জাবিতে গাছ কেটে নির্মিত হচ্ছে হল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে হল নির্মাণের স্থানগুলোতে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় গোলাপজাম গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির সহস্রাধিক গাছ। হল নির্মাণের জন্য এসব গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ২৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১০তলা বিশিষ্ট পাঁচটি হল নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে ছাত্রদের তিনটি হল নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। আর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের দক্ষিণ পাশে ছাত্রীদের জন্য দুটি হল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দীন বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইকোসিস্টেম রয়েছে। গাছ কাটলে এর ভারসাম্য আর থাকবে না। বহুমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাতাসে অক্সিজেনের স্বল্পতা ছাড়াও জীবনধারণের আশ্রয় হারাবে অগণিত পাখি, সরীসৃপ ও পতঙ্গ। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও নষ্ট হবে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের দক্ষিণ দিকে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ৬৩টি গোলাপজাম গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৫৩৯টি গাছ। পূর্বদিকে হল নির্মাণের জন্য কাটতে হবে ৩৫৮টি গাছ। এছাড়া হলের উত্তর পাশে খেলার মাঠে আরও একটি হল নির্মাণ করা হবে। এ জন্য কাটা পড়বে আরও ২৮টি গাছ। আবার শিক্ষার্থীদের খেলার জন্যও থাকবে না কোনো মাঠ।

এদিকে ছাত্রীদের জন্য দুটি হল নির্মাণের স্থানে রয়েছে একটি বটগাছ, ১৭৮টি কাঁঠালগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০৭টি গাছ। এতে নতুন হল নির্মাণে কাটা পড়ছে মোট এক হাজার ১৩২টি গাছ।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা ইয়াসমিন শিল্পী বলেন, কোনোভাবেই আমি গাছ কাটার পক্ষে না। এগুলোর মধ্যে এমন কিছু বিলুপ্তপ্রায় মূল্যবান গাছ রয়েছে যা শুধু আমাদের দেশে নয় বিশ্বে নেই বললে চলে। এসব গাছ আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।

ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সহসভাপতি অলিউর রহমান সান বলেন, উন্নয়ন মানে শুধুই বহুতল অবকাঠামো নির্মাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতির উন্নয়নের বদলে যত্রতত্র দালান নির্মাণ করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের অবকাঠামো প্রয়োজন তবে হাজারো গাছের প্রাণের বিনিময়ে নয়।

বিকল্প স্থানে হল নির্মাণের দাবি জানিয়ে দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক-জব্বার হলের উত্তর পাশ, মওলানা ভাসানী হল সংলগ্ন সড়কের দক্ষিণ পাশ, জিমনেসিয়াম সংলগ্ন ফাঁকা স্থানসহ অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তবে প্রশাসন এসব জায়গা বিবেচনায় না নিয়ে একই জায়গায় পাশাপাশি হল নির্মাণ করছে। যেখানে আবার রয়েছে সহস্রাধিক গাছ।

উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, কিছু গাছ কাটা যাবে। যেখানে গাছ রয়েছে সেখানে আমরা চিন্তাভাবনা করে পরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করছি।

তবে মহাপরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করে উপাচার্য বলেন, গত সাড়ে তিন বছর ধরে সিনেট সভাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উন্নয়নের পরিকল্পনার বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে এবং গত ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কনসার্টে ‘থ্রিডি মাস্টার প্ল্যান’ সবাইকে দেখানো হয়েছে। তখন কোনো ধরনের সহযোগিতা বা পরামর্শ আমরা পাইনি। একনেকে পাস হওয়া চূড়ান্ত পরিকল্পনা এখন পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে জানান উপাচার্য।


মন্তব্য