প্রেমের অমর পণ্য বাখরখানি

এ বিশ্বে এমন কিছু বিষয় ও দ্রব্য আছে, যাকে ঘিরে উদ্ভূত নেপথ্য কাহিনি কভু ভোলা যায় না। সেই একটি দ্রব্য তথা খাদ্যপণ্য হলো— ‘বাখরখানি’। আর এর পেছনে আছে প্রেমের এক হৃদয় বিদারক ঘটনার করুণগাথা। জনশ্রুতিতে আছে যে মোগল আমলে নিঃসন্তান নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর দত্তক পুত্র ছিল আগা বাকের খাঁ। তিনি যেমন সুদর্শন, তেমনই প্রখর মেধার অধিকারী এবং দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যের দিক দিয়ে অনন্য সাধারণ। তাছাড়া যুদ্ধবিদ্যায় ছিলেন বিশেষ পারদর্শী।

এদিকে সেই সময় মুর্শিদাবাদের অপরূপ সুন্দরী বাইজী তথা নতর্কী ছিলেন ‘খনি বেগম’। যতদূর জানা যায়, রাজধানী মুর্শিদাবাদে খনি বেগমের একটি নাচের আসর বসত। আর সেই নাচের আসরে অন্যান্য খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী দর্শকদের সঙ্গে আগা বাকের খাঁও আসতেন। একদা নাচ চলাকালীন সময়ে এক পর্যায়ে বাকের খাঁ ও খনি বিবির মধ্যে চোখাচোখি হয় এবং বলতে গেলে প্রথম দর্শনে তাদের ভেতর প্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হয়। তত্পর দিনে দিনে তাদের মধ্যে ভালোবাসা গভীর থেকে গভীরতর হয়। এর মধ্যে তারা দুজন সিদ্ধান্ত নেন যে, গোপনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এদের মধ্যে ভিলেন তথা কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় উজির জাহানদার খাঁর পুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খাঁ। তিনিও খনি বেগমের রূপে মোহিত হয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করেন। কিন্তু পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত হন। এতে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

একদিন তিনি খনি বেগমের ঘরে সরাসরি প্রবেশ করেন এবং বারবার ছলাকলা করে মিষ্টি ভাষায় প্রেম নিবেদন করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে সম্ভ্রম হরণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে বাকের খাঁ দ্রুত সেখানে হাজির হন এবং দুজনের (বাকের খাঁ এবং জয়নাল খাঁ) মধ্যে প্রবল তরবারি যুদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত জয়নাল খাঁ পরাজিত হয়ে পলায়ন করেন। এ প্রেক্ষাপটে জয়নাল খাঁ ফন্দির আদলে কূটবুদ্ধি করে দুই বন্ধুকে দিয়ে পিতা উজির জাহানদার খাঁকে জানায় যে, আগা বাকের খাঁ তার পুত্র জয়নাল খাঁকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলেছেন। উজির তত্ক্ষণাত্ নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর কাছে গিয়ে পুত্র হত্যার সঠিক বিচার প্রার্থনা করেন।

তাছাড়া তিনি আরো বলেন যে, বেশ কিছু দিন ধরে শাহাজাদা আগা বাকের খাঁর সঙ্গে খনি বেগমের গোপন প্রেম চলছিল। আর তারা দুজন পালিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে তার (উজির) ছেলে জয়নাল খাঁ বাধা দেওয়ায় আগা বাকের খাঁ তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করে গুম করেছে। তখন ন্যায়পরায়ন নবাব গর্জে উঠেন। যদিও বাকেরকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু ন্যায় বিচারের স্বার্থে কোনো অনুকম্মা দেখা দিল না তার অন্তরে। বাকের খাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানপূর্বক জীবন্ত বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার শক্তির কাছে বাঘ পরাভূত হয়ে মারা যায়। এরই মধ্যে সত্য ঘটনা ফাঁস হয়ে যায় এবং আরো জানা যায় যে, জয়নাল খাঁ খনি বেগমকে নিয়ে দক্ষিণ বঙ্গে পালিয়ে গিয়েছেন। বাকের খাঁ তত্ক্ষণাত্ ছুটেন দক্ষিণবঙ্গের দিকে খনি বেগমকে উদ্ধারের জন্য।

এদিকে কুলাঙ্গার পুত্রের অপকর্মের কথা জেনে নিজ হাতে শাস্তিদানের জন্য উজিরও ছুটে চলেন দক্ষিণ বঙ্গের দিকে। এর মধ্যে জয়নাল খাঁ দক্ষিণ বঙ্গের মগ ও বর্গীদের আস্তানা গভীর জঙ্গলের এক কুটিরে জোরপূর্বক খনি বেগমকে নিয়ে উঠেন। খনি বেগমের মন না গললে এক বিষধর সর্প হাতে নিয়ে তাকে ভয় দেখাতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে কাছে এগোতে থাকেন। ঠিক সেই সময়ে আগা বাকের খাঁ সেখানে প্রবেশ করেন। আর বলতে গেলে একই সময়ের উজির জাহানদার খাঁও এসে উপস্থিত হন এবং তলোয়ার খুলে পুত্রকে হত্যার জন্য উদ্যত হলে জয়নাল খাঁ বাধা দেওয়ায় হাতের মুঠি আলগা হতেই বিষধর সর্প জয়নাল খাঁর বুকে ছোবল মারে। সেই সময়ে কালবিলম্ব না করে পিতা জাহানদার খাঁও পুত্রের পিঠে তীক্ষ্ণ তলোয়ার বসিয়ে দেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে ক্ষুব্ধ জয়নাল খাঁ খনি বেগমকেও ভীষণভাবে আঘাত করেন। এতে খনি বেগমের সেখানেই মৃত্যু হয়। কিন্তু প্রেমিকা খনি বেগমের এহেন অকাল মৃত্যুতে বাকের খাঁ ভেঙে পড়েন। রাজকীয় ক্ষমতা ও মোহ ছেড়ে দিয়ে বাকি জীবন অতিবাহিত করেন প্রাণপ্রিয়া প্রেমিকার সমাধির কাছে। সেই থেকে দক্ষিণ বঙ্গ তথা চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালী-বরিশাল) অঞ্চলের নাম বাকের খাঁর নামানুসারে ‘বাকেরগঞ্জ’ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া বাকের খাঁ খনি বেগমকে এতটাই ভালোবাসতেন, তা স্মরণীয় তথা অমর করে রাখার জন্য পছন্দনীয় সেই রুটির নাম দুজনের নাম মিলে রাখলেন (বাকের+খনি) বাকেরখনি, যা কালক্রমে ভাষাগত উচ্চারণের সারথী ধরে অপভ্রংশ হয়ে ‘বাখরখানি’ হয়ে উঠে।


সর্বশেষ সংবাদ