সেমিস্টার ফাইনাল ছাড়াই গ্রেড দেবে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

  © লোগো

করোনাভাইরাসের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়েও সরাসরি ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের সেশনজটসহ নানাবিধ সমস্যা এড়াতে শর্ত সাপেক্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) একটি গাইডলাইন দিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় চলতি সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা না নিয়ে টার্ম পেপার, এমসিকিউ পদ্ধতি (কুইজ) এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করবে।

বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিলে তারা জানান, অনলাইনে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা নিতে হলে আলাদা পদ্ধতি ডেভেলপ করতে হবে। যেটা এই দুর্যোগকালীন মুহূর্তে কঠিন। তাছাড়া আইটি সক্ষমতা ও ব্যায়ের বিষয়টা দেখতে হবে। যেহেতু ইউজিসি শিথিল নীতিমালা জারি করেছে, তাই তারা সেই পদ্ধতিকেই বেছে নিচ্ছেন। অর্থ্যাৎ অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশনসহ অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে গ্রেডিং করছেন তারা।

জানা যায়, করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে চলতি মাসের শুরুর দিকে ২৩টি নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)। ওই নির্দেশনায় চলমান সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিকল্প প্রস্তাবনা-২ এর দুই নাম্বারে বলা হয়েছে, চলমান সেমিস্টারে তত্ত্বীয় কোর্সের বিভিন্ন বিষয়ে রেজিস্ট্রিকৃত শিক্ষার্থীদের অনলাইনের মাধ্যমে ওই সকল বিষয়ের অসমাপ্ত পাঠ্যসূচি (যা ৩০ শতাংশের মত) সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হয়ে গেলে এবং অনলাইনের কার্যক্রম শুরুর আগে চলমান সেমিস্টারের বিভিন্ন বিষয়ে ইতোপূর্বে ক্লাসে উপস্থিতি পারফরম্যান্স, ক্লাস টেস্ট, মিডটার্ম পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়েছে তার নম্বর এবং অনলাইনে অংশের উপর অ্যাসাইনমেন্ট, ভার্চুয়াল প্রেজেন্টেশন নিয়ে যথাযথ স্বচ্ছতা ও মান নিশ্চিত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ফলাফল প্রকাশ করা যাবে।

মূলত ইউজিসির ওই নির্দেশনা মেনেই সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা না নিয়ে টার্ম পেপার, কুইজ এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ), গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, উত্তরা ইউনিভার্সিটিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্প্রতি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নোটিশে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আফরুজা সুলতানা জানিয়েছেন, ইউজিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি সেমিস্টারে ফাইনালে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। এর পরিবর্তে বাসায় অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হবে। এতে আরও বলা হয়েছে, ফ্যাকাল্টি মেম্বররা আগামী ১৮ মে গুগল ক্লাসরুম সেবার মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান করবেন। এগুলো সম্পন্ন করে ৪ জুনের মধ্যে জমা দিতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনে চলার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি স্কুল অব হিউমিনিটিস এন্ড সোসাল সাইন্স ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুর রব খান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ইউজিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি সেমিস্টারের অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করা হবে। তিনি বলেন, আগামী ১৮ মে থেকে অনলাইনে এসব অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ৪ জুন পর্যন্ত অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময় পাবে তারা। এরপর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আরও ১০ দিন সময় দেয়া হবে, এ সময়ের মধ্যে তারা এসব মূল্যায়ন করবে।

করোনার বন্ধে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ডিআইইউ) নিয়মিত অনলাইনে ক্লাস শেষে এখন অনলাইনে স্প্রিং সেমিস্টারের (জানুয়ারি-এপ্রিল) ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে) থেকে অনলাইনের মাধ্যমে শুরু হয় এই পরীক্ষা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইনের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট এবং ভাইভা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করবে।

এ বিষয়ে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচা‌র্য অধ্যাপক ড. কে এম মোহসিন জানান, দেশের এই সংকটময় মুহুর্তে ইউজিসির সকল নিয়ম মেনেই আমাদের পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।

ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবু বাকের সিদ্দিক জানান, আমরা জুম অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন পরীক্ষা নিচ্ছি। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপর অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে জমা নিচ্ছি। তাছাড়া জুম অ্যাপে মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান বলেন, করোনার শুরুর দিকে আমাদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছিল, এ জন্য সেশনজটে পড়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার ব্যবস্থা করায় সবকিছু আগের মতই আছে। এটাকে আমরা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। সিভিল বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ নোমান ইসলাম বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রতি সব সময় মানবিক ও দায়িত্বপরায়ণ আচরণ করেছে। তাদের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয় ।

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ আলম জানান, অনলাইন পরীক্ষা আমাদের কল্যাণের জন্যই। বাসায় থেকে এভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবো, সেটা শুধু ডিআইইউ আন্তরিকতার জন্য সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা সকলে যেন পরীক্ষা দিতে পারি তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যা আমার প্রাণের শিক্ষাঙ্গণকে মর্যাদার আরেক একধাপে পৌঁছে দিয়েছে ।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ঈদের পরে অনলাইনের মাধ্যমেই সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়া হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়েও অ্যাসাইনমেন্ট এবং ভাইভা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করা হবে বলে জানা গেছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ইউজিসির গাইডলাইন অনুযায়ী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। চলতি সেমিস্টারের গ্রেডিংটা কিভাবে হবে তা আলোচনা চলছে। তবে অ্যাসাইনমেন্ট এবং ভাইভার মাধ্যমে গ্রেডিং করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

করোনা বন্ধের আগে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রায় সব বিভাগে ক্লাস-প্রেজেন্টেশন শেষের দিকে ছিল। কিন্তু সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা নিতে পারেনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়েও টার্ম পেপার, কুইজ এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করছে। ইতোমধ্যে এসব প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ৪ মাসের সেমিস্টার হওয়াতে করোনা বন্ধের আগে অধিকাংশ বিভাগে ক্লাস-প্রেজেন্টেশন শেষের দিকে ছিল। কিন্তু সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়ার আগে করোনার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। তবে বাকি ক্লাসগুলো অনলাইনে নিয়েছি। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। তবে সেটি লিখিত আকারে নয়। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের থেকে টার্ম পেপার, কুইজ এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে এটি নেওয়া হচ্ছে।

উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে কুইজ এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং করবে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কিছু বিভাগে এমসিকিউ পদ্ধতিতে আবার কিছু বিভাগে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে সেমিস্টার গ্রেডিং করা হচ্ছে। তবে যারা অংশ নিতে পারছেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাদের কোন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলে জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে একটা পরীক্ষা দিয়েছি। নির্দিষ্ট সময়ে কিছু প্রশ্ন সলভ করতে হয়। তবে এ্ সিস্টেমের ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে তিনি মনে করেন।

জুনের প্রথম সপ্তাহের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী অ্যাসাইনমেন্ট ও ভাইভার মাধ্যমে চলতি সেমিস্টারের গ্রেডিং করবে গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশেও অনলাইনের মাধ্যমে সেমিস্টার ফাইনাল নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তাদেরকে অনলাইনে প্রশ্নের প্যার্টানে সমস্যা দিয়েছিল, এজন্য নির্দিষ্ট একটা সময় দেওয়া হয়েছিল। গুগল ক্লাস রুমে সঠিক সময়ে বসে পরীক্ষা দেওয়ায় কোন অসদুপায় করার সুযোগ ছিল না।

এ শিক্ষার্থীর মতে, গুগল ক্লাস রুমের মাধ্যমে পরীক্ষা হলে ডেডলাইনের দেওয়া সময়ের মধ্যেই প্রশ্ন সলভ করা যায়। এক্ষেত্রে যাদের এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল তাদের আগে থেকেই ইউনিভার্সিটি কতৃপক্ষ এ সমস্যার বিষয়ে জানানোর তাগিদ দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পর পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় এটেন্ড করতে পেরেছ।বাকিরা কেন অংশ নিতে পারেনি সে বিষয়ে যথাযত মতামত চাওয়া হয়েছে।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ