২৫ বছরে আন্দোলনের মুখে জাবিতে পদত্যাগ করেছেন ৮ উপাচার্য

দুর্নীতিবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের ক্যানভাস এঁকে উপাচার্য ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবি  © সংগৃহীত

উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে বর্তমানে শিক্ষা ও প্রশাসনিক সব ধরণের কার্যক্রম অনির্দ্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা নতুন কিছু নয়। গত ২৫ বছরে জাবির ৮ উপাচার্যকে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এসবের মধ্যে অনেকেই উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েই নানা কাজে বিতর্ক তৈরি করেন।

এবার জাবিতে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দুই কোটি টাকা’। এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাঁধা দিবে না, এই প্রতিশ্রুতিতে ছাত্রলীগ নেতাদের দেওয়া হয়েছে ২ কোটি টাকা। এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় গত ২৩ আগস্ট থেকে জাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। এরপর থেকেই উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন তারা। গত মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বাসভবন অবরোধ করলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করতে বলা হয়। তবে ক্যাম্পাস বন্ধের ঘোষণার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ শুক্রবারও ক্যাম্পাসে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাঁরা দুর্নীতিবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের ক্যানভাস এঁকে উপাচার্য ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবি করেছেন। দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনের সড়কে ক্যানভাসে এই চিত্র আঁকা হয়। চিত্রাঙ্কন শেষে এ ক্যানভাস নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করা হয়। এছাড়া রাতে শুক্রবার আন্দোলনকারীদের একটি দল উপাচার্যের দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে জমা দিতে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।

জানা যায়, ১৯৭০ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের বিশিষ্ট রসায়নবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মফিজ উদ্দীন আহমেদকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে ১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ১৯৭২ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ক্যাম্পাসটি নান্দনিকভাবে সাজান। তিনি ১৯৭৫ সালে মর্যাদার সঙ্গে তার মেয়াদও শেষ করেছিলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ এনামুল হক এবং অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন।

১৯৮৮ সালে অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯৩ সালে শিক্ষকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলায় ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই ঘটনায় অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ পদত্যাগে বাধ্য হন। অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তখন অস্থায়ীভাবে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ উপাচার্য হন এবং ১৯৯৯ সালে ক্যাম্পাসে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং টিউশন ফি বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এই আন্দোলনে তাকেও উপাচার্যের পদ ছাড়তে হয়। এরপর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েসকে উপাচার্য করা হয়, তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। উপাচার্য পদে আসেন অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। ২০০৪ সালে শিক্ষক আন্দোলনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকেও উপাচার্যের পদ ছাড়তে হয়। এরপর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ভাগ্যবান উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার মোস্তাহিদুর রহমান। গত ২৫ বছরে একমাত্র তিনিই সম্মানের সঙ্গে তার মেয়াদ শেষ করেছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তার চার বছরের পুরো মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান ২০০৮ সালে অস্থায়ীভাবে উপাচার্য নিযুক্ত হয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরকে নিয়োগ দেয়। তার আমলে শিক্ষক নিয়োগ, ভর্তি এবং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির ওঠে। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ২০১২ সালে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে উপাচার্য না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনকে এই পদে নিয়োগ দেয় সরকার। তিনিও তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান অধ্যাপক আনোয়ার। এই সময়ের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তারা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেউই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এদিকে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকটের পেছনে তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার গণভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তোলা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ