ডায়াবেটিস রোগীর করোনায় মারাত্মক ঝুঁকির সম্পর্ক ও সতর্কতা

  © টিডিসি ফটো

কোভিড-১৯ রোগটি নতুন মারাত্মক রোগ। ইতিপূর্বে মানুষের জন্য ক্ষতিকর কয়েকটি করোনাভাইরাসের (যেমন, সার্স-কোভ-১, মার্স-কোভ) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, তবে সেগুলো কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী নভেল সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাসের মত এতটা তীব্র সংক্রামক ছিল না। মারাত্মক ক্ষেত্রে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ফুসফুসে প্রদাহ (নিউমোনিয়া), কিডনি ফেইলিউর ও এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন ও ফলপ্রসূ চিকিৎসা নাই।

কোভিড-১৯ রোগের প্রধান লক্ষণগুলো ফ্লুর সাধারণ লক্ষণের মত হয়, যেমন জ্বর, কাশি, ক্লান্তি, শরীরে ব্যথা। কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ সচরাচর ৩-৭ দিনের মধ্যে প্রকাশ হয়। যে কোন বয়সের মানুষ কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে যাদের ডায়াবেটিস, ফুসফুসে প্রদাহ বা হৃদরোগ আছে, তাঁরা অতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকে।

ডায়াবেটিস একটি ক্রনিক বিপাকীয় রোগ যার ফলে রক্তে অধিক মাত্রায় গ্লুকোজ (বা ব্লাড সুগার) পাওয়া যায়। অনেক দিন ধরে রক্তে উচ্চ মাত্রায় গ্লুকোজ থাকলে হৃদপিন্ড, রক্তনালী, চোখ, কিডনি ও স্নায়ুর ড্যামেজ ঘটে। ডায়াবেটিস দুই ধরনের হয়, টাইপ-১ ডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস। আমেরিকান ডায়াবেটিক এ্যাসোসিয়েশন প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীদের ৫% টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ৯৫% টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

যখন মানবদেহের অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস), ইনসুলিন হরমোন তৈরি প্রায়ই বা সম্পূর্নভাবে বন্ধ করে দেয়। এটিকে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়। ইনসুলিন হরমোন, দেহ কোষে সুগার বিপাকের চাবি হিসেবে পরিচিত; যা দেহকোষের তালা খুলে রক্তের গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশের সিগন্যাল দেয়। খাদ্য গ্রহণের পর পরিপাকের মাধ্যমে উৎপন্ন গ্লুকোজ রক্তে যায় এবং রক্তের গ্লুকোজ ইনসুলিনের সাহায্যে কোষে প্রবেশ করে এবং তা বিপাকীয় পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস অটোইমিউন ডিজিজ, যখন দেহের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম অগ্নাশয়ের আইলেট অফ ল্যাঙ্গারহান্স কোষগুলিকে (যে কোষগুলো ইনসুলিন উৎপাদন করে) ধ্বংস করে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস সাধারণত কম বয়সীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্ক না থাকলেও, টাইপ-২ ডায়াবেটিস পূর্ণবয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার (অধিক শর্করা গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম/ব্যায়ামের ঘাটতি) সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি কমন রোগ। মানুষের দেহ যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপন্ন করতে পারে না এবং উৎপন্ন ইনসুলিন অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যায়। সাধারণত অনেকদিন যাবত অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণ ও পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম/ব্যায়ামের ঘাটতির কারণে দেহের ইনসুলিন অকার্যকর হয়ে পড়ে (যা "ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স" নামে পরিচিত)।

ডায়াবেটিসের সাথে কোভিড-১৯ রোগের খুব মারাত্মক ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। এপ্রিল ২৩, ২০২০ তারিখের "জার্নাল অফ ইনফেশন" এর অনলাইনে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, ১৩টি স্ট্যাডিজের রিভিউয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন, ডায়াবেটিস রোগ থাকার কারণে কোভিড-১৯ রোগের ক্রিটিকাল (জটিল) অবস্থা বা মৃত্যুর সম্ভাবনা, কোন ক্রনিক স্বাস্থ্য সমস্যা (যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসে সমস্যা ইত্যাদি) না থাকা কোভিড-১৯ রোগীর চেয়ে প্রায় ৩.৭ গুণ বেশি ছিল।

এপ্রিল ৯, ২০২০ তারিখের "জার্নাল অফ ডায়াবেটিস রিসার্চ এন্ড ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস" এর অনলাইন প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা রিপোর্ট করেছেন, বয়স্কদের যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের ফ্লুর কারণে সচরাচর নিউমোনিয়া হয় এবং মারাত্মক রূপ ধারণ করে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ রোগটি মারাত্মক হওয়ার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা নভেল করোনাভাইরাস SARS-CoV-2 দ্বারা সরাসরি অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন-উৎপাদনকারী কোষগুলির ক্ষতিসাধন বিবেচনা করছেন।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ফলে ব্লাড সুগারের ক্রমবৃদ্ধি, কোভিড-১৯ রোগের সাথে লড়াইয়ে জড়িত দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যবস্থাগুলোর ক্ষতি সাধন করে (তথ্যসূত্রঃ যুক্তরাস্ট্রের বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট "লাইভ সায়েন্স")। ফলে কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী করোনাভাইরাস SARS-CoV-2 দ্বারা আক্রান্তের ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের আরোগ্য লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। "জার্নাল অফ ডায়াবেটিস রিসার্চ" এ প্রকাশিত রিভিউ আর্টিকেলে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, ডায়াবেটিস ও স্থুলতার কারণে দেহের সংক্রমণের লড়াইয়ে সহায়তাকারী "শ্বেত রক্ত কণিকা" এবং "বি" কোষ উভয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অধিকিন্তু, করোনাভাইরা, মানবদেহের রক্তের উচ্চ গ্লুকোজ মাত্রা দ্বারা সতেজ ও সমৃদ্ধ হয় (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন)।

ডায়াবেটিক রোগীরা (বিশেষভাবে টাইপ-১ এর ক্ষেত্রে) ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) ঘটে থাকে, যখন রক্তে সুগারের মাত্রা বেশী থাকে, ফলে কিটোনস নামক অম্ল (এসিড) জাতীয় পদার্থ মারাত্মক মাত্রায় দেহে তৈরি হয়। ডিকেএ এর ফলে দেহের গুরুত্বপূর্ন ইলেকট্রোলাইটস অনেক কমে যায়। ইলেকট্রোলাইটস হচ্ছে, ইলেক্ট্রিকালি চার্জড খনিজ পদার্থ; যা হৃদপিন্ড ও স্নায়ুগুলোকে (নার্ভস) ঠিকভাবে কাজ করতে সহযোগিতা করে।

কোভিড-১৯ রোগের আক্রান্তের ফলে ডায়াবেটিক রোগীদের মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হলেও, ডায়াবেটিক রোগীদের সাধারণ জনগণের তুলনায় করোনাভাইরাস দ্বারা অধিকতর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নাই। রক্তের সুগার ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস উভয় ক্ষেত্রের রোগীদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ রোগ মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। রক্তের সুগারের মাত্রা বেশী থাকলে ভাইরাস সংক্রমণের সময় দেহের লড়াইয়ের সক্ষমতা আপোষমুখী হয়ে যায়।

লেখক: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ