জেনারেল সোলেইমানির অন্ধকার দিক

কাশেম সোলেইমানি
কাশেম সোলেইমানি  © সংগৃহীত

এই মুহুর্তে ইরানের নিহত জেনারেল সোলেইমানির প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ।কেউ তাকে বিশ্বের এক নম্বর জেনারেল। কেউ তাকে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ব্যক্তি। কেউবা তাকে ইরানের ভাবি প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে সোলেইমানি ইরানের প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। তিনি সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে ছিলেন।

শুধু তার কাছে তাকে জবাবদিহিতা করতে হতো। আমি নিজেও কয়েক দিনে জেনারেল সোলেইমানির একজন ভক্ত হয়ে উঠেছি। তার অসীম ব্যক্তিত্ব, সাহস ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।তার কৃতিত্বের কথা জেনে একাধিক ফেসবুক পোস্টে তার বীরোচিত ভূমিকার স্তুতি করেছি।পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আরো বেশি জানার চেষ্টা করেছি।জেনেছি তার জীবনের বিরাট অংশের অনাবিষ্কৃত কিছু দিক। প্রত্যেক মানুষের জীবনে ভালো মন্দ দুটো দিক থাকে। সোলেইমানিও এর ঊর্ধ্বে নয়।

ইরানের জনসাধারণের কাছে সোলেইমানি জাতীয় বীর।তার জানাজায় অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ বহন করে। সোলেইমানির জানাজায় অংশ নিতে এসে পদদলিত হয়ে প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ জানাজায় অংশ নিয়েছেন প্রায় ৭৫ লাখ ইরানী। যা স্মরণাতীতকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় জানাজা। এসবই তার প্রতি ইরানী জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। জীবদ্দশায় তার ভূমিকার কারণে তিনি ইরানী জনগণের মনের মুকুরে যুগযুগ ধরে আসন গেঁড়ে থাকবেন। তার নিয়ন্ত্রিত আইআরজিসি বা কুদস্‌ ফোর্স এর কর্মকাণ্ড ইরান ছাড়াও দেশটির বাইরে বিস্তৃত ছিল।

মূলত বাহিনীটির কাজ ছিল দেশের বাইরেও ইরানের প্রভাব বিস্তার করা, আর গত দুই দশকে এ বিষয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। ইরানকে দেশের অভ্যন্তরের চেয়ে বাইরে বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সোলেইমানি বেশি পরিচিত। সেই সুবাদে ইরানের প্রভাবশালী এই জেনারেলের পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ইরানের বাইরে-লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হেজবুল্লাহের শক্তি বৃদ্ধি, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে ইরানের সিদ্ধান্ত, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে ইয়েমের শিয়া হুথিদের সমর্থন, ইরাকে শিয়া বিদ্রোহীদের উত্থান-এসব ঘটনার পেছনে হাত রয়েছে কুদস ফোর্সের, যে বাহিনীটির প্রধান ছিলেন যাকে আমরা বলছি বিশ্বের এক নম্বর জেনারেল সোলেইমানি।

নিঃসন্দেহে সোলেইমানির কাজগু‌লো‌ কৃতিত্বের দাবি রাখে। প্রশংসার যোগ্য। ফিলিস্তিনের ইসলামি জিহাদ ও হামাসকে ইরানের সহযোগিতা করাটা ওপেন সিক্রেট। লেবাননের হিজবুল্লাহকে সহযোগিতাও ভালো কাজ। আইএসকে দমনে সোলেইমানির ফোর্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব ক্ষেত্রে সোলেইমানি একজন অবিসংবাদিত খাঁটি মুসলিম হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। ইরাকে আমেরিকা সৈন্যদের হটানোর জন্য তার ফোর্স বাহবা পেতেই পারেন। এতক্ষণ তার কাজগুলো সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত। হৃদয়ের চাওয়া। সেহিসেবে তিনি মুসলিম জাতি তথা নিষ্পেষিত মানুষের স্বপ্নের নায়ক।

যুক্তরাষ্ট্রের যে মিত্র সে কিন্তু মুসলিমদের বন্ধু হতেই পারে না। আমেরিকা কখনো খাঁটি মুসলিম দেশপ্রেমিককে বন্ধু বানায় না। আমেরিকার স্বার্থের বিপরীত মেরুতে অবস্থানের কারণে আমেরিকা সোলেইমানি ও তার কুদস্‌ ফোর্সকে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখতো। মধ্যপ্রাচ্যে শত শত মার্কিন সেনাসদস্যের মৃত্যুর জন্যও তাকেই দায়ী করে আসছে দেশটি।

মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেনে প্রায় চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে যুদ্ধ। দেশটির বিভিন্ন অংশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের যুদ্ধের আড়ালে মূলত লড়াই চলছে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে। ওদিকে আবার সৌদি আরব ও ইরানের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিরা। ইয়েমেন মূলত দুটি প্রধান ইসলামি ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত ৮০% সুন্নি এবং ১৫% শিয়া। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্টের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৬৭ হাজারের বেশি। সেভ দ্য চিলড্রেনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইয়েমেনে প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ সব শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। দেশটির প্রায় ২ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের সুবিধা পাচ্ছে না।

লেখক মো. আবু রায়হান

 

এসব কারণে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনে ভয়ংকর রূপে ছড়িয়ে পড়েছিল কলেরা রোগ। দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৮ লাখ শিশু ভুগছে মারাত্মক পুষ্টিহীনতায়। ইয়েমেন হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দরিদ্র দেশ। ইউএনডিপির দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান গৃহযুদ্ধ যদি ২০২২ সাল পর্যন্ত চলে, তবে ইয়েমেন পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশে পরিণত হবে। তখন দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭৯ শতাংশ চলে যাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে।এসব যুদ্ধে ইরানের পক্ষে জেনারেল সোলেইমানির ফোর্স ও সহযোগিতা ছিল নেপথ্যে। এখন পাঠকেরা নির্ণয় করবেন সোলেইমানির ইতিহাসে ভূমিকা।

এদিকে গত আট বছর ধরে চলছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী এ যুদ্ধে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। তালিকায় আছেন নিরীহ জনগণ, সেনাসদস্য, বিদ্রোহী এবং সরকারি সমর্থকেরাও।সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের মতে, ২০১২ সালে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শরণার্থী হয়েছে পাঁচ লাখের মতো। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসেবে আনুমানিক ১০ মিলিয়ন মানুষ সিরিয়া ছেড়ে গেছে।সিরিয়ার নাগরিকদের মধ্যে ৬৯ শতাংশ সুন্নি। এর মধ্যে কুর্দি ৯ শতাংশ ও বাকিরা আরবীয়। ১২ দশমিক ৮ শতাংশ আলওয়াইটস আরব, ১৩ শতাংশ ক্রিশ্চিয়ান, যাদের মধ্যে ৯ শতাংশ অর্থোডক্স এবং ৪ শতাংশ আর্মেনিয়ান, দ্রুজ আরব ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ইসমাইলি শিয়া ৩ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া, ইরান সব বিষয়ে বাশার আল-আসাদ সরকারের পক্ষে থেকেছে। শিয়া অধ্যুষিত ও শিয়া শাসিত দেশটিতে দীর্ঘদিন থেকে সুন্নীরা নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যা, বঞ্চনা সহ নানা রাষ্ঠ্রীয় ও সামাজিক অবিচার দ্বারা আক্রান্ত। শিয়া জোট বাশার, ইরান, হিজবুল্লাহ রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাবহার করে হাজার হাজার সুন্নী শিশু হত্যায় মেতে উঠে। এসব হত্যার নেপথ্যে নায়ক ছিলেন সোলেইমানি।

ইরাকে শিয়া জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০১১ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ইরাকের মুসলমানদের ৫১% শিয়া, ৪২% সুন্নি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে সুন্নী জনগোষ্ঠী ভালো অবস্থানে ছিল। সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে শিয়ারা ক্ষমতায় আসে। ইরানও ইরাকে শিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মেতে উঠে। এতে করে ইরাকে সুন্নী নির্যাতন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ইরাকের শিয়াদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্বও ছিল সোলেইমানি ফোর্সের। যেখানে হাজার হাজার সুন্নিকে নির্যাতন ও তাদের ঘর ছাড়া করা হয়। শেষ পর্যন্ত ইরাকের মাটিতেই তিনি মারা যান।

মূল কথা ইরানের বাইরে ইয়েমেন ও সিরিয়ায় শিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ইরান যে মরিয়া তা বলার অবকাশ রাখে না। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেয়ে ইরান নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি ও শিয়া মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। এতে লাখ লাখ সুন্নি মুসলিমের রক্ত ঝরলেও তাতে তারা সামান্য অনুতপ্ত হয়নি। বরং তারা নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে বড় করে দেখেছে।ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকে লাখ লাখ সুন্নি মুসলিম নিহত হবার নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী এই সোলেইমানি।

বলে রাখা প্রয়োজন শিয়ারা মূল ইসলাম থেকে বিচ্যুত। তারা সুযোগ পেলে মক্কা মদিনা গুঁড়িয়ে দেবার মতো উদ্ধত আচরণ করে। তাদের ইমামদের কবরকে যা মাশহাদ নামে পরিচিত সেগুলো জিয়ারতকে অধিক পূণ্যের কাজ বলে। আজ আমরা যে গাজি সালাহউদ্দিনকে নিয়ে এতো গর্ব করি। সেই ব্যক্তিকে তাঁর জীবনের অনেক বড় একটি অংশ এই শিয়াদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল। কারণ শিয়ারা ছিল খ্রিস্টান ক্রুশেডারদের অন্যতম সহযোগী।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম শোনেননি এমন সচেতন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। এই
হাজ্জাজ ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক, রক্তপিপাসুও বলা যায়।কারণে অকারণে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছেন। তার বিভিন্ন অভিযানে প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ মানুষ মারা যায়। শুধু কি তাই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছিলেন একজন সাহাবী হত্যাকারী। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.), জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) এবং কুমাইল ইবনে জিয়াদ (রা.)- এ তিন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন তার হাতে।হাজ্জাজ ছিলেন কুরআনের হাফেজ।

আজকের যুগে অনারব মুসলিমরা যে কুরআন পাঠ করছে সহজভাবে, তার কৃতিত্ব হাজ্জাজ বিন ইউসুফের। কেননা তিনিই আরবি অক্ষরগুলোর সাথে হরকত তথা জের জবর পেশ চিহ্নগুলো যোগ করেন। ইতিহাসে হাজ্জাজের অন্ধকার দিকগুলো ঢেকে আছে এই মহৎ কাজটির জন্য।তেমনি জেনারেল সোলেইমানিরও অন্ধকার দিকগুলো ঢাকা পড়ে যাবে হিজবুল্লাহ, হামাস, ইসলামী জিহাদ ও মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য।

হামাস, হিজবুল্লাহ ইরানী ও সারা বিশ্বের মুসলিমের কাছে তিনি বীর হলেও ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকের সুন্নি মুসলিমদের কাছে জেনারেল সোলেইমানি একজন ঘাতক হিসেবে পরিচিত। সোলেইমানি আমেরিকার হাতে নিহত হয়েছেন। আমেরিকা মুসলিম বিশ্বের শত্রু। সুতরাং সোলেইমানির মৃত্যু আমাদেরকে তার প্রতি অধিক ভালোবাসা ও ভক্তির পটভূমি রচনা করেছে। আন্তর্জাতিক জটিল রাজনীতিতে সোলেইমানি এখন অনেক ক্ষেত্রে অবিসংবাদিত জেনারেল। মুসলিম উম্মাহর এ যুগের সালাউদ্দীন আইয়ুবীর সঙ্গে ও তুলনা চলে। সোলেইমানির মৃত্যু আমেরিকার নির্ঘুম রাতকে করেছে ভোর।তার মৃত্যু অনেকাংশে মুসলিম উম্মাহর জন্য অপূরণীয় ক্ষতিও বটে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ