অনলাইনে উচ্চশিক্ষা: কতটা কার্যকর?

  © সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাব পুরো বিশ্বকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। পাঁচ মাস ধরে স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা, অর্থনীতি থেকে রাজনীতি- সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিভিন্ন খাতের কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষা খাত এখনো কার্জত লকডাউনে বন্দী।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ১.৩ বিলিয়ন শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বর্তমানে দূরে অবস্থান করছেন। বিজনেস ইনসাইডার জানিয়েছে, সারা বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশের শিক্ষার্থীরা করোনাকালে সরাসরি ক্ষতির সস্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি দৃশ্যমান না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির মেয়াদ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে সরকার।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তাও বলা মুশকিল। এমন এক বাস্তবতায় একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি। এটা সত্য যে, দীর্ঘমেয়াদী এই সংকটের শুরুর দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অপারেটিভ মুডে রাখার বিষয়ে সরকারি প্রচেষ্টা লক্ষণীয় ছিল না; তবে কিছুদিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখতে এগিয়ে আসে। এই এগিয়ে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এ বিষয়ে একটি কথা অবশ্যই বলতে হবে, করোনা সংকটের একেবারে শুরুতেই কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে ইউজিসির সিদ্ধান্তের রকমফের কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি করলেও পরবর্তীতে ইউজিসির নির্দেশনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেয়।

করোনা সংকটের শুরুতেই যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রদান এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার অব্যাহত রাখতে বিকল্প পদ্ধতি বেছে নেয় - তার মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) অন্যতম। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি সংকটের শুরু থেকেই অনলাইন টুলসের মাধ্যমে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে ইতোমধ্যে স্প্রিং সিমেস্টারের ক্লাশ পরিচালনা, পরীক্ষা আয়োজন, ফল প্রকাশসহ যথাযথভাবে সিমেস্টার শেষ করা হয়েছে। একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

নিজ অভিজ্ঞতা থেকে যে কথা না বললে নয়, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি তার যাত্রার শুরু থেকেই শিক্ষায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। অনলাইন টুলস ব্যবহারের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠদানের পদ্ধতিকেও রপ্ত করার প্রচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছিল। এজন্য ড্যাফোডিল প্রথম দিকে শিক্ষণ এবং শেখার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লার্নিং ফিডব্যাক সিস্টেম (এলএফএস) ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল; পরবর্তীতে এলএফএসের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে গুগল ক্লাসরুম ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয় এবং তা বাস্তবায়ন করে।

বর্তমানে একাডেমিক পেশাদারিত্ব নিশ্চিতে ড্যাফোডিল কর্তৃপক্ষ মুডল (লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) অনুশীলন করেছে- যা নিঃসন্দেহে অনলাইন শিক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমানে ড্যাফোডিলের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগত দক্ষতা নিশ্চিত করতে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) ব্যবহার করছেন, যা ব্লেন্ডেড লার্নিং সেন্টার (বিএলসি) নামে পরিচিত। উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব এলএমএস থাকলেও পাঁচ বছর ধরে ড্যাফোডিল এই প্লাটফর্ম ব্যবহার করছে।

চলমান সিমেস্টার (সামার-২০২০) পুরোটাই বিএলসি ব্যবহার করে সম্পন্ন করার পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত তিন মাসে এই প্লাটফর্মের ব্যবহারের কার্যকারিতাও লক্ষ্য করা গেছে। বিএলসি-তে রেকর্ডেড ক্লাস সরবরাহ, ক্লাস পরিচালনা, এবং ভিডিও লেকচার সরবরাহ, গ্রুপ স্টাডি, পরীক্ষা আয়োজন, স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ণ পদ্ধতি, গ্রেড শিট প্রস্তুত করাসহ অনলাইন পাঠদানের সব সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।

বিএলসির ওয়েবসাইটে থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ডিআইইউ-বিএলসিতে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ৮৩৬ জন শিক্ষক ৪১৪০টি নিয়মিত কোর্স পরিচালনা করছে। গত তিন মাসে ডিআইইউ-বিএলসি ব্যবহারকারীর সংখ্যাো প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। সার্বিক বিবেচনায় আমার কাছে একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির এই পদক্ষেপ যুগান্তকারী বলে মনে হয়েছে।

অনলাইনে উচ্চশিক্ষা প্রদানের পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলতে পারি, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে এসে বিশ্বের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বাংলাদেশের সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই অনলাইন পাঠদানের মাধ্যমকে বিবেচনায় আনতে হবে। করোনা সংকট চলমান থাকুক কিংবা না থাকুক সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত কিছু কোর্স কিংবা বিশেষায়িত কোর্স কিংবা প্রতি কোর্সের কিছু অংশ অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

কেন বলছি এই কথা- কারণ মহামারী ছাড়াও সাধারণত আমেরিকা-ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাসরুম শিক্ষার পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। এছাড়া অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার নানান ইতিবাচক দিত তো আছেই। এই অনলাইন শিক্ষাই শিক্ষাকে সময় এবং স্থান থেকে আলাদা করে তুলেছে। ব্যবহারকারীরা যে ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে ৭দিন অনলাইন শেখার উপকরণগুলিতে প্রবেশাধিকার পান, এটি অনলাইন লার্নিং সিস্টেমের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

এছাড়াও স্থান এবং সময় স্বাধীনতা; ব্যয় হ্রাস; সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ; এলএমএস ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি; বিনামূল্যে ম্যাসিভ অনলাইন ওপেন কোর্সেস (এমওওসি)-এ অংশগ্রহণ; শ্রেণিবদ্ধ শিক্ষার পরিপূরকতা ইত্যাদি অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

আমি মনে করি, তথ্য-প্রযুক্তির (আইটি) সাথে ইতিবাচক সম্পৃক্ততায় এবং শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতির ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনে অনলাইন শিক্ষা শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত তৈরি করবে। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সুবিধার অভাবে, প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধাঁ হিসেবে কাজ করছে। প্রযুক্তিভীতি এবং সচেতনতার অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ বলা যায়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রযুক্তি ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করে অনলাইন ক্লাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই অনলাইন পাঠদানকে শিক্ষার কার্যকর একটি মাধ্যম হিসেবে আমরা পরিচিত করে তুলতে পারব।

আমি মনে করি, আগামীতে সম্ভাব্য ঘটতে যাওয়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লব-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা নতুন দ্বার উন্মোচনের ইঙ্গিত করছে। এজন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সেঞ্চুরিটেক, ক্লাস ডোজো, এডমোডো, গুগল ক্লাসরুম, মুডল, স্কুলার, ম্যাসিভ ওপেন অনলাইন কোর্স (এমওওসি): কোর্সেরা, অ্যালিসন, ক্যানভাস নেটওয়ার্ক, এডএক্স-এর সাথে পরিচিত করে তুলতে হবে।

এক্ষেত্রে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বশেষ আমি মনে করি, পরিবর্তিত বিশ্বে খাপ খাইয়ে নিতে অনলাইনে শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারার সাথে সংহত করার বিকল্প নেই।

লেখক: সিনিয়র লেকচারার,

উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি


মন্তব্য