কাশ্মীর কী দক্ষিণ এশিয়ার ফিলিস্তিন হতে চলেছে?

পৃথিবীর ভূস্বর্গ নামে খ্যাত কাশ্মীর এখন দক্ষিণ এশিয়ার ফিলিস্তিন হিসেবে পরিচিতি পেতে চলছে। ভারতের সেনাবাহিনীর জুলুম নির্যাতন, অকাতরে নিরীহ কাশ্মীরিদের হত্যা এবং কাশ্মীরিদের ঢিল পাথর ছুড়ে জীবনবাজি রেখে প্রতিরোধের চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের মজলুম ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ইসরায়েলের সৈন্যদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রতিবাদ প্রতিরোধকেই যেন মনে করিয়ে দেয়। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে ভারত সরকারের। তাই যে কায়দায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে সেই একই ফর্মুলা ও কৌশল অবলম্বন করছে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুসলমানদের নিধনে তৎপর। এতে বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাশ্মীরের বর্তমান অপারেশন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা ও পরামর্শে পালিত হচ্ছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বুঝা যায় অমুসলিমরা একই মুদরার এপিঠ ওপিঠ। তাদের মধ্যে কোন মত ভিন্নতা নেই। সারা বিশ্বে মুসলিম নিধন ও কোনঠাসা করতে তারা দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ ও অাপোষহীন। তার প্রমাণ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন। আজ ফিলিস্তিনি, কাশ্মীর, আরাকান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কোথায় মুসলমানদের রক্ত ঝরছে না?কাশ্মীরী তরুণ যুবকদের কিভাবে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে? গুম করা হচ্ছে। আজীবনের জন্য দৃষ্টি শক্তি কেড়ে অন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। নিশ্চুপ সারা বিশ্ব। টুঁ শব্দ করছে না তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের নামে সারা বিশ্বের ইহুদি খ্রিস্টান পৌত্তলিক, জড়বাদীদের রক্ষার সংগঠন।

আজ ভারত মুসলিম নির্যাতন করে কাশ্মীরে, গো হত্যার নামে কুপিয়ে মুসলমান হত্যা করছে। ভবিষ্যতের পরাশক্তি চিন মুসলিম নির্যাতন করে চিনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের ওপর। আমেরিকা মুসলমানদের হত্যা করে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন জনপদে। এক সময়ের পরাশক্তি রাশিয়া আগ্রাসন চালিয়েছিল আফগানিস্তান, চেচনিয়া, দাগেস্তান। বলেন কার হাত মুসলমাদের খুনে রঞ্জিত নয়? বলেন মুসলমানদের বন্ধু কে? ২০১৪ সালে হিন্দুত্ববাদী মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইসরাইলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছে ভারত।

২৫ বছরের দূরত্ব ভেঙে ২০১৭ সালে ভারত- ইসরাইল ৪২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যিক সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। এছাড়াও ভারত ইসরায়েলের মধ্যে আরো ১২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত করা হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা তো আছেই । মোদি যে অখন্ড ভারত ও হিন্দুত্ববাদী ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখছে তার সেই স্বপ্নের বিশ্বস্ত সঙ্গী ইসরায়েল। বর্তমানে মোদি নেতানিয়াহুর দহরম মহরম সেই ইঙ্গিতই বহন করে।

এতদিন ধরে চলা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে দেশটির সরকার গতকাল। ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ এক প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে মুসলিম-অধ্যুষিত রাজ্যটির বিশেষ সুবিধা দেওয়া সাংবিধানিক আইনটি বাতিল করেন। এ ছাড়াও জম্মু কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দুই টুকরো করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জম্বু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করা হয়েছে। নতুন দুটি অঞ্চলেই দু’জন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের মাধ্যেমে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে থাকবে। তবে জম্বু কাশ্মীরের জন্য আলাদা বিধানসভা রাখার কথা বলা হলেও লাদাখের বিধানসভা থাকবে না বলে জানানো হয়েছে। এই আইন জারির পূর্বাপর ভূস্বর্গ এখন আরো বেশি উত্তপ্ত।

গত রবিবার মধ্য রাত থেকে গৃহবন্দি করে রাখা জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি ও রাজ্যের আরেক আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাকে গতকাল গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে কাশ্মীর'স পিপলস কনফারেন্সের দুই নেতা সাজ্জাদ লোন এবং ইমরান আনসারিকেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তারাও রবিবার থেকে গৃহবন্দি ছিলেন। এ মুহুর্তে কাশ্মীরের অবস্থা অগ্নিগর্ভ। জনগণ রাস্তায় নেমে আজাদি স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছে কাশ্মীর উপত্যকা।

ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তথা স্বায়ত্বশাসন বাতিল করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। গতকাল তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরীদের পক্ষে হয়েছে বিক্ষোভ।

এদিকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সর্বদলীয় হুররিয়াত কনফারেন্সের(এপিএইচসি) প্রধান সাইয়েদ আলী গিলানি কাশ্মীরিদের রক্ষায় বিশ্বের মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক টুইটে অভিযোগ করেন যে, কাশ্মীরে বড় ধরনের গণহ’ত্যা চালাতে যাচ্ছে ভারত।

শনিবার দেওয়া ঐ টুইটে গিলানি বলেন, এই গ্রহে বসবাস করা সব মুসলমানের কাছে কাশ্মীরেদের রক্ষার বার্তা হিসেবে নিতে হবে এই টুইটকে। তিনি বলেন, যদি সবাই আমরা হ’ত্যাকাণ্ডের শিকার হই, আর আপনারা নীরব থাকেন, তাতে মহান আল্লাহর কাছে আপনাদের জবাব দিতে হবে। কাশ্মীরে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহ’ত্যা ঘটাতে যাচ্ছে ভারত। আল্লাহ আমাদের সুরক্ষা করুক।ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সেদেশের বিরোধীরা। সেই সঙ্গে কাশ্মীর উপত্যকায় আরও আট হাজার আধাসামরিক বাহিনী পাঠানো হয়েছে।সেখানে বন্ধ রয়েছে স্কুল, কলেজ এবং অফিস। ইন্টারনেট পরিষেবাও সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জারি করা হয়েছে কারফিউ।জনমনে আতঙ্কের কমতি নেই। এ মুহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সেনা মোতায়েন রয়েছে কাশ্মীরে।

কাশ্মীর সংকটের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও পুরনো। এক সময় মুসলমানরা কাশ্মীর প্রায় পাঁচ শত বছর শাসন করেছিল।যার প্রমাণ সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বসতি। কাশ্মীরকে ‘কাশ্মীর উপত্যকা’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে।কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে ৪টি যুদ্ধ ১৯৪৭,৬৫,৭১ ও ৯৯ সালে সংঘটিত হয়েছিল।কাশ্মীর, এখন তিনটি দেশের নিয়ন্ত্রণে। ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের। কাশ্মীর উপত্যকা সম্পূর্ণরূপে ভারতের নিয়ন্ত্রনে।

কাশ্মীর তিনটি দেশের দখলে যেসব অঞ্চল ক. ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য যেটি বর্তমান জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ নিয়ে গঠিত।বর্তমান ভারত অধুষিত জম্মু ও কাশ্মীরের আয়তন ৮৪,৪২০ বর্গ মাইল । জনসংখ্যা প্রায় ১কোটি ২৬ লক্ষ। কাশ্মীর উপত্যকায় মুসলিম জনসংখ্যা ৯৫% হিন্দু ৪%,জম্মুতে মুসলিম ৩০% হিন্দু ৬৬%, লাদাখে ৪৬ মুসলিম, বৌদ্ধ ৫০%।

খ.পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিত-বালতিস্তান দুটো অঞ্চল।পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মী্রের আয়তন ৩৪,২৪৪ বর্গ মাইল ।পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ যার ৯৯% মুসলিম এবং

গ. চীন-নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন।১৯৬৪ সালে চিন আকসাই নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। আকসাই চীন হল ভারত ও চীন এর মধ্যকার এক বিতর্কিত অঞ্চল।ভারতের মতে এটি ভারতের জম্বু এবং কাশ্মীর রাজ্যের লাদাখের অংশ বিশেষ।

অপরদিকে চীন আকসাই চীন তাদের জিংজিয়াং প্রদেশের অংশ বলে দাবি করে।এই অঞ্চলটির আয়তন ৩৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার।১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের আগে আকসাই চীন ভারত এর লাদাখের আংশ ছিল। যুদ্ধের পর অঞ্চলটি চীন এর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।এই অঞ্চল নিয়ে এখনও ভারত ও চীনের মধ্য বিবাদ রয়েছে। ১৯৬২ সালে ভারত চীন যুদ্ধের ফলে চীন আকসাই চীন অঞ্চল দখল করে নেয়। আবার, পাকিস্তানের বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে (The Trans Karakorum Tract) কাশ্মীরের বিশাল একটি অংশ, সাশগ্রাম ভ্যালি চীনকে উপহার দেয়। ফলে মূল কাশ্মীর ভূখণ্ড তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায় পঞ্চম শতাব্দীর পূর্বে কাশ্মীরে হিন্দুধর্ম পরে বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরে শৈব মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল। অষ্টম শতকের সূচনায় মুহাম্মদ বিন কাসেম কর্তৃক সিন্ধু বিজয়ে ভারতে মুসলিম আগমন ঘটে।মুহাম্মদ ঘুরির ভারত বিজয়ের পর ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মও ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় শৈব মতবাদের প্রভাব কমতে থাকে। ১৩৩৯ সালে শাহ মীর হয়েছিলেন কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক। তিনিই কাশ্মীরি সালতানাত যুগ বা সোয়াতি রাজবংশের সৃষ্টি করেন। পরবর্তী পাঁচ শতাব্দী ধরে, মুসলিম শাসকরা কাশ্মীর শাসন করেছিলেন।

মোঘলরা যারা ১৫২৬ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত শাসন করেন তারাই কাশ্মীরের নাম দিয়েছিল ভূস্বর্গ।আফগান দুরানী রাজবংশ ১৭৪৭ থেকে ১৮২০ পর্যন্ত শাসন করেছিল। ১৮২০ সালে রানজিৎ সিংয়ের নেতৃত্বে শিখরা কাশ্মীর দখল করে নিয়েছিল। ১৮৪৬ সালে প্রথম এংলো-শিখ যুদ্ধে শিখরা পরাজয় বরণ করেছিল। অতঃপর ১৮৬৪ সালে অমৃতসর চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশদের কাছ থেকে এই অঞ্চলটি ৭৫ লাখ রুপির ও কিছু খাজনার বিনিময়ে জম্মুর রাজা গোলাপ সিং কিনে নেন এবং জম্মু ও কাশ্মীরের নতুন রাজ্যের তিনি প্রথম রাজা হয়েছিলেন।কাশ্মীরের এই কেনা বেচাকে মহাত্মা গান্ধী ‘ডিড অব সেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

সাংবাদিক আর এস গুল লিখেছেন, “ডাচদের কাছে নিউ ইয়র্ক সিটি বিক্রি হয়েছিল ১৬১৪ সালে মাত্র ২৪ ডলারে, রাশিয়ার কাছ থেকে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা কিনেছিল আমেরিকা। ১৭০ বছর পরও ৭৫ লাখ রুপির এই ক্রয় চুক্তি, এখনও কাশ্মীরি জাতি সত্তার সমস্যার মূল হিসেবে সামনে আসছে।” গোলাপ সিংয়ের উত্তরাধিকারীরা ১৯৪৭ পর্যন্ত জম্মু কাশ্মীর শাসন করেছিলেন। ১৯২৫ সালে কাশ্মীরের রাজা হন হরি সিংহ এবং ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়া পূর্ব পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শেষ রাজা। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির অন্যতম শর্ত ছিল ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন।

১৯৪৭ সালে, ইংরেজরা যখন বিদায় নেয় তখন তারা ৫৬২টি প্রিন্সলি স্টেটকে হয় ভারত নয় পাকিস্তানে যোগ দিতে বলে। ভারতের স্টেট গুলো ভারতে এবং পাকিস্তানের গুলো পাকিস্তানে যোগ দেয়। কিন্তু ৩ টি স্টেট স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। হায়দ্রাবাদ, জুনগর এবং জম্মু ও কাশ্মীর। এদের মধ্যে হায়দ্রাবাদ এবং জুনগর ছিল হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ কিন্তু তাদের শাসক ছিল মুসলিম। জনগণ বিক্ষোভ করে ভারতে যোগদানের জন্য, ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী গিয়ে দখল করে নেয়। পরবর্তীতে গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা হাসিল করে নেয় ভারত। কিন্তু কাশ্মীরের চিত্র ছিল বিপরীত এখানে ভারতের জন্য ইতিবাচক দিক ছিল। হরি সিংহ ছিল হিন্দু রাজা। তিনি চাইছিলেন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে। তখন কাশ্মীরের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল মুসলিম। জনগণের বিরাট একটি অংশ চেয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে।এমনকি মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই কাশ্মীরের সঙ্গে যোগদানের পক্ষে ছিলেন, যেমন মুসলিম সেকুলার নেতা আবদুল্লাহর সঙ্গে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সখ্যতা ছিল। তিনি ভারত বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন এমনকি কাশ্মীরের ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে আবদুল্লাহর ইন্ধন ছিল। তিনি হরি সিংকে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

পাক ভারত বিভক্তির সময় কাশ্মীরের শিখ- মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। এতে করে লাখ লাখ মুসলিম উপজাতি পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। এমনই এক দোলাচলে ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সমর্থিত পাকিস্তানের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর আক্রমণ করেন। এসব উপজাতির আক্রমণ হতে বাঁচতে হরি সিং ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর দিল্লীতে ‘Instrument of Accession’ এ স্বাক্ষর করে যা পরের দিন ভারতের সাধারণ রাজ্যপ্রশাসক কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল। এর ফলে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়।জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজ স্বীকৃতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি সরকারকে কাশ্মীরের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।২৬ অক্টোবর দিনটি কাশ্মীরী জনগণ কালো দিবস হিসেবে পালন করে।

হরি সিং ভারতের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই ভারতীয় সেনারা কাশ্মীরে প্রবেশ করে। অপরদিকে কাশ্মীরের পাকিস্তান প্রান্ত দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করে।প্রায় চার বছর যুদ্ধ চলার পর ১৯৫২ সালে জাতিসংঘ যুদ্ধ বিরতি হয়।জাতিসংঘের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবে কাশ্মীরে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার, এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হয়। ভারত প্রথমে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হলেও গণভোট আয়োজনে অসম্মত হয়। ভারতের ধারণা ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে গণভোট দিলে ফলাফল অবশ্যই পাকিস্তানের পক্ষেই যাবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানও কাশ্মীর থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হয় না। ফলে উভয় দেশেই তথন থেকে কাশ্মীরে সৈন্য মোতায়েন করে রাখে।পরবর্তী সময়ে কাশ্মীর নিয়েই ১৯৬৫ সালে এবং ১৯৯৯ সালে দুই দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধ হয় ।১৯৪৮সালে অস্ত্র বিরতি চুক্তির মাধ্যমে লড়াই বন্ধ হয় এবং ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি অনুযায়ী ভারত এবং পাকিস্তানকাশ্মীর সমস্যাকে নিজেদের মধ্যে সমাধান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং একই সাথে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ অবতারনা করা হয়।

১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের সংবিধানে বহুল আলোচিত ৩৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়েছিল। এ ধারা অনুসারে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একই সঙ্গে কাশ্মীরে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না বলে স্বীকৃতি পায়। জম্মু কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এমনই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল জম্মু কাশ্মীরের হাইকোর্ট। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ঘোষণা দেয় হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, ‘Kashmir is not part of India and thus can not be amalgamated in India. Under the article of 370 constitution, Kashmir is an autonomous area’.এ ছাড়া ৩৭০ অনুচ্ছেদ রাজ্যের স্থায়ী অধিবাসী ছাড়া সেখানে জমি ক্রয়, রাজ্যের চাকরিতে আবেদন ইত্যাদিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের কোনো নারী রাজ্যের বাইরে কাউকে বিয়ে করলে তার সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিধান ছিল। ৩৭০ অনুচ্ছেদ ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দিয়েছিল। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের কারণে জম্মু এবং কাশ্মীর ‘ইউনিয়ন টেরিটরি’ বা কেন্দ্রীয়ভাবে শাসিত রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হবে। কাশ্মীরবাসীর প্রতি ভারতের সংবিধান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নানা অজুহাতে ধীরে ধীরে সেসব রহিত হতে থাকে।

১৯৯০ সাল থেকে ভারতের সেনাবাহিনী আধাসামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বাড়াবাড়ির ফলে ১৯৯৮ সালে সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম হয়। এ বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরো কঠোর অবস্থানে যায়। ফলশ্রুতিতে আরো অশান্ত হয়ে ওঠে কাশ্মীর উপত্যকা।ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ৩৭০ অনুচ্ছেদ মেনে চলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখিয়েছিল। তবে ক্ষমতাসীন বিজেপি বিগত নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছিল, তারা ক্ষমতায় গেলে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করবে। মূলত সোমবার দেশটির রাষ্ট্রপতি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বিজেপির সেই পরিকল্পনাই বাস্তবে রূপ দিলেন।

প্রায় সাড়ে তিন যুগ আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো জাতিসংঘে দেওয়া তার বিখ্যাত ভাষণে বলেছিলেন, ‘কাশ্মীর কখনওই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয় - বরং এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার এক বিতর্কিত ভূখন্ড। আর কাশ্মীরের ওপর পাকিস্তানের দাবি সব সময়ই অনেক বেশি - কারণ রক্তে, মাংসে, জীবনযাপনে, সংস্কৃতিতে কিংবা ভূগোল আর ইতিহাসে তারা পাকিস্তানের মানুষের অনেক কাছের।’

ধর্মের সাদৃশ্যতা ও ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে কাশ্মীরের সঙ্গে পাকিস্তানের মিলটাই বেশি। সে হিসাবে কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ হতো পারতো। দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকে যে পাকিস্তানের নাম করণ করা হয়েছিল সেখানে পাকিস্তান বানানের ‘কে’ বর্ণ দ্বারা কাশ্মীরের নামের আদ্যক্ষর বুঝানো হয়েছিল। আজ কাশ্মীরা নিজ দেশে পরবাসী ও নির্যাতিত। হাজার হাজার কাশ্মীরি স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন।কাশ্মীরের জনগণ পরাধীন থাকতে চায় না, তাদের দাবি একটাই নিজেদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাওয়া। এখনো কাশ্মীরের প্রতিটি অলি গলিতে স্লোগান উঠছে “হক হামারা আজাদি, সিনকে লংঙ্গে আজাদি”।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য