নাজমুলের মেয়েটাকে কী জবাব দেবে এই রাষ্ট্র?

ফুটফুটে একটা মেয়ের শখ ছিল নাজমুল আলমের। সৃষ্টিকর্তা তাঁর এই ইচ্ছে পূরণ করেছেন। দুদিন আগে রোববার মেয়ে সন্তানের বাবা হন তিনি। কিন্তু সন্তান জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি তিনি। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় সেদিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৪ ঘন্টা পার না হতেই গতকাল সোমবার বিকেলে মারা যান তিনি। মেয়ের মুখ দেখা হয়নি তাঁর। মেয়েটাও জীবনে কখনো বাবার মুখ দেখতে পাবে না।

সাত সকালে খবরের লাইনগুলো যখন পড়ছিলাম বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। এতো কষ্ট কেন? এই দেশের নাগরিক হওয়ার? সুখ, স্বস্তি, স্বাভাবিক বলে কি কিছুই আর আমাদের জীবনে থাকবে না? তাহলে কেন এতো উন্নয়ন? কাদের জন্য? এই দেশটা কোনপথে যাবে?

গণমাধ্যম বলছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৫২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ওদিকে সরকারের সেই অচল পুরোনো যন্ত্র বলছে, নিহতের সংখ্যা এখনো আট। অথচ শুধু ঢাকা মেডিকেলেই মারা গেছে নয়জন। তাহলে কেন এই ভয়ঙ্কর মিথ্যাচার! বছরের পর বছর এভাবেই অস্বীকারের রাজনীতি চলছে। কিন্তু কেন? সত্য স্বীকার করে লড়াই করতে সমস্যা কোথায়?

আমাদের কী দুর্ভাগ্য, ডেঙ্গু নিয়ে আদালতকে পর্যন্ত নির্দেশ দিতে হয়। তবুও সিটি করপোরেশন তার নূন্যতম দায়িত্বটা পালন করতে পারে না। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবার আগেই সতর্ক করেছিল, এবার সংকট ভয়াবহ হবে। কী ব্যবস্থা নিয়েছিল তখন দুই সিটি করপোরেশেন? কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এই রাষ্ট্র? ডেঙ্গু বা মশা দমনে অবশ্যই বাসাবাড়িও পরিস্কার রাখা জরুরী কিন্তু সেটা হচ্ছে কী না সেটা দেখভাল করবে কে? আমাদের নাগরিকরা যে সচেতন নন, সেটা তো আমরা সবাই কম বেশি জানি তাই না?

খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। এই রাষ্ট্রের কর্ণধারদের বলবো, পাশের শহর কলকাতা দেখেন। গত কয়েকবছর ধরেই তারা ডেঙ্গুকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। কলকাতা সিটি কর্পোরেশনই তাতে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা সারা বছর ধরে নিবিড় নজরদারি চালায় - যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে।শহরের প্রতিটা হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা পরীক্ষাগারে রোগীদের কী কী রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে, কী ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রতিদিনের হিসাব রাখা হয়, যাতে ডেঙ্গু রোগীর খোঁজ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আর আমাদের? আমাদের মেয়েররা বলেন গুজব। মশা মারার ঔষুধ কাজ করে না জেনেও তারা কোটি কোটি টাকা জলে ফেলে। গাপ্পি মাছের আষাঢ়ে গল্প শোনায়। আর আমাদের জনগনও অসেচতন। এতোবার বলার পরেও সবাই কী নিজেরে বাসাবাড়ির ফুলের টব, পরিত্যক্ত ড্রাম, বোতল, ছাদবাগানে বালতি ও বাটিতে জমে থাকা পানি পরিস্কার করছেন?

ঢাকা শহরের সবচেয়ে শিক্ষিত লোকেদের এলাকা একাট নিকেতনে আসেন। আশপাশে তাকালেই দেখি শিক্ষার কী হাল। আমার প্রতিবেশি বাসাটার সামনে সবসময় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। গত ১৫ দিন ধরে বলছি, এই জায়গাটা ঠিক করেন। আর ঢাকা শহরের দুই ভবনের মাঝখানে বা পেছনে যে ময়লা জমে থাকে সেটা কী আর বলবো? নিজের বাসা বাদে সবাই গোটা শহরটাকে ভাগাড় মনে করে।

আচ্ছা বলেন তো এই যে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষনের শহর, সেটা পরিস্কার করতে আমরা কী করেছি? এই শহরের সব খালগুলো কারা ভরাট করেছে? তারা কী গরিব মানুষ নাকি বড়লোক? আমাদের নগররিপতারা, রাজউক, রাষ্ট্র সবাই বসে বসে কী করেছে? দায়িত্বে থাকা এই রাষ্ট্রের বেশিরভাগ লোক কেন দায়িত্বহীন? আমাদের ডাক্তার-নার্সরা যেখানে লড়াই করছে অনবরত, সেখানে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বপরিবারে মালয়েশিয়ায়।

জানি এসব বলে লাভ নেই। একেকটা ডেঙ্গুর মৃত্যুর খবর পড়ি আর আমার কষ্টে কান্না পায়। আচ্ছা আমরা যারা আমেরিকা, কানাডা নয়, এই দেশটাতেই বাস করতে চাই, বছরে যারা লাখ লাখ টাকা কর দেই, যারা একটু স্বস্তি চাই শুধু তারা কী অপরাধ করেছি? কেন একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন নগরী পাবো না? কেন এই দেশে একটা ফেরিতে ওঠার জন্য তিন ঘন্টা বসে থাকতে হবে? পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা কোথায়?

আমি আমার নিজের কথা বলতে পারি। কোনদিন এই দেশের কোন ক্ষতি করিনি। কোন নিয়ম ভাঙিনি। একটাকা কর ফাঁকি দেইনি। কিন্তু বিনিময়ে কেন আমার আড়াই বছরের ছেলেটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে? জানি এই কান্নার, এই আকুতির কোন দাম নেই। কেউ শুনবে না। তাই নগরবাসীর কাছে আকুতি করি, চলুন আমরা আমাদের বিবেক, বুদ্ধি কাজে লাগাই।

চলুন শহরটাকে পরিচ্ছন্ন করি। ক্ষমতাশালীদের টাকা আছে, বিদেশি পাসপোর্ট আছে, আমার আপনার তো কিছু নেই। আমাদের যদি এই দেশেই থাকতে হয়, নিজেরাই মাঠে নামি। ‌নিজের বাসা প‌রিস্কার রাখি। আশপাশের লোকজনকে সতর্ক হতে বলি। আপনার প্রতিবেশি সচেতন না হলে সেখানকার ছবি দিয়ে দেন। হাতের মোবাইলটা কাজে লাগান। ভবন মা‌লিক বা স‌মি‌তি‌ সবাই স‌ক্রিয় হই।

আমার মনে হয়, একমাসের নির্বাচনী প্রচার চলাকালে যেমন লোকজন বাড়ি বাড়ি যায় সেভাবে যদি প্রতিটা পাড়া, মহল্লা, রাস্তায় স্বেচ্ছাসেবী লোকজন থাকে যারা সবাইকে নিয়ে এলাকার সব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করবে, প্রত্যেকে তাদের বাড়ির দায়িত্ব নেবে আমার মনে হয় ডেঙ্গু নির্মূল সম্ভব। সব রাজনৈতিক দলগুলোর ওয়ার্ড কমিটি, ছাত্র, মুরব্বী সবাই নিয়ে কাজটা করা যায়। কোরবানির জন্য তো এমনিতেই সিটি করপোরেশনকে নির্ধারিত স্থান করতে হয়। সেটা যদি এবার আগেই করা যায় এবং সেখানে বসে সবাই ওই এলাকার খোঁজ নেয় কাজটা সম্ভব। এছাড়া এবার কোরনাবানিতেও এবার বেশি পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

আমি সবসময় বলি, প্র‌তিটা মৃত্যু মানে আমরা কেউ না কেউ দায়ী। বলেন তো নাজমুলের মেয়েটাকে কী জবাব দেবে এই রাষ্ট্র? বারবার বলছি, চলুন ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। একটা পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ি। কোন বাবা-মাকে যেন সন্তানহারাতে নয়। কোন সন্তানকে যেন বাবা-মা না হারাতে নয়। প্রতিটা মানুষ ভালো থাকুক। নিরাপদে থাকুন।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ