৩০ জুন ২০২০, ১৩:২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও গৌরবের ৯৯ বছর

  © টিডিসি ফটো

পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষের ক্ষমতা ইংরেজদের কবজায় চলে গিয়েছিল। ১৯০ বছর পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ থাকার পর, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের ভাগ্যে এক ধরনের মুক্তি মেলে। কিন্তু, ইতিমধ্যেই  ইংরেজ শাসনামলের ১৯০ বছরে ঘটে গেছে হাজার-হাজার ঘটনা। তার মধ্যকার উল্লেখযোগ্য  হল বঙ্গবঙ্গ ও বঙ্গবঙ্গ রদ হওয়ার ঘটনা। যেটি পুরো ভারতবর্ষে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সাথে বঙ্গভঙ্গ রদের নিবিড় সম্পর্ক দেখিয়েছেন। ইংরেজ শাসনামলে বিহার উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে ছিল বঙ্গপ্রদেশ। ক্রমশঃ এত বিশাল ভূখণ্ড পরিচালনা করা ইংরেজ সরকারের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এজন্য ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর, লর্ড কার্জন, তাদের শাসন ব্যবস্থার সুবিধা ও উন্নয়নকল্পে বঙ্গ প্রদেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করে উড়িষ্যা, প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান নিয়ে একটি প্রদেশ এবং  ঢাকা, চট্টগ্রাম বিভাগ ও আসাম নিয়ে পূর্ববঙ্গ নামের আরো একটি প্রদেশ গঠন করেন। যেটির রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে মনোনীত করা হয়।

বঙ্গভঙ্গের কারণে পূর্ব বাংলার মানুষ ইংরেজ সরকারের প্রতি অনেকটাই খুশি হয় এবং তারা এই অনুন্নত অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে থাকে। এমন অবস্থায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসসহ বিভিন্ন শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ নানান যুক্তি দেখিয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেন। একসময় সরকার তাদের দাবি মানতে বাধ্য হলেন।

অবশেষে, ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর, সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লির দরবার হলে এক ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ রহিত করেন। যার কারণে, পূর্ববঙ্গের মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং সরকার ও বিরোধীদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। পূর্ববঙ্গের মানুষের এরকম অসন্তোষ বুঝতে পেরে, লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ঢাকায় আসেন। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হক ও অন্যান্য সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানালে, লর্ড হার্ডিঞ্জ তাদের দাবি মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। এ দাবির সাপেক্ষে, ১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে  সরকারি ঘোষণায় একটি বিল পাস হয়। 

বঙ্গভঙ্গের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও চরম বিরোধিতা করেছে কলকাতার একদল শিক্ষাবিদ। এমনকি ১৯১২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারিতে, ডক্টর রাসবিহারী ঘোষ এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষাবিদ ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করতে বিভিন্ন যুক্তি ও জোর দাবি তুলে ধরেন। তবুও তারা লর্ড হার্ডিঞ্জকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সড়াতে সক্ষম হননি।

তার কিছুদিন পরই ১৯১২ সালের ২৭ মে, ব্যারিস্টার নাথনিয়েলের নেতৃত্বে, ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত হয় এবং ১৯১৩ সালে জনসাধারণের সম্মুখে ২৪ অধ্যায় বিস্তৃত তারা একটি ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করলে, ওই বছরের ডিসেম্বরেই ভারত সরকার কর্তৃক তা গৃহীত হয়।

তারপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হতে থাকে। এজন্য নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ভারতীয় আইন পরিষদে বিষয়টা তুলে ধরেন। যার কারণে কার্যক্রম কিছুটা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে একেবারে তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর ১৯১৫ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীকে অনেক বেশি শ্রম দিতে হয়।  ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে, তিনি ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাসের আহ্বান জানান।

তাছাড়াও ১৯১৭ সালে, স্যাডলার কমিটি  ইতিবাচক রিপোর্ট প্রধান করলে, ১৯২০ সালে ভারতীয় আইনসভা "দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং- ১৩) ১৯২০" পাশ করে। যেটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। উক্ত বিলের বাস্তবায়ন হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই।

বহুল প্রতিক্ষা ও চতুর্মুখী বাধা-বিপত্তির পর ৬০ জন শিক্ষক ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী, ৩ টি অনুষদ, ১২ টি বিভাগ ও তিনটি হল নিয়ে, ঢাকার প্রায়  প্রাণকেন্দ্রে রমনা এলাকার সৌন্দর্যপূর্ণ প্রায় ৬০০ একর জমিতে যাত্রা শুরু হয় পূর্ব বাংলার সেই কাঙ্খিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন যথাক্রমে মি. পি. জে হার্টগ, খানবাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ এবং মি. জে. এইচ. লিনডসে আই.সি.এস. প্রমুখ।

শুরুর দিকে ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনসহ আসাম ও পূর্ব বঙ্গের অনেক পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস পরিচালিত হয়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুব স্বল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করলেও ক্রমশ দেশে-বিদেশে ইতিবাচক যশ-খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

প্রথম দিকে শিক্ষার উচ্চ মান বজায় রাখতে এর ছাত্র-শিক্ষকগন ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং এর সিলেবাস প্রণীত হয়েছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের অক্সব্রিজ শিক্ষা ব্যবস্থার অনুসরণে। আর বিভিন্ন বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা কঠোরভাবে এর মান নিয়ন্ত্রিত হবার কারণে, এটি এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ টি ফ্যাকাল্টি, ৮৩ টি বিভাগ, ১২ টি ইনস্টিটিউট, ৫৬ টি গবেষণা কেন্দ্র, ২০ টি আবাসিক হল, ৩ টি হোস্টেল, ৩২৮ টি ট্রাস্ট ফান্ড, ৩৭০১৮ জন শিক্ষার্থী, ১৯৯২ জন শিক্ষক ও এর আওতাধীন বিভিন্ন স্থানে ১০৫ টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বৃহৎ পরিসরে নিজস্ব লক্ষ্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাছাড়াও ১০৩০ জন অফিসার, ১১৩৭ তৃতীয় শ্রেণির ও ২২৫০ জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সমন্বয়ে, ২৭৫.০৮৩ একর আয়তনের স্থানে সম্পন্ন হচ্ছে এর প্রাতিষ্ঠানিক কাজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যেগুলি থেকে শিক্ষার্থীরাসহ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সর্বস্তরের জনসাধারণ উপকৃত হচ্ছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস, পদার্থবিজ্ঞানী এ এফ এম ইউসুফ হায়দার এবং বুদ্ধদেব বসুর মতো হাজারো শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীগণ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন বা এখনো করে যাচ্ছেন।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ঐতিহাসিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। দেশের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রেখেছে অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। প্রতিনিয়ত তৈরি করেছে স্বর্ণোজ্জ্বল ও অতুলনীয় ইতিহাস।

পাকিস্তানি শাসকরা যখন বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, ঠিক তখনই বাংলার দামাল ছেলেরা ভাষাকে রক্ষার স্বার্থে জীবন দানের পথ বেছে নিয়েছিল। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, নূরুল হক ভূঁইয়া এবং অলি আহাদ সহ অনেকেই উক্ত আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এমনকি পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যেও অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ৩ নেতার একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাছাড়া যুক্তফ্রন্ট ভিত্তিক স্বাধিকার আন্দোলনে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃষক শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের সমন্বয় ছিল। তখনকার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, শামসুল হক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের অধিকাংশই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাছাড়াও ছাত্রলীগের পাশাপাশি বাংলার অধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধু, "স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদ" ও "বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট" নামে দুটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খাঁ ও মোনেম  বিরোধী আন্দোলনও করেছিল তারা।

১৯৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে, সিরাজুল ইসলাম, আল আমিন চৌধুরী, শেখ ফজলুল হক ও আবদুর রাজ্জাকসহ অনেকে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাছাড়াও ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

১৯৭০ এর নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পৃক্ত এমন বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছিল।  তার মধ্যে কিংবদন্তি নেতা তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আবদুর রাজ্জাকসহ আরো অনেকে।

১৯৫২, ৫৪, ৬২, ৬৪, ৬৬, ৬৯ ও ৭০ এ পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার অধিকার আদায় ও পশ্চিম পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অতুলনীয় ভূমিকা রাখায়, পাকিস্তানিদের আর  বোঝার বাকি রইলো না যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের জন্য কতটা বিপদজনক। এজন্য ২৫ শে মার্চ রাতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গুরুত্বপূর্ণ এক লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়েছিল।

তারই প্রেক্ষিতে ২৫ শে মার্চে রাতেই তাদের ঘৃণিত আক্রমণে, সরাফত আলী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ সহ সম্মানিত ১৯ জন শিক্ষক, ১০১ জন শিক্ষার্থী ও ২৮ জন কর্মচারী নিহত হয়। ২৬ শে মার্চ সকালবেলায় সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮  ইউনিটের কথোপকথন অনুযায়ী ক্যাম্পাসেই ৩০০ জন নিহতের কথা জানা যায়।

২৫ শে মার্চের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর পরিমাণ কমতে শুরু করে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অগ্রগামী হওয়ার সাথে সাথে আবার ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এমনকি শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত কলাভবনের আশেপাশে গ্রেনেড ফাটিয়ে ক্লাসে ঢুকে পড়তো। পাক সেনাবাহিনী তখন কাউকে ধরতে না পেরে এবং  তখনকার বটতলা থেকে সব আন্দোলনের উৎপত্তিস্থল ভেবে ঐতিহাসিক বটগাছটিই গুড়িয়ে দেয়। এভাবে দীর্ঘ নয় মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ও বিভিন্ন স্থানে  মাতৃভূমিকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শিক্ষকগনও ছিলেন দেশের স্বার্থে  নিবেদিতপ্রাণ।

১৯৮২ সালেই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এ আন্দোলনের সকল কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এভাবে ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত বিক্ষোভে নিহত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। ১৯৮৫ সালে, স্বৈরাচার সরকারের আতংক, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দানকারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, রাউফুন বসুনিয়া সামরিক সরকার সমর্থকদের গুলিতে প্রাণ হারান।

১৯৯০ সালের ১০ই অক্টোবর স্বৈরাচারী সরকারের সামরিক বাহিনীর গুলিতে জেহাদ নামের আরো একজন নিহত হলে, সেই লাশকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরী হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ২৪ টি ছাত্র সংগঠন এক হয়ে "সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য" গড়ে তোলে তুমুল আন্দোলন শুরু করলে, ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে স্বৈরাচার সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেককেই প্রাণ দিতে হয়।

এভাবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছায়ার মত দেশের পাশে দাঁড়িয়ে, সকল অন্যায় ও অসঙ্গতি  মোকাবেলার চেষ্টা করেছে এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন আর অধিকারের কথা বলেছে। তাছাড়া একুশ শতকেও, এটি দেশের স্বার্থে যখন যে আন্দোলন বা চাহিদার প্রয়োজন হয়েছে সেই চাহিদাই পূর্ণ করার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপরিধির উপর ভিত্তি করেই হয়তোবা বলা হয় যে, অন্যান্য দেশ তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে একটি দেশের। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্মের এই ৯৯ বছরই যেন বাংলাদেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলা ও কাজ করার ইতিহাস।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়