি সবাইকে। কিন্তু কিছুই করার নেই, পরিস্থিতির শিকার।

তবে সবকিছুর জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া। ভালোই কেটেছে দিনটা। ঘুম থেকে উঠে ঈদের নামাজ পড়লাম। তারপর রুমমেটের সাথে টুকিটাকি রান্নাবান্না করা। কিন্তু এর মাঝেই রুমমেটের টিউশন আঙ্কেলের ফোন। তাড়াতাড়ি যেতে, আমাদের দাওয়াত। অবশ্য আগেই বলে রেখেছিলেন উনি।

সংকোচবোধে যেতে চাইনি, কিন্তু তার অমায়িক ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করেছে। তার সাথে খেয়েদেয়ে গল্প কথা বলে দিব্যি কেটে গেল দিনটা। এই ছিল কোয়ারেন্টাইনের ঈদের অনুভূতি।

আঃ আহাদ, বাংলা বিভাগ: ঈদ মানেই মা-বাবা,ভাই-বোন একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করা। রাতে পরিবারের ছোটদের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দেয়া, লাগানো দেখা। ছোটদের সাথে মজা করার জন্য তাঁদের মেহেদির ডিজাইন সুন্দর হয়নি বলে ক্ষেপিয়ে তোলা। অনেক রাতে ঘুমিয়ে আবার ভোর না হতেই মায়ের হাতের পিঠার মিষ্টি গন্ধে ঘুম ভাঙার নামই ঈদ।

হুড়োহুড়ি করে গোসল সেরে ঈদের নামাজ আদায়ের নামই হচ্ছে ঈদ। ঈদের পূর্ণতা মানেই নামাজ শেষ করে এসে পরম শান্তিতে বাবা-মাকে সালাম করা। আজ পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সারাদিন কেটেছে আমার। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন থাকায় নিজ বাড়ি (সুনামগঞ্জ) যেতে পারিনি। অবস্থান করছি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

আসলে আজ মনে শুধু একটা কথা বার বার আসছে; যাদের বাবা-মা নেই, ঘর নেই কিংবা ভবঘুরে, তাদের ঈদটা না জানি কতো দুঃখের ছিলো! আমার কাছে আজ ঈদের দিনটিকে আর অন্য দিনের থেকে আলাদা কিছু মনে হয়নি। কোথাও কোনো কোলাহল নেই! সবকিছু মাঝ রাতের মতো নীরব! অন্ধকারের মতো ভয়াবহ!

এখন শুধু একটাই প্রার্থনা; হে বিধাতা! আমাদেরকে আর কখনো এমন ঈদ দিওনা যেই ঈদে বাবা-মায়ের পায়ের ধূলা মাথায় নিতে পারবো না।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ