আল জাজিরায় ‘বুয়েট’ শব্দটা দেখে বুক ধক করে উঠলো

  © সংগৃহীত

১.আল জাজিরায় ‘বুয়েট’ শব্দটা দেখে বুকে ধক করে উঠলো। স্কুল জীবন থেকেই এই শব্দটা কত স্বপ্ন জাগিয়েছে মনে। কত পড়ার টেবিল আর খেলার মাঠের দ্বন্দ্বে মনকে প্রবোধ যুগিয়েছে এই শব্দটা। ছোট্ট এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ, সে দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত জানে, র‍্যাংকিং এ না থাকা সত্ত্বেও সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র দেখলে স্কলারশিপ দিতে কনফিডেন্স পায়। তার নাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসবে তাতে অবাক হওয়ার কি আছে?

আল জাজিরায় বুয়েট নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে। না, কোন বিখ্যাত আবিষ্কার বা গবেষনার কারণে নয়। অথচ বুয়েট যে মানের প্রতিষ্ঠান, সেটাই হওয়ার কথা ছিলো। আমেরিকায় এসেও দেখছি- বুয়েটে আমরা যা পড়ে এসেছি অনার্সে, এর অনেক কিছু আমেরিকার ছাত্র-ছাত্রী বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ছাত্র ছাত্রীরা মাস্টার্সে এসে শিখতে হিমশিম খাচ্ছে।

সারাদেশের মানুষের মুখেও আজ বুয়েট, সেটাও কোন হই চই ফেলা দেওয়া প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যে নয়। দেশ বিরোধী চুক্তির বিরোধীতা করায় এক দেশপ্রেমিক ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে এই বুয়েটে, সে জন্য।

২.সারাদেশের ছাত্রলীগ যে কাজটা পারলো না, বুয়েটের ছাত্রলীগ কিভাবে সেই কাজটা করে ফেললো, একেবারে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়! এই ঘটনার পরে অনেকেই তাদের নিজেদের উপর অত্যাচারের ঘটনা সাহস করে শেয়ার করছে। আমি অনেকগুলো ঘটনা জানলেও এত ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গিয়েছে! চমকে উঠেছি।

কানের পর্দা চড় দিয়ে ফাটিয়ে দেওয়া, তুচ্ছ কারণে মেরে হাত ভেংগে দেওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গিয়েছিলো। বর্তমান ছাত্ররা বলছে, ‘এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিলো না? আমরা সবাই জানতাম, এমন দিকেই গড়াচ্ছে!’ নির্যাতনের কারণে সেকেন্ড টাইম পরীক্ষা দিয়ে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

এই দানব একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সময় থেকে শুরু হয়েছে বলে আমাদের সমসাময়িক ব্যাচগুলো ব্যাপারটা ভালো জানে। ২০১৪ সালে ফেসবুকের পোস্ট পছন্দ না হওয়াতে আমাকেও ডিপার্টমেন্টে ধরতে এসেছিলো। দুটো কারণে আমি সৌভাগ্যবান (!) ছিলাম। তখন এই ফ্যাসিবাদিতা শুরুর দিকে ছিলো, এতটা প্রশিক্ষিত হয়ে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, তখন নতুন ভিসি হয়েছেন খালেদা একরাম ম্যাম। সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র ভিসি যার সৎ-সাহস আছে এবং নিজের দায়িত্ব খুব ভালো করে বুঝতেন (তার অকাল মৃত্যুতে বুয়েটবাংলাদেশ অনেক বড় কিছু হারিয়েছে)।

আমাকে ওদের টর্চার সেলে নিয়ে যেতে পারেনি। ক্লাসের রিপ্রেজেন্টেটিভ হওয়ায় শিক্ষকরা ভালো করে চিনতেন। আমার ঠাই হলো ভিসি ম্যামের রূমে। আমাকে মারতে আসা কনক (১০), রাসেল (১০), প্রতীক (১১), সিয়াম (০৯), টিকাদার (০৯), ফাইরুজ (০৬), (অনেক আগে বুয়েট পাশ এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পরেও এদের ট্রেনিং দিতে আসতো সে), এদের ভিসি ম্যাম তার রূমে ঢুকতেই দিলেন না।

কনক চিৎকার করে উঠলো, ম্যাম, আপনি আমাদের, আওয়ামীলীগের নিয়োগ দেওয়া ভিসি। ওকে আমাদের হাতে তুলে দেন। না হলে খুবই খারাপ হবে। ম্যাম বললেন, ছাত্রদের জন্য যেটা ভালো হবে আমি সেটাই করবো।

তখনকার ছাত্রকল্যাণ পরিচালক এখনকার মতোই ছিলেন চূড়ান্ত দলকানা, দেলোয়ার হোসেন স্যার (যাকে স্যার ডাকতে আমার লজ্জা হয়)। তিনি এসে ভিসিকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন, ছাত্রলীগের সাথে ঝামেলায় জড়ানো ওনার উচিত হবে না। আমার সেমিস্টারের রেজাল্টের রেকর্ড বের করে দেখাতে চাইলেন, যে আমি পড়াশুনা করি না, খারাপ ছেলে। প্রথম সেমিস্টারে সেকেন্ড হয়েছিলাম, দ্বিতীয় সেমিস্টারে থার্ড। পরের গুলোয় প্লেস না করলেও সিজিপিএ খারাপ ছিলো না। সুতরাং সেই চেষ্টা কাজে দিলো না।

শুধু বললেন, ‘দেখেছেন ম্যাডাম, পড়াশুনা না করে এদের সাথে বিরোধ করে বেড়ায় বলে রেজাল্ট খারাপ করা শুরু করছে।’ আমি এখন পর্যন্ত বুঝি না, একজন শিক্ষক কতটা নীচে নামলে এমন একটা সময়ে এসে রেজাল্টের রেকর্ড বের করতে পারে।

ভিসি ম্যাম, ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন শরীফ স্যার, ডিপার্টমেন্টের বজলুর রশীদ স্যার ছিলেন, তখনকার রেজিস্টার মাসুদ স্যারও চমৎকার প্রফেশনাল মানুষ ছিলেন। সবার সহায়তায় ছাত্রলীগের পশুগুলো আর দেলোয়ার স্যার নামের মেরুদন্ডহীন শিক্ষকের হাত থেকে আবরারের পরিণতি বরণ থেকে অন্তত বেঁচে যাই।

তখন থেকেই এরা একটু একটু করে এগিয়েছে, আরো শতাধিক ছাত্রকে মেরেছে। আমরা, ছাত্ররা ওদের আচরণে চুপ থেকেছি, বিভিন্ন সময়ের ছাত্র কল্যাণ পরিচালকেরা আর প্রশাসন আস্কারা দিয়েছে। এভাবে চূড়ান্ত দানব আর পশু বানিয়েছি আমরা সবাই মিলে।

৩. আবরারের হত্যার পরের হলের সিসি টিভি ফুটেজেও সেই একই পুনরাবৃত্তিই দেখলাম। এখনকার ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজান স্যারও দেলোয়ার স্যারেরই প্রতিচ্ছবি যেন। তাকে মাসখানেক আগে আন্দোলন করে পদায়ন করেছে এই খুনীরাই। লাশের সামনে দাড়িয়ে তিনি এবং হল প্রভোস্ট খুব স্বাভাবিকভাবে খুনীদের সাথে আলাপ করছেন। তার সামনেই হলের প্রভোস্ট লাশের উপরের কাপড় সরিয়ে নিশ্চিত হলেন যে, পিটিয়েই আবরারকে মেরে ফেলা হয়েছে, তাও সিসি টিভি ফুটেজে পরিষ্কার।

অথচ এর পরদিন বুয়েট প্রশাসন অপঘাতে মৃত্যুর জিডি করে আসে। মাদক দিয়ে গণপিটুনির নাটক সাজানোর চেষ্টা চলে। সিসি টিভির ফুটেজ গায়েব করার জন্যও চলে দিনভর প্রচেষ্টা, সারাদিন প্রশাসনকে আটকে রেখে আন্দোলন করে ফুটেজ উদ্ধার করতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

মিডিয়ায় তাকে জেরা করতে দেখলাম ছাত্রদের, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি জানি না, আমাকে জানানো হয়নি বলে আশ্চর্যভাবে দায়িত্ব এড়ালেন। এই হত্যায় কোন অনুশোচনা দূরের কথা, পরবর্তীতে আরো খুনী তৈরির রাস্তা বানিয়ে দিয়ে গেলেন।

এভাবেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসতে পারলে এত গবেষণা- র‍্যাংকিং এর কষ্টের দরকার কি? বাহ!

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ