০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২৮

প্রতিবন্ধী রাসেলের জীবনযুদ্ধ ও রাবিতে চান্স পাওয়ার গল্প

গত ৫ থেকে ৯ মে রাজশাহীতে ‘সেবাগ্রহীতাদের পরিতৃপ্তির জন্য কার্যকর পরিষেবা’ শীর্ষক প্রশিক্ষণে ছিলাম। প্রশিক্ষণে থাকাকালীন একদিন ট্রেনিং ক্লাস শেষে বিকালে আমি ও বন্ধু শফিকুল পদ্মার পাড়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য রওনা হলাম। পথের মধ্যে ইজিবাইকে হঠাৎ একটি প্রতিবন্ধী ছেলে গাড়িতে উঠলো।

ছেলেটির দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম তার উপরের ঠোঁট জন্মগতভাবে কাঁটা, গায়ে জীর্ণশীর্ণ পোষাক এবং তার দুই পা জন্মগতভাবে বাঁকা। ছেলেটি গাড়িতে উঠেই গোধূলী আলোয় কোন একটি কোচিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য শিট পড়তে লাগলো। ছেলেটাকে দেখে খুব মায়া হলো এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তার পড়ার আগ্রহ দেখে হবাক হলাম।

তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি প্রতিবন্ধী ভাতা পান?’ সে উত্তর দিল, ‘পাই এবং এই টাকা দিয়েই আমি পড়াশোনার খরচ করি।’ আলাপচারিতায় জানতে পারলাম তার নাম রাসেল, বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের বায়ায় এবং এসএসসিতে জিপিএ ৪.৯০ পেয়েছেন। এখন সে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কিন্তু টাকার অভাবে কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া তো দূরের কথা বইও কিনতে পারছেন না। তার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু টাকার অভাবে বই কিনতে না পারায় বন্ধুর কাছ থেকে কোচিংয়ের শিট ধার করে পড়ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম যে, তার বাবা-মা বেঁচে আছেন কি না এবং তারা দেখাশোনা করেন কি না।

সে জানালো যে, তার মা মারা গেছেন এবং বাবা অন্য একটা বিয়ে করেছেন। তার সৎ মা তাকে দেখাশোনা করে না এবং তার বাবাকেও পড়ার জন্য কোন খরচ বহন করতে দেয় না। তাছাড়া তার বাবাও অতি দরিদ্র।

এগুলো শুনে খুব খারাপ লাগলো। মনে হলো এই ছেলেটার জন্য কিছু করা প্রয়োজন এবং তাকে সাহায্য করলে সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে এবং একদিন অনেক বড় হবে যেদিন তার আর দুঃখের দিন থাকবে না। আমি তার মোবাইল নাম্বার নিই এবং তাকে আমার নাম্বার দিই। আর ৯ মে প্রশিক্ষণের সমাপনী দিনে দুপুরের পরে আমার সাথে দেখা করতে বলি এবং আশ্বাস দিই তাকে আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে সাহায্য করব।

বই কেনা ও কোচিংয়ে ভর্তির জন্য তো অনেক টাকা লাগবে। তাই আমি অনেক ভেবে পরিকল্পনা করি যে, প্রশিক্ষণ সমাপনী দিনে সবাই সম্মানী পেলে স্যারদের অনুমতি নিয়ে ছেলেটিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার জন্য সাহায্য চাইবো। পরিকল্পনা মতো কাজ করলাম এবং সকল স্যার ও সহকর্মীদের কাছে সাহায্য চাইলাম।

সকল স্যারদের আন্তরিকতায় তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ হাজার ৫০০ এর মতো টাকা উঠালাম এবং শ্রদ্ধেয় স্যারদের হাত দিয়ে রাসেলের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলাম। আর ভর্তি পরীক্ষার জন্য কি কি বই কিনতে হবে তা লিস্ট লিখে দিলাম। পরে রাজশাহীর UCC কোচিংয়ের সাথে কথা বলে তিন হাজার  টাকায় তার কোচিংয়ের ব্যবস্থা করলাম এবং ফলোআপে রাখতাম।

প্রতিমাসে আমি বেতন পেয়েই তার জন্য কিছু টাকা পাঠাতাম এবং নিয়মিত পড়াশোনার খবর নিতাম। তার সৎ মা চাইতো না সে পড়াশোনা করুক। তাই বাড়িতে সে পড়াশোনা করতে পারছিল না। এজন্য সে বাড়ি ছেড়ে স্থানীয় এক মসজিদে ইমাম সাহেবের সাথে থাকা শুরু করে এবং রাতে মসজিদেই পড়াশোনা করতে থাকে।

ইমাম সাহেবও খুব সহযোগিতা করেন। মাঝে মাঝে রাসেল খুব হতাশ হয়ে যেতেন এবং পড়াশোনায় মন বসাতে পারতেন না। তখন আমাকে ফোন দিতেন এবং বলতেন, ‘স্যার, আপনার সাথে কথা বললে আমার মন ভালো হয়ে যায় এবং আমি সাহস পাই।’

আমি তাকে মানসিকভাবে মোটিভেশন দেওয়ার চেষ্টা করতাম মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফর্ম তোলার জন্য আমি সকল আর্থিক সহযোগিতা করি। বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্যও আমি কিছু সহযোগিতা করি এবং কিছু সে প্রতিবন্ধী ভাতার টাকায় খরচ মেটাই।

আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রথমে তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়। কিন্তু ভাইভা দিতে যাওয়ার জন্য ঢাকায় যাওয়া-আসা ও খাওয়া খরচ তার ছিল না। আমাকে জানালে আমি নিজে কিছু সহযোগিতা করি এবং মোঃ সোহেল রানার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে দিই।

কিন্তু রাসেল বারবার আমাকে বলে, ‘স্যার, আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ ও মেসে থাকার খরচ চালাতে পারবো না। আমার যদি রাজশাহীতে চান্স হয় তাহলে রাজশাহীতে পড়বো।’ আমি তাকে বলি, ‘তুমি জগন্নাথে ভাইভা দিয়ে রাখ এবং রাজশাহীতে চান্স হলে ওখানেই পড়াশোনা করো। কিন্তু রাজশাহীতে না হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তে হবে এবং পড়াশোনার খরচের ব্যবস্থা আল্লাহ তায়ালা করবেন।’

৩ ডিসেম্বর বিকালে হঠাৎ রাসেল ফোন দিয়ে জানালো যে, তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে চান্স হয়েছে । এই সুখবরটা শুনেই খুশিতে আমার দুই চোখো পানি চলে আসলো। এতো খুশি হয়েছি যে, মনে হচ্ছে আমার নিজেরই চান্স হয়েছে। তাকে অভিনন্দন জানালাম এবং ধন্যবাদ দিলাম।

কিন্তু রাসেল মন খারাপ করে বললো যে তার কাছে ভর্তির জন্য কোন টাকা নেই। আমি শুধু বললাম, টেনশন করো না। আল্লাহই একটা ব্যবস্থা করবেন। ৫ ডিসেম্বর তার ভর্তির শেষ তারিখ। তাই আমি রাসেলের পক্ষে আমার সকল ফেইসবুক বন্ধুদের কাছে আকুল আবেদন করছি যে, আপনারা তার ভর্তির জন্য সাহায্য করুন।

কেউ তাকে স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে চাইলে নিচের নাম্বারে যোগাযোগ করুনঃ

মোবাঃ ০১৩০৮৩১৯০৮২
মোঃ রাসেল,
রাষ্ট্রবিজ্ঞান (চান্সপ্রাপ্ত), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

অথবা
মোবাঃ ০১৭০৮৪১৫০২৮
মোঃ শরিফ উদ্দীন (সুমন),
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার,
আদমদীঘি, বগুড়া

লেখক: উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, আদমদীঘি, বগুড়া