করোনাভাইরাস: দানবের সাথে মানবের যুদ্ধ কৌশল

  © টিডিসি ফটো

আমরা এমন এক সময়ে আছি যখন এই পৃথিবীটা স্মরণীয় কালের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত পাড় করছে। যদি আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা তারচেয়েও ভয়াবহ কিছু বলে ফেলি সেটাও মনে হয় অতিরিক্ত বলা হবে না, কারণ কোন যুদ্ধে এত গুলো দেশের সম্পৃক্তা পাওয়া যায়নি যেটা এই যুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যতিক্রম শুধু সাধারণ যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা দৃশ্যমান হয় অবকাঠামোগত ক্ষতির চিহ্ন যা এই যুদ্ধে নেই। আর এই যুদ্ধনীতিতে বড় কৌশলগত বৈপরীত্য হলো-যুদ্ধে জয় লাভ করতে হলে যুদ্ধের ময়দান তথা ঘরের বাইরের পরিবর্তে ঘরের ভেতরে অবস্থান। যে যতবেশি এই কৌশল অবলম্বন করে ঘরের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারবে সে ততটাই জয়ী বা লাভবান হওয়া দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। আর এতে আগের যুদ্ধে যে কৌশল কে আমরা কাপুরুষ নীতি বলতাম আজ তাকেই আমাদের বলতে হচ্ছে সুপুরুষ নীতি বা দক্ষ যোদ্ধার নীতি। তবে সাধারণ যুদ্ধের সাথে একটা বড় মাপের সাদৃশ্য এবং ভয়ানক বিষয় হলো বিপক্ষ দলের কাছে পক্ষ দলের কেউ ধরা পড়লে যেমন তথ্য পাচারসহ নানা পর্যায়ে বিপর্যয় নেমে এসে পরাজয়কে তরান্বিত করে এই যুদ্ধেও তাই।

কোন পরিবারের একজন সদস্য আক্রান্ত হলে বাকীরাও যুদ্ধ কৌশলে হেরে যায়। তাই এখানে একজন কে হারানো বা আক্রান্ত হওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া অনেক কঠিন, কেননা আক্রান্ত যোদ্ধার সাথে যতটা যোগাযোগ বা কাছাকাছি যাওয়া হয় ততটাই শত্রু পক্ষের জালে বন্দি হওয়া বা পরাজয়ের সম্ভাবনা তরান্বিত হয়।তাই এই যুদ্ধ করার সবচেয়ে বড় পরমাণু অস্ত্র হলো সচেতনতা। যে যতবেশি সচেতন অস্ত্র প্রয়োগ করবে সে ততবেশি জয়ের পাল্লায় এগিয়ে থাকবে।তাই সেই সিদ্ধান্তটাও নিতে হবে আপ টু বটম লেভেলে, কোন সৈন্যের অসচেতনতার জন্য যেন পুরো দলকে হারতে না হয়। সকল সৈন্যই জয়-পরাজয়ে সমান ভুমিকা রাখবে, কারণ এটা দানবের সাথে মানবের যুদ্ধ।

২.
কীভাবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবো এখন আসি সেই আলোচনায়। এই যুদ্ধের কৌশল এই প্রথম একটু ব্যতিক্রমী হওয়ার কারণ এটা দানবের সাথে মানবের লড়াই, তাই প্রথাগত শক্তি এখানে ব্যর্থ। গত দুটো বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল গড়ে অন্তত চার থেকে পাঁচ বছরে আর প্রাণহানির কথা নাইবা বললাম। কিন্ত এই যুদ্ধের সময় পরিধি যদি এর দশ ভাগেও নামিয়ে নিয়ে আসা হয় তবুও দুটো বিশ্বযুদ্ধের থেকে প্রাণহানি বাড়বে বই কমবে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ কৌশলকে কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আমাদের অন্যন্য স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে এই বিষয়ে পর্যাপ্ত দিক নির্দেশনা দিয়েছেন যা আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরই মধ্যে অবগত হয়েছি কিন্ত সে সব নীতির তেমন কোন গুরুত্ব আমরা দিচ্ছি না। এর একটা বড় কারণ, আমাদের চোখের সামনে যা না ঘটে তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। আবার অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত বেশি নির্মম ঘটনা তথা ইরাক, সিরিয়া যুদ্ধ, সম্প্রতি মিয়ানমার বা ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভিডিও চিত্র আমরা দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ করছি যা আমাদের ঘুনে ধুরা সমাজে সয়ে উঠার পর্যায়ে আছে। ফলে সিনেমার মতই সব আমাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। আমরা ভুলেই গিয়েছি যে মর্মান্তিক যুদ্ধাবস্থা আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে তা কল্পনারও বাইরে। আর বোধদয় নেই বলেই করোনাভাইরাসের জন্য লকডাউন ছুটিকে প্রায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত ঈদের ছুটি হিসেবেই মনে করছি। এছাড়া ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও করোনাভাইরাস নিয়ে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ভয়ানক পৈশাচিক বিনোদন হিসেবে উপভোগ্য হয়েছে, যেখানে উন্নত দেশের প্রবাসীরা ভিডিও মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে যাচ্ছেন।

একই গাছাড়া ভাব প্রথমে স্বয়ং রাষ্ট্রের মধ্যেও ছিল তাই একটা জাতীয় নির্বাচনের আয়োজনও সম্পন্ন করে ফেললেন এর মাঝেই। ফলাফল জনগণও এই পরিস্থিতি কে গুরুত্ব দিচ্ছে না। অন্যদিকে এদেশে ধার্মিকতার থেকেও বিশেষ কিছু অঞ্চলে ধর্মান্ধতা বেশি প্রবল, ফলে তারাও এই বিশেষ পরিস্থিতিকে তোয়াক্কা না করেই মসজিদ মন্দিরে নিয়মিত প্রার্থনা কাজে অংশগ্রহণ করছে। অথচ মহামারীকালীন সচেতনতা ও দিক নির্দেশনা নিয়ে হাদিস-কুরানের ব্যাখ্যাকেও তারা তোয়াক্কা করছে না। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ কেউ তাদের ব্যবসায়িক পেশাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ভয়ানক পরিস্থিতির জন্য অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

৩.
রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এর বড় কারণ এই মহামারীর সংক্রামক বিস্তার রোধ করা। তাই হোমকোয়ারান্টাইন কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যেন অন্তত আগামী ১৪ দিন এই ভাইরাসের সুপ্তাবস্থাকে শনাক্ত করা যায়। তবে এরই সাথে রাষ্ট্রকে নিম্ন আয়ের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংস্থানের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে লকডাউন বিপর্যয় কাটাতে। মনে রাখতে হবে, যেভাবে প্রবাসীদের মাধ্যমে এই ভাইরাস এদেশে এসেছে ঠিক একইভাবে শহুরেদের মাধ্যমে গ্রামে ছড়িয়ে যাবে দ্রুত গতিতে কিন্ত আবেগপ্রবণ, ধর্মান্ধ ও ভাবলেশহীন নাগরিক যদি এই হোম কোয়ারান্টাইন না মেনে চলে প্রথম ক্ষতিটা তারা প্রবাসীদের মত নিজ পরিবার দিয়েই শুরু করবে। আর এটা হলে আমরা ভাল করেই জানি, রাজনৈতিক বক্তব্য যাই থাকুক উন্নত রাষ্ট্রের পরিস্থিতিতে সত্যিকারে আমাদের সামর্থ্য কতদূর। তাই আমাদের উচিৎ এখনই নিজ দায়িত্বে সতর্ক হওয়া ও নিজের ভালোর জন্যই অন্যকে সচেতন ও সতর্ক করা। এই সময়ে ঘরে বসেই সচেতনতার বিষয় অন্যদের সাথে মতবিনিময় করা, এই কদিন ছোট ছোট সমস্যার জন্য বাইরে একেবারেই না যাওয়া, তুলনামূলক পরে চিকিৎসাযোগ্য বিষয় নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হওয়া। ঘরে বসে পড়ে ফেলুন আপনার পছন্দের বই, ধর্মীয় কাজে সময় দিয়ে মানসিক সাহস ও শক্তি সঞ্চার করুন। একা থাকার চেষ্টা করে যান একটা দিন। বেশি চাপ মনে হলে স্মার্টফোন এবং ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। মোট কথা, দাত কামড়ে পরে থেকে নির্ধারিত সময় পাড় করে নিজে যুদ্ধের এক বীর হিসেবে ভুমিকা রাখুন।তবেই আপনার আমার সকলের বিজয় সুনিশ্চিত দানবের সাথে মানবের যুদ্ধে।

লেখক: তরুণ নাট্যকার
মেইল: [email protected]


মন্তব্য