বাজেট হতে হবে পর্যটন বান্ধব

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া  © ফাইল ফটো

কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে নতুন অর্থবছর। বাংলাদেশে জুলাইয়ের প্রথমদিন থেকে শুরু হয় নতুন অর্থবছর। জুন মাসে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয় জাতির জন্য। তবে বর্তমানে একটি বিশেষ পরিবর্তিত সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। করোনা ভাইরাসের ফলে সারা পৃথিবী সকল কর্মকাণ্ড একরকম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর জুনের প্রথমদিন থেকে কিছুটা সচল করার চেষ্টা চলছে। তবে মানুষের জীবন যাত্রা কবে পরিপূর্ণ ভাবে স্বাভাবিক হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন শিল্প।

চীন থেকে উৎপত্তি হওয়া করোনা ভাইরাসে এই পর্যন্ত বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ আর প্রায় হারিয়েছে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্ত যোগাযোগ। বাংলাদেশে এই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৬০ হাজারের অধিক মানুষ আর প্রায় হারিয়েছে ৮ শতাধিক। এই পরিস্থিতিতে নেমে এসেছে ব্যবসা বানিজ্যসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ আছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সময়ের বাজেট হতে যাচ্ছে করোনা থেকে সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুরক্ষা করা ও মানুষের জীবন জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করা।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালের শুরুটা পর্যটনের জন্য বেশ ভালই ছিল। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে পর্যটকের সংখ্যা বিগত বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশী ছিল। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রায় পর্যটক শূন্য দেশগুলো। বিশ্বব্যাপী লকডাউন জোরদার হওয়ার সাথে সাথে পর্যটকের সংখ্যাও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তবে জুনের শুরু থকে কিছু দেশ লকডাউন শিথিল করলেও এখন পর্যন্ত পর্যটনে খরা কমেনি। আর বিশ্বে করোনার প্রভাব কত দিন থাকবে তা এখনি সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আর এর প্রভাবে লকডাউন কার্যক্রম কত দিন থাকবে তাও বলা যায় না।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থা সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বের শতভাগ পর্যটন স্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এইসকল স্থানে প্রায় চার সপ্তাহ এবং কিছু কিছু স্থানে তারো অধিক সময় থেকে এই বিধি নিষেধ চলছে। এই রিপোর্টে ২১৭ স্থানের উপর জরিপ চালানো হয়। যাতে বলা হয় ৪৫ শতাংশ স্থান পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বা আংশিক ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, ৩০ শতাংশ স্থান আংশিক বা পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করেছে, ১৮ শতাংশ দেশ নির্দিষ্ট দেশ থেকে আগত পর্যটকদের জন্য নিষেধ আরোপ করেছে। ৭ শতাংশ দেশ আরো বিভিন্ন প্রকার বিধি নিষেধ আরোপ করেছে।

তবে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা তিন ধরনের পূর্ভাবাস দিয়েছে। যাতায়াতের উপর বিধি নিষেধের উপর ভিত্তি করে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে। যদি জুলাই পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে তবে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম হবে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হলে তা ৭০ শতাংশ হবে আর ডিসেম্বর পর্যন্ত হলে তা গিয়ে দাঁড়াবে ৭৮ শতাংশ। যা পর্যটন শিল্পের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিক নির্দেশ করছে। একই সাথে এর প্রভাব পড়বে পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মসংস্থানে। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে এই সমেয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন চাকুরি ক্ষতির মুখে পড়বে। বাংলাদেশ ও এইরকম প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশেও ২০২০-২১ সালের বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।প্রতি বছর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই খাতের জন্য বরাদ্ধ হয়ে আসছে।এই বাজেটে নাম মাত্র পর্যটন জন্য ৫০/৬০ কোটি টাকা বরাদ্ধ পায় আর বাকি টাকা বরাদ্ধ হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন জন্য। ট্যুরিজমের জন্য আলাদা বাজেট থাকা এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। করোনায় এখাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আলাদা বাজেট প্রণয়ন করার জন্য জোরালো দাবি জানাচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের জন্য বাজেটে বড় ধরনের বরাদ্ধ প্রয়োজন এই শিল্পকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য।

করোনায় বাংলাদেশের পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত সকল প্রকার ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিকে থাকতে প্রয়োজন সরকারের বিশেষ প্রণোদনা। তাছাড়া পর্যটনের সাথে জড়িত অনেকের কর্মসংস্থান পড়েছে হুমকির মুখে। আর বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুসারে করোনা ভাইরাসের প্রভাব থাকবে আরো প্রায় ১ থেকে ২ বছর থাকতে পারে। ফলে এই লম্বা সময় পর্যটন শিল্পকে টিকে থাকতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে সুচিন্তিত পদক্ষেপ দরকার।

তাছাড়া বর্তমানে পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট চালু আছে। এইগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বরাদ্দের। এইসকল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। পর্যটনের সাথে জড়িত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গলোকে বাঁচাতে দিতে হবে ইনসেন্টিভ।

২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের ভূমিকা ছিল জিডিপিখাতে ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। যা মোট জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ। বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৪.৪ শতাংশ। এবং কাজ করে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ। করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে চাকুরী হারাবে প্রায় ৭.৫ কোটি পর্যটন কর্মী। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প একটি উদীয়মান শিল্প। বিগত কয়েক বছরে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নতি চোখে পড়ার মত। তবে করোনা ভাইরাসের সকল প্রকার হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে, ২০২০ পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯,৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩,০৯,৫০০ জন তাদের চাকুরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। হোটেল/রিসোর্ট এবং রেস্তোরায় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২,৫০,০০০ জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে ৩,০০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫,০০০ জন, ট্যুর অপারেশনে ৪,০৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমিষ্টিক) এবং কর্মহীন প্রায় ৪১,০০০ জন, পর্যটন পরিবহণ ও পণ্যবাহী জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীনের সংখ্যা হবে প্রায় ১,৫০০ জন।

সারা পৃথিবীর মত করোনার থাবা বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতেও পড়েছে। বাংলাদেশ বিমানের তাদের সকল ফ্লাইট বিগত ২ মাসের অধিক সময় ধরে বন্ধ রেখেছে। বিমান চলাচল কবে নাগাদ স্বাভাবিক হয় তা এখনি বলা যাচ্ছে না। এর ফলে আর্থিক দিক থেকে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই শিল্পখাতটি। পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাদে অন্যান্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সে ৬০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২,০০০ জন। তাছাড়া বেশকিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রভাব কেটে গেলেও সমগ্র পৃথিবীতে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জুনের শুরু থেকে নতুন নিয়মে বিমান চলাচল করলেও রয়েছে যাত্রী সংকট।

পর্যটন শিল্প পৃথিবীর একক বৃহত্তম শিল্প হিসাবে স্বীকৃত। পর্যটনের গুরুত্ব সার্বজনীন। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত। পর্যটন ১০৯ টি শিল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত। পর্যটন বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার। পর্যটনের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়ে থাকে। ২০১৭ সালে বিশ্বের জিডিপিতে ট্যুরিজম অবদান ছিল ১০.৪ শতাংশ যা ২০২৭ সালে ১১.৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে। এছাড়া ২০১৭ সালে পর্যটকদের ভ্রমণখাতে ব্যায় হয়েছে ১৮৯৪.২ বিলিয়ন ডলার। আর একই বছর পর্যটনে বিনিয়োগ হয়েছে ৮৮২.৪ বিলিয়ন ডলার। পর্যটনকে বলা হয় একটি শ্রমবহুল ও কর্মসংস্থান তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। বর্তমানে পৃথিবীর ১০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে ১ টি কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাত। ২০১৭ সালে প্রায় ১১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৪ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাতে। যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খাত মিলিয়ে প্রায় ৩১ কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট কর্মসংস্থানের ৯.৯ শতাংশ তৈরি হয় পর্যটন খাতে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি খাতে পর্যটন শিল্পের মোট অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। আর এইখাতে কর্মস্থান তৈরি হয়েছে মোট ২৪ লাখ ৩২ হাজারটি। সুতরাং এই পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায় আমাদের দেশ পর্যটন শিল্পে কতটা পিছিয়ে আছে।

করোনার প্রভাব সাময়িক। এর প্রভাব একসময় চলে যাবে। তবে বাংলাদেশের পর্যটন খাত সব সময় উপেক্ষিত থেকে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব সময় সময় লক্ষ করা গেছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাব চলে গেলেও পর্যটন খাত স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে। কারণ করোনার প্রভাবে পৃথিবীর অনেক মানুষের বেকার হয়ে পড়েছে। মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে। ফলে জীবন যাত্রার মানও কমে গেছে। তাই মানুষ আগের চেয়ে ভ্রমণ কম করবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে সবাই ভ্রমণ পরিকল্পনা করবে। এই সকল কারণে করোনার প্রভাব ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও পর্যটন খাত স্বাভাবিক হতে আরো দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তাই এই সঙ্কট সময়ে এই শিল্পকে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন বিশেষ বরাদ্দ।

লেখক: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


সর্বশেষ সংবাদ