নাইমুল, সন্তান আমার, যদি ফিরে আসতে!

  © সংগৃহীত

গত সোমবার (৪ নভেম্বর) গিয়েছিলাম ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে। বেরোতে বেরোতে বিকেল গড়িয়ে নেমেছে সন্ধ্যার আঁধার। অধ্যক্ষ স্যারের রুমের সামনে সাদা ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন কিশোর। আমাকে দেখে তারা হাত বাড়িয়ে দিল। আমি তাদের প্রত্যেককে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অঝোর ধারায় অশ্রু গড়াতে লাগল। কান্না কোনো বাঁধন মানছিল না।

‘বাবা, আমি যা করে এসেছি, করতে চেয়েছি, তা তোমাদের ভালোর জন্য। তোমাদের ফুলের আঁচড়ও যেন কেউ কোনো দিন না দেয়, এই কথাই তো আমি আমার সমস্তটা জীবন ধরে বলার চেষ্টা করেছি।’ আমি বাচ্চাদের কী সান্ত্বনা দেব, তারাই আমাকে শক্ত হতে বলল।

কিন্তু তাদের চোখেমুখেও সন্ধ্যার অনিশ্চিত আঁধারের বিহ্বলতা। তারা যে তাদের বন্ধুকে হারিয়েছে! রেসিডেনসিয়াল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারকে হারিয়েছে।

১ নভেম্বর হাসপাতালে আমাকে দেখামাত্র নাইমুল আবরারের বাবা এগিয়ে এসেছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও একজন বাবা। আমারও একটা মেয়ে আছে। তিনিও একজন বাবা। আমাদের দুই বাবার অশ্রু মিশে যেতে লাগল। যদিও জানি, তাঁর অতল বেদনার কিছুই আসলে স্পর্শ করতে পারব না।

আমার নিজের কন্যা জন্ম নেওয়ার পর আমার বাবা-সত্তাটা নিখিলব্যাপী যেন ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি রাস্তার স্কুটারে কোনো শিশুর পা বা মাথা বের হয়ে আছে দেখলে চিৎকার করে বলি, বাচ্চাটাকে ভেতরে নিন। কোনো শিশু রোদে কষ্ট পাচ্ছে দেখলে মনে হয়, যাই, সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ওকে ছায়া দিই। বইমেলায়, বর্ণমেলায়, এমনকি কিশোর আলোর এই কিআনন্দ নামে যে ১২টি অনুষ্ঠান হয়ে গেছে, সেখানে কোনো শিশু দেখলেই আমি কোলে তুলে নিই।

আর আমার কিশোর আলোর আয়োজনে এসে একটা কিশোর মারা গেল! আমার এই জীবনের আর মানে কী? আমরা কাঁদছি, আমরা শোক করছি, স্মরণ করছি, আরও যা যা করার, আমরা নিশ্চয়ই করব, কিন্তু নাইমুল আবরার তো আর মায়ের কোলে ফিরে আসবে না।

নাইমুল আবরারের মা বলছিলেন, ‘ছেলেটি বলছিল, মা, কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে যাব। ১০টায় ডেকে দিয়েন। ১০টায় ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। ১১টায় উঠল। তারপর গেল।’

ভালো ছাত্র ছিল নাইমুল। ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। ওর বড় ভাই জার্মানিতে থাকেন, বুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলী।

আবরার আইসক্রিম খেয়ে স্টল-সারির পেছনে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে নাকি গল্প করছিল। আমাকে কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদ বললেন, ‘আপনি (আনিসুল হক) যখন মঞ্চে ঘোষণা দেন অর্ণব আসছেন, তখন নাকি নাইমুল বলেছিল, যাই, আরেকটু আইসক্রিম খেয়ে অর্ণবের গান শুনতে যাই...তারপর ঘটে সেই তড়িতাহত হওয়ার ঘটনা।’ স্যারকে বললাম, ‘ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে?’ স্যার জানালেন, ‘হ্যাঁ।’

তদন্ত কমিটি কাজ করছে। আমরা সত্য জানতে পারব। আজ আমাদের বড় বেশি দরকার সত্য জানা। অর্ণব ছিলেন আমাদের শেষ শিল্পী। তিনি মঞ্চে ওঠার পর আসরের আজান হলো। আমি বিরতি দিলাম। তারপর অর্ণব গান শুরু করলেন।

সারা দিনে আমরা নানা শিক্ষামূলক কর্মশালা করেছি। ভাষার কর্মশালায় ছিলেন ড. সৌমিত্র শেখর, গণিতে মুনির হাসান, মাদককে না বলো নিয়ে ডা. আহমেদ হেলাল, লেখা আর আঁকা নিয়ে আহসান হাবীব, ফটোগ্রাফি নিয়ে নাসির আলী মামুন, ফিল্ম নিয়ে অমিতাভ রেজা, লেখাপড়া নিয়ে আয়মান সাদিক, অভিনয় নিয়ে নুসরাত ইমরোজ তিশা, ক্যারিয়ার নিয়ে আবদুল্লা আল মামুন।

ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ এসে বলেছেন লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার কথা। এসেছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়েরা। তাঁরা নিউজিল্যান্ডকে সিরিজ হারিয়ে এসেছেন। স্ট্রিট চিলড্রেন ক্রিকেটাররা লন্ডন সফরের গল্প বলেছে, যেমন সুরের ধারার সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা শুনিয়েছে জাতীয় সংগীত, দেশের গান।

পুরো আয়োজন উদ্বোধন করেছেন অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ফরহাদ। অনুষ্ঠানস্থলে পুলিশ ছিল, র‌্যাব ছিল, দুটো বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ছিল, স্বেচ্ছাসেবকেরা ছিল। একটা মেডিকেল ক্যাম্পে এফসিপিএস দুজন চিকিৎসক সারাক্ষণ ছিলেন। একটা আইসিইউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স তৈরি ছিল।

কিন্তু কিছুতেই আমরা দুর্ভাগ্যজনক চরম দুর্ঘটনা এড়াতে পারলাম না। অর্ণবের গানের একপর্যায়ে আমাকে একজন জানালেন, একজন যুবক, সম্ভবত এসেছেন চট্টগ্রামের বিটবক্স দলের সঙ্গী হয়ে, আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

তখনই মনটা খারাপ হলো। দোয়া করছিলাম, যেন তিনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পৌনে পাঁচটার দিকে আমি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলাম। ছেলেদের আগে যেতে বললাম। মেয়েদের ছাড়লাম মিনিট পাঁচেক পর।

অনুষ্ঠান শেষ। সবাইকে বিদায় জানিয়ে এবার গাড়িতে উঠব। তখন আমাকে বলা হলো, আহতজন মারা গেছে। আমি করণীয় ঠিক করার জন্য বের হলাম। মাঠ ছাড়ার কিছুক্ষণ পর আমাকে ফোনে জানানো হলো, যে মারা গেছে, সে রেসিডেনসিয়ালের ক্লাস নাইনের ছেলে। আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিতে শুরু করলাম অধ্যক্ষ স্যারকে। অধ্যক্ষ স্যার কিছুক্ষণ পর কল ব্যাক করলেন। অধ্যক্ষ স্যার এলেন হাসপাতালে। আমিও হাসপাতালে গেলাম।

এখন জানা যাচ্ছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবরারকে মৃত ঘোষণা করে ৪টা ৫১ মিনিটে। হাসপাতালে উপস্থিত কিশোর আলোর প্রতিনিধি ও পরিবারকে জানানো হয় আরও মিনিট পাঁচেক পর। সেখান থেকে আমার কাছে যখন খবর আসে, তারও অনেক আগেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও মিথ্যা গুজবের দম বন্ধ করা সাঁড়াশি আক্রমণে আমরা বাক্‌রুদ্ধ। ঘটনা কী ঘটল আর বলা হচ্ছে কী!

হাসপাতালে আবরারের মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন বললেন, আমাদের ছেলেকে যেন কাটাছেঁড়া করা না হয়। পুলিশ বলল, আপনারা এখন এটা বলছেন, কিন্তু দুদিন পর অন্য আত্মীয়স্বজন যখন বলবেন, তখন অন্য কথা বলবেন।

তাঁরা বললেন, আমাদের পরিবারের সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এখানে উপস্থিত। আমাদের সবারই এটা সিদ্ধান্ত। তাঁরা কাগজে আবেদন লিখলেন, যাতে ময়নাতদন্ত করা না হয়। প্রিন্সিপাল স্যারসহ আরও অনেকেই এর সাক্ষী।

যা-ই হোক, তদন্ত হচ্ছে। আমরা সহযোগিতা করছি। অনুষ্ঠানস্থলের চিকিৎসা শিবিরের চিকিৎসকেরা সংকটাপন্ন নাইমুল আবরারকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন, সেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক ছিল, আরেকজন ছাত্র ছিল।

নাইমুলকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত চিকিৎসকেরা নিয়েছেন। আর আমাদের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর। আমি জেনেছি বিকেল পাঁচটার পর, যখন অনুষ্ঠান শেষ হয়ে মাঠ রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে পড়ে আছে বড় বেদনার মতো।

বড় বেদনারও একটা সীমা থাকে। আমার বেদনার কোনো সীমা নেই। আমার আব্বা পিটিআইয়ে পড়াতেন শিশু মনোবিজ্ঞান। সারাক্ষণ বলতেন, আমার ছেলেমেয়েদের গায়ে কেউ যেন কখনো হাত না দেয়।

সেদিনও আমি কিশোর আলোর চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানে (১৮ অক্টোবর) কিশোরদের বলে এলাম, তোমরা একটা ঘাসের ব্যথাতেও ব্যথা পাবে, একটা পিঁপড়ার কান্নাতেও কাঁদবে। মানুষকে আঘাত করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বই পড়ো, সুকুমারবৃত্তির চর্চা করো, মানুষ হও। আলোকিত হও। তুমি আলোকিত হলে বাংলাদেশ আলোকিত হবে।

আর সেই আমার কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে এসে একজন কিশোরের মর্মান্তিক অকালমৃত্যু হলো। আমার সবকিছু শূন্য হয়ে গেছে। আমার সমস্ত লেখা, সব কাজ—সব অর্থহীন হয়ে গেছে। আমার মন যে সান্ত্বনা মানে না। এই অপূরণীয় ক্ষতি তো হতো না, যদি আমরা এই আয়োজনে না যেতাম। কিন্তু এতগুলো অনুষ্ঠান করলাম, এ বছরও এটা আমাদের তিন নম্বর অনুষ্ঠান, কোনো দিন কিছু হলো না, ১ নভেম্বর কেন একজন কিশোর মারা গেল!

আমার কোনো সান্ত্বনা নেই। আমি আবরারের মা-বাবাকে বলেছি, আপনারা বলুন আমরা কী করতে পারি। আপনার ছেলেকে আমরা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারব না। কী করলে আপনাদের ব্যথা একটু কমবে, আমাকে বলুন, আমি তা-ই করব।

আমি যে ভিড়ের মধ্যেও একা হয়ে যাচ্ছি। আমার আর কাজ কী নাইমুল আবরারের জন্য কাঁদা ছাড়া! কিশোর আলোর কিশোরেরা জানে, আমি তাদের পিকনিকে যেতে দিতে চাই না। যদি শিক্ষাসফরে যেতে হয়, সবচেয়ে ভালো বাসের ব্যবস্থা করতে বলি, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। কোথাও পুকুর থাকলে সেখানে যেতে দিই না। ওরা সব সময় আমাকে বলত, আপনি বেশি ভয় পান। বাবা রে, আমি যে বাবা। মা-বাবার মন সব সময় সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় ত্রস্ত থাকে!

নাইমুল, আমার বাবা, আমার ছেলে, তুমি কি ফিরে আসতে পারো না? হয় না যে এটা আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখছি, ঘুম ভেঙে গেলে দেখব তুমি ফিরে এসেছ। বাবা, আমরা আর কোনো দিন কিআনন্দ করব না। বাবা, তুমি ফিরে এসো। শুধু ফিরে এসো, সন্তান আমার।

আমাদের সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। অনুষ্ঠানের আগের দিনও আমি সবাইকে ডেকে বলেছিলাম, ‘সেফটি ফার্স্ট। সিকিউরিটি ফার্স্ট। সেই দিকে খেয়াল রেখো। ইনশা আল্লাহ, সুন্দর করে দিনটা পার করতে পারব।’ আমরা পারিনি। আপনারা সবাই সতর্ক থাকবেন। আর যেন কোনো নাইমুল আবরারকে এভাবে চলে যেতে না হয়।

আমাদের প্রত্যেকটি শিশু-কিশোরের শৈশব সুন্দর হোক। কৈশোর সুন্দর হোক। জীবন সুন্দর হোক। নিরাপদ হোক, নির্বিঘ্ন হোক। এটা নিশ্চিত করতে সবকিছু করুন। আমার এই অর্থহীন জীবনের একটা সকালে এই হলো আমার আকুতি আর আর্তি।

সৌজন্যে: প্রথম আলো


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ