২৪ ভাষায় কথা বলতেন; সংস্কৃতের ছাত্র, শিক্ষক ছিলেন আইনেরও

  © ফাইল ফটো

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করা যে কয়জন রথী-মহারথী ছিলেন তাদের মধ্যে সবার সামনের দিকে রয়েছে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নাম। শৈশব থেকেই ভাষার প্রতি আলাদা নেশা ছিল তার। আর সেজন্যই ইংরেজি, লাতিন, আরবি, উর্দ্দু, ফারসি, জার্মানি, ফরাসি, হিব্রু, গ্রিক, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, সিংহলি, সিন্ধিসহ প্রায় ২৪টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন এই ভাষাবিদ।

১৮৮৫ সালের আজকের এইদিনে (১০ জুলাই) উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই দার্শনিকের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন গ্রামের এক মক্তব থেকে। মক্তবে পড়া অবস্থাতেই মীর মশাররফ হোসেনসহ বেশ কিছু লেখকের শিশুপাঠ্য বইসমূহ পড়েছিলেন। প্রাপ্ত বয়সে শুরু করেছিলেন অন্যান্য শিক্ষা।

১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (বর্তমানি এসএসসি’র সমমান) এবং ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ (বর্তমান এইচএসসি’র সমমান) পাশ করেন। ১৯১০ সালে সিটি কলেজ, কলকাতা থেকে সংস্কৃতে সম্মানসহ বি.এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ ডিগ্রি অর্জন। এছাড়াও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯২৮ সালে ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

ডক্টরেট শেষ করার আগেই তিনি গবেষণার কাজ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনার কাজ করেন ১৯২১ সাল থেকে। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাংলা ও সংস্কৃতের অধ্যাপক ও রিডারের দায়িত্ব পালন করেন।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকচক্রের সব রকমের আঘাতের বিরুদ্ধে বাঙ্গালি প্রতিরোধের পুরোধা ছিলেন ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করে দেয়া কিংবা আরবি হরফে বাংলা লেখার পাকিস্তানি অপপ্রয়াস তাঁর বিরোধিতার কারণে ফলপ্রসূ হতে পারেনি।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক-জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানিই প্রশস্ত হয়।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৪৪ সালে কয়েকবছর বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর আবার ফিরে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান ১৯৫৮-৫৯ পর্যন্ত। ১৯৬৭ সালে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানজনক পদক নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স দেয়। ঢাকা সংস্কৃত পরিষদ তাকে ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করে। পাকিস্তান আমলে তাকে ‘ প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পদক (১৯৫৮)’ ও মরণোত্তর ‘হিলাল ই ইমতিয়াজ খেতাব’ প্রদান করা হয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স তাকে সম্মানিত সদস্য (ফেলো) রূপে মনোনয়ন করে কিন্তু পাকিস্তান সরকারের অনুমতি না থাকায় তিনি তা গ্রহণ করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে মরণোত্তর ‘ডি. লিট’ উপাধি দেয়।

১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তার অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ঐ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদুল্লাহ হল। এছাড়াও তার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কলা ভবনের নামকরণ করা হয়।


মন্তব্য