১১তম গ্রেড: আশ্বস্ত হতে পারছেন না সহকারী শিক্ষকরা

২৫ ডিসেম্বর। ২০১৭ সাল। বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে টানা কয়েকদিন অনশনের পর এদিন সন্ধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রায় ৪০জন প্রাথমিক শিক্ষক। যাদের মধ্যে ১৭ জনকে ঢাকা মেডিকেলে এবং কয়েকজনকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে ছুটে আসেন সে সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মোস্তাফিজুর রহমান। অনশন ভাঙিয়ে তিনি আশ্বাস দেন, ‘দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সব সমস্যার সমাধান হবে। আপনারা ফিরে যান।’

আন্দোলন ও মন্ত্রীর ওই আশ্বাসের পর দেড় বছর কেটে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে নতুন মেয়াদে, বদল হয়েছে মন্ত্রীত্ব; পরিবর্তন হয়েছে প্রাথমিক অধিদপ্তরের অন্য সব পদও। কিন্তু সহকারি শিক্ষকদের ভাগ্যের চাকা ঠিক ঘোরেনি। বরং সচিবের সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের ১৩ মে’র বৈঠকে আরো ১ বছর (প্রায়) আশ্বাসের সীমা বাড়ানো হয়েছে। নতুন ডেডলাইন ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ। সচিব আকরাম-আল-হোসেনের ভাষ্য, নিয়োগ যোগ্যতা উন্নীত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার বেতন গ্রেডও উন্নীত হবে। তবে তা মুজিব বর্ষ থেকে অর্থাৎ ২০২০ সালে ১৭ মার্চের মধ্যে। এ সময়ের মধ্যে কোনো প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হবে না বরং আগামীতে সহকারীরা শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত হবেন।

সচিবের ওই আশ্বাসকে প্রাথমিক বিজয় হিসেবে দেখছেন সহকারী শিক্ষক নেতারা। বৈঠকে অংশ নেওয়া ১৯ সদস্যের অধিকাংশই বলছেন, ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে; সচিবের আশ্বাসও যৌক্তিক। আশা করছি, আগামীতে শুধু ১১তম গ্রেড নয়, আমাদের অন্যান্য দাবিও বাস্তবায়ন হবে। সেজন্য আমাদের ধৈর্য ধরা উচিত।  বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ জানান, ‘আমরা সবসময় প্রতিবাদ করেছি। ২০ মে’র অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়ার পর আবারও আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে। আমরা তো আন্দোলন প্রত্যাহার করিনি; সাময়িক স্থগিত করেছি। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সামনে অনেক কিছুই করার সুযোগ আছে। সবিচ আমাদের বলেছেন, ‘আমি রোজা মুখে রেখে কথা দিচ্ছি আগামী মুজিব বর্ষ শুরুর আগেই আপনাদের সকল সমস্যা আমি সমাধান করব। আপনাদের একটুও বঞ্চিত করব না। কাজগুলো করার জন্য সময় দিতে হবে।’

বৈষম্য দূর করার আশ্বাস দিয়ে ২০১৭ সালের অনশন ভাঙান তৎকালীন মন্ত্রী

 

যদিও সচিবের ওই আশ্বাসে খুশি হতে পারছেন না অন্যান্য সহকারী তথা তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষকরা। বিষয়টি নিয়ে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে ১০জন শিক্ষকের কথা হয়েছে। আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, তারা আশ্বাসের গণ্ডিতেই আটকে আছেন। ২০১৭ সালে শহীদ মিনারের আন্দোলনে মন্ত্রী যখন অনশন ভাঙাচ্ছিলেন; তখন অনেকেই মন্ত্রীকে নতুন গ্রেড কবে দেওয়া হবে- তার সুনির্দিষ্ট ডেডলাইন ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা না করে ‘আলোচনা টেবিলে সব সমাধান হবে’ জানিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এরপর কেউ কেউ আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার কথা বললেও সামগ্রিক সিদ্ধান্তে চলে যান তারা। সহকারী শিক্ষকরা জানান, গত সময়ের মন্ত্রী তার কথা রাখেননি; বর্তমান সচিবের কথা ঠিক থাকবে- সেই নিশ্চয়তা তারা কীভাবে পাবেন?

দু’জন শিক্ষক জানান, সরকারের নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন  অন্তত ততোধিকবার বলেছেন, শিঘ্রই ১১তম গ্রেড দেওয়া হবে। সচিব মহোদয় বলেছেন, ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নে কাজ চলছে। কিন্তু ১৩মে হঠাৎ করেই সব কথা উল্টে নতুন করে এক বছর সময় নেওয়া হলো কেন? প্রশ্ন করেন তারা।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মো. আনোয়ার হোসেন নামে একজন লিখেছেন, ‘বছরের পর বছর শিক্ষকদের ধোকা দিয়ে বোকা বানানোর ইতিহাস রচনা করছে।’  আব্দুর রহমান বলছেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের পদ ১১তম গ্রেড তম আদৗও হবে কি-না সন্দেহ রয়েছে। আকলিমা নামে একজন বলছেন, দাবি আদায়ে আন্দোলনই একমাত্র পন্থা। সঠিক আন্দোলন হলে অনেক আগেই ১১তম গ্রেড পাওয়া যেত।

সহকারী শিক্ষকরা বলছেন, ‘প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের বেতনের পার্থক্য তিন ধাপ। তাদের দাবি ছিল প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেড। প্রধান শিক্ষকরা ১১ তম গ্রেড হলে তাদের দাবি ১২ তম। আর প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে পৌঁছলে আমাদের ১১তম গ্রেড দিতে হবে। কিন্তু খসড়া বিধিমালায় সেই দাবির প্রতিফলন নেই। স্বভাবতই নতুন পন্থা খুঁজতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষকের পরেই তাদের বেতন রাখার দাবি দীর্ঘদিনের। শুধু তাই নয়, বিষয়টি আত্মসম্মানেরও। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে, প্রধান শিক্ষকের পর সহকারী শিক্ষকদের বেতন হবে। কিন্তু তা না করে একধাপ পেছনে দেওয়ায় আত্মসম্মানে আঘাত দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক বেতন পান ১২ তম গ্রেডে (১১৩০০ টাকা বেতন স্কেল) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১তম গ্রেডে (১২৫০০ টাকা বেতন স্কেল)। আর প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষক ১৫ তম গ্রেডে (৯৭০০ টাকা বেতন স্কেল) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ১৪তম গ্রেডে (১০২০০ টাকা বেতন স্কেল) বেতন পান।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ