ব্যাংকিং খাতে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি, প্রস্ততি নিতে হবে এখনই

  © টিডিসি ফটো

করোনাভাইরাসে নাজেহাল প্রায় পুরো বিশ্ব, আর সংক্রমণ ঠেকাতে একের পর এক দেশ ঘোষণা করছে লকডাউন নীতি বা বন্ধ জীবন যাপন। জোরালো হচ্ছে সামাজিক ও শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখার কঠোর আইন। বন্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণচঞ্চল স্থাপনা ও কর্মক্ষেত্র কিন্ত এর মাঝেই কিছু মানুষের কর্মক্ষেত্রে থাকাটাই অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিণত হয়েছে এই কয়দিনে। বিশেষ করে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নার্স, আইন শৃংখলা ঠিক রাখতে আর্মি, পুলিশসহ অন্যন্য সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হচ্ছে এই মহামারী সংকটের দিনগুলোতে।

একইভাবে সকল দেশই তাদের মূল চালিকা শক্তি অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখার। প্রথাগত নিরাপত্তা বাহিনী না হলেও এই সেক্টর যে আপদকালীন সময়ে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্বে তা এই লকডাউনকালীন সময়েও মানুষ উপলব্ধি করছে প্রতিনিয়ত। কিন্ত ব্যাংকিং কার্যক্রমে সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে মাশুল দিতে হতে পারে দেশের করোনা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে।

২.

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণে এটা অনস্বীকার্য যে, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা অনিবার্য। তাই এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখাও সম্ভব নয়, নাহলে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট আরেক মহামারী আকার ধারণ করবে আর তাই ব্যাংকিং কার্যক্রমও বন্ধ রাখা যাবে না। কিন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত কয়েকদিনের কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মানুষের সচেতনতা ততটা আশানুরূপ নয় এবং ভয়ানক ব্যাপার হলো ব্যাংকের গ্রাহকদের সামাজিক ও শারীরিক দুরত্বের কোন বিধান রক্ষা করা হচ্ছে না অথচ সরকার আপদকালীন সময়ে ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকিং সময় সীমিত করণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েক দফা নোটিশের মাধ্যমে। করোনা মোকাবেলায় ধর্মীয় উপাসনালয়ে যে বিধি আরোপকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এখানে তা একেবারেই করা হচ্ছে না বা মানা হচ্ছে না। ফলে মানুষের মসজিদ-মন্দিরে যাওয়ার বিধি গুলোকেও অনেকে সমালোচনার চোখে দেখছে এবং মানসিক ভাবে সচেতনতায় গুরুত্ব হারাচ্ছে।অন্যদিকে সময় স্বল্প হওয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং সার্ভিস আগের থেকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার অতি গুরুত্ব বিবেচনা করে কিছু খাতকে ব্যাংকিং কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলেও বেশিরভাগ ব্যাংকেই প্রায় সকল কার্যক্রম চলছে অধিক মুনাফা লাভের আশায়। এটা একদিকে যেমন গ্রাহকদের মধ্যে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ঠিক তার থেকেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন এই সংকট কালীন সময়ে সেবা দেয়া অন্যতম অর্থনৈতিক যোদ্ধা ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ।

৩.

রাষ্ট্রের জরুরী সেবা খাতের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বিভাগ এবং সুশৃঙ্খল লকডাউন পরিস্থিতি শামাল দিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রধান হলেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যাংক এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে পার্থক্য হলো, মানুষ শৃংখলা ও চিকিৎসা ঘটনা ঘটার আগে থেকেই নেয়ার তেমন যুক্তি নেই বা সুযোগ থাকেনা, তাই তাদের সেবা দিতে হচ্ছে চব্বিশ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কিন্ত এমন সংকট কালীন সময়ে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড আগে থেকেই প্রস্ততি নেয়া যায়;যেমন প্রয়োজনে অধিক টাকা উত্তোলন বা জমাদান।কারও ধার থাকলেও সেটা বিশেষ সংকটে পরেও পরিশোধ করা যায়।ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বিদ্যুৎ বিল,গ্যাস বিল বকেয়া এবং ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের কিস্তি দেয়ার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে কিন্ত ব্যাংকিং ঝুঁকি বেড়েছে বিশেষত পার্শ্ববর্তী শাখা বন্ধ থাকায় নির্ধারিত খোলা শাখায় চাপ বেড়েছে ভয়ানক ভাবে যা করোনা সংক্রমণে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে দুইজন ব্যাংক কর্মকর্তা করোনা সাস্পেক্টেড আক্রান্ত, যাদের একজন মারা গিয়েছেন। তাই সার্বিক বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিভাবে এ সেক্টরে ঝুঁকি কমিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে; যেমন, গ্রাহকদের এক মাসে নির্ধারিত লেনদেন সীমিত করে দেয়া, এটিএম বুথে টাকার উত্তোলনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং উৎসাহিত করা,ব্যাংক সপ্তাহে তিনদিন বিরতি দিয়ে দুইদিন পূর্ণ সময় খোলা রেখে সেবা প্রদান। এতে প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত সংক্রমণ হ্রাস পাবে, তাছাড়া তিনদিন বিরতিতে ভাইরাসের সংক্রমণ শক্তিও হ্রাস পায়। ক্যাশসহ অন্যন্য কর্মকর্তাদের জন্য স্বাস্থ্য নিরীক্ষক দিয়ে প্রতিদিন নিরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে রাখা, শাখা প্রধানদের স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতায় গুরুত্ব দেয়া। মনে রাখতে হবে, ব্যাংক খাতেও সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও বাজার ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়বে, তাই সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। আমাদের বাঁচতে হবে দেশের এই মহামারি সংকট থেকে এবং বাচিয়ে রাখতে হবে আমাদের অর্থনীতি। নাহলে এই মহামারী সংকট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সাথে একীভূত হলে চরম মূল্য দিতে হবে বিশ্ববাসীর সাথে বাংলাদেশকেও।

লেখক: কলামিস্ট ও নাট্যাভিনেতা
ই-মেইল: [email protected]


মন্তব্য