১২ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৭

আমাদের উপাচার্য-বৃত্তান্ত

গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিক। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। আব্বা একটা সাধারণ জ্ঞানের বই কিনে এনে আমাকে উপহার দিলেন। বইটির নাম 'বাংলাদেশের ডায়েরী'। আব্বা প্রায়শ বলতেন, 'পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তে হয়, পড়তে হয় মনীষীদের জীবনী। এতে বুদ্ধি খোলে, নৈতিকতার ভিতও দৃঢ় হয়।'

বইয়ের এক জায়গায় ছিল- 'বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও উপাচার্যগণের নাম'। জানা ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয় ছয়টি, জানা ছিল না উপাচার্যদের নাম। মুখস্থ করেছিলাম ছয় উপাচার্যের নাম, যাদের নামের তিনটি ৪০ বছর পর এসেও মনে আছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওয়াহিদ উদ্দীন আহমেদ।

আব্বা মাঝেমধ্যেই যাচাই করতেন সাধারণ জ্ঞানের চর্চা কতটুকু করেছি। প্রশ্ন করতেন, 'অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নাম কী'। উত্তর দিতে না পারলে বলতেন, 'কেউ যদি তোমার কাছে কোনো উপাচার্যের নাম জিজ্ঞেস করে, আর তুমি যদি তা না পার, তবে মানুষ হাসবে। বলবে, তুমি কিচ্ছু জান না।' এতদিন পরে এসে বুঝি, উপাচার্যরা যেহেতু ছিলেন অতি সম্মানিত ব্যক্তি, সেহেতুই তাঁদের নাম জানাটা নিতান্তই বাঞ্ছনীয় ছিল। আজকের দিনের উপাচার্যরা কি আদতেই সম্মানিত যে আমাদের সন্তানদের বলব, তাঁদের নাম মুখস্থ করো। এই হলো তখনকার উপাচার্য ও বর্তমানের উপাচার্যের পার্থক্য।

তখনকার উপাচার্যরা কতটা সম্মানিত এবং ব্যক্তিসম্পন্ন ছিলেন, প্রসঙ্গক্রমে তারই দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে তখন আসীন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। তিনি গেছেন কোনো এক সভায়। সভার প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু। মোজাফফর আহমদ চৌধুরী যখন সভাস্থলে উপস্থিত হন, বঙ্গবন্ধু তখন এসে পৌঁছাননি। প্রথম সারির মধ্যস্থলে বঙ্গবন্ধুর বসার জন্য নির্ধারিত চেয়ার। অধ্যাপক মোজাফফর ওই নির্ধারিত চেয়ারের পাশের চেয়ারটিতে বসলেন। বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব এক পর্যায়ে কাছে এসে দ্বিতীয় সারির একটি চেয়ার দেখিয়ে তাঁকে বললেন, 'আপনার চেয়ার ওটা।' কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ইংরেজিতে বললেন, 'দ্য চেয়ার বিসাইড দ্য চেয়ার অব দ্য প্রাইম মিনিস্টার বিকামস দ্য চেয়ার অব দ্য ভাইস চ্যান্সেলর অব দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আসন প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনই হয়)'। সামরিক সচিব তাঁর দৃঢ় উত্তরে হতচকিত হলেন। কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে কেটে পড়লেন। অধ্যাপক মোজাফফর বঙ্গবন্ধুর পাশের চেয়ারে বসতে যেমন ইতস্ততবোধ করেননি, প্রত্যাঘাতী দৃঢ় উত্তর প্রদানেও পিছপা হননি। কেন তিনি এমন করেছিলেন? উত্তর দুটি- এক. তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা ও অবস্থান এমনটাই ছিল এবং দুই. বঙ্গবন্ধু ও মোহাম্মদ উল্লাহ দু'জনই শিক্ষকদের প্রচণ্ড শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। এখন সেদিন হয়েছে বাসি।

তৎকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা খুব একটা পদ-লালায়িত ছিলেন না; উপাচার্য পদ তো বহুদূরের কথা। শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে নিয়ে এমনই একটা গল্প প্রচলিত রয়েছে। মোফাজ্জল শহীদকালে ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক। এক অনুষ্ঠানে উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। উপাচার্য বললেন, 'আমার হাত দিয়ে কত কম যোগ্যতাসম্পন্নরা অধ্যাপক হয়ে গেল, আর আপনি তো কত ব্রিলিয়ান্ট। নির্ধারিত ফরম লাগবে না, একটা সাদা কাগজে দরখাস্ত করে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আপনাকে অধ্যাপক করে দেই।' মোফাজ্জল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিলেন, অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তিনি উপাচার্যকে সবিনয় বলেছিলেন, 'আমি পড়বার, পড়াবার এবং গবেষণা করবার স্বাধীনতা পেয়েছি, আমার তো আর কিছুর দরকার নেই।' পরম বিনয়ী এবং অসাধারণ মেধাবী এমন শিক্ষকও ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা পাননি। অনেকেরই এই তথ্যটি জানা নেই যে, মহাপণ্ডিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষকতার সমাপ্তি ঘটেছিল সহযোগী অধ্যাপক হিসেবেই অবসরে যাওয়ার কারণে।

সেই আমলের উপাচার্যদের কথা তো বলাই বাহুল্য, বাদ দিচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের কথাও, অধ্যাপক-নিম্ন পদাধিকারীরাও ছিলেন অতীব সম্মানিত। অথচ বর্তমানে কী করুণ অবস্থা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কাণ্ডটাই না ঘটে গেল। মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত দল নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার দাপটে ফিরতি পথ ধরতে বাধ্য হলো। জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও যা শুরু হয়েছে, তাতে জনসাধারণ ঔৎসুক্যের ব্যাপক রসদ পেয়ে গেছে। তালিকা ধরে একটি একটি করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-কাহিনীর উল্লেখ না-ইবা করলাম।

এখন প্রশ্ন হলো, গোপালগঞ্জে এমন ব্যক্তিকেই কেন উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রথম মেয়াদে তাঁর কর্মকাণ্ড কি কিছুই জানতে পারেনি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যে, তাঁকেই আবার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য উপাচার্য নিয়োগ করা হলো? ইউটিউবের কল্যাণে তাঁর বাচন শুনে মনে হলো, এ কী অখাদ্য? তাঁর বাচন শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো যে, একই সঙ্গে শত-সহস্র ডাস্টবিনের ঢাকনা খুলে গেল। মনে পড়ে গেল, প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের প্রবচন- 'সেদিন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল। আমি প্রথম ভেবেছিলাম, তিনি কোনো ফুরকানিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল।' এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন বুয়েট নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে। অথচ এখানকার উপাচার্য বললেন, 'আমি কেন পদত্যাগ করব? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি'। তিনি যদি ন্যায়ের পথেই হেঁটে থাকেন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সারা দেশে ছিছি-টিটি পড়ে গেল কেন? যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে টর্চার সেল, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই বিভাগের ছাত্র জঘন্যতম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, যাকে দেখতে, যার জানাজায় যেতে তিনি প্রয়োজনবোধ করেন না, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অকর্মন্য ও দায়িত্বজ্ঞানহীন উপাচার্যের প্রয়োজন নেই। তাঁর উচিত ছিল অনেক আগেই পদ ছেড়ে দেয়া। তা যদি তিনি না-ই করেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত তাঁকে অব্যাহতি দেয়া।

আমরা কী ধরনের উপাচার্যের নিয়োগ পাচ্ছি? অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমাদেরও কি বলতে হবে যে, 'এ দেশে দালালি ছাড়া ফুলও ফোটে না, পাখিও গান গায় না?' এমন উপাচার্যও আমরা লাভ করেছি যে, যাঁর কেশ-বেশ-কণ্ঠ বঙ্গবন্ধুকেও হার মানায়। নির্জলজ্জতার সীমা থাকা উচিত।

কেউ কেউ বলেন যে, উপাচার্যকে ভালো অ্যাডিমিনিস্ট্রেটর হতে হয়। আমরা তা মনে করি না, বরং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, উপাচার্য নিয়োগ পাওয়া উচিত তাঁর, একজন প্রথিতযশা গবেষক হিসেবে যাঁর সুনাম আছে। ভালো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হতে হবে আমলাদের। বুঝতে হবে উপাচার্যকর্ম কোনো আমলাগিরি নয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, সত্যেন বোস, আবু মাহমুদ, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান প্রমুখ যে উপাচার্য পদে অধিষ্ঠিত হননি, সেটাই জাতির দুর্ভাগ্য। রাষ্ট্র যদি প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নিযুক্ত উপাচার্যও সবল হতে পারে না। এ জন্যই নৈতিকতায় পরীক্ষিত, গবেষণায় নমস্য, দর্শনে ঋদ্ধ ব্যক্তিবর্গকেই এই পদে নির্বাচন করা উচিত। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠান ক্রমশ রূপান্তরিত হয়ে যাবে মহাবিদ্যালয়ে, যেমনটি ইতিমধ্যে অনেকটিই হয়ে গেছে এবং অনেকটিই তা হয়ে যাচ্ছেও।

অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়