মিন্নির গ্রেফতার অন্য মিন্নিদের জন্য সতর্ক সংকেত

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি
আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি

গত জুনের শেষ সপ্তাহে বরগুনা শহরের কলেজ রোডে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গতকাল গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এতে রিফাত খুনের অনেক রহস্য উদঘাটিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ গ্রেফতার ও মিন্নির রিফাতের খুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ যেন কালজয়ী সিনেমার গানকে মনে করিয়ে দেয়।

‘ভালোবাসলেও সবার সাথে,
ঘর বাঁধা যায়না।
হাজার বছর পাশে থাকলেও
কেউ কেউ আপন হয় না।’

রিফাত হত্যাকান্ডের পর মিন্নির সাক্ষাৎকার ও কথা শুনে অনেকে তার দিকেই সন্দেহের অঙুলি নির্দেশ করছিলেন। মিন্নির বডি ল্যাংগুয়েজ ও কথা বলার স্টাইল ছিল শোকহীন বাগাড়ম্বতায় পূর্ণ। মেয়েদের চোঁখে দুই ধরণের অশ্রু থাকে। একটি দুঃখের অপরটি ছলনার। (পিথাগোরাস)। মিন্নির চোখে কি ছিল দেশবাসী দেখেছেন।

সর্বশেষ ভিডিওটি ভাইরাল হবার পর সন্দেহ আরো জোরালো হয়। চীনা প্রবাদে বলা হয়, ‘একটি ছবি দশ হাজার শব্দের সমান।’ ছবি নয় সর্বশেষ ভাইরাল হওয়া রিফাত হত্যার ভিডিওটিতে অনেক অজানা প্রশ্নের জবাব মিলবে। মিন্নির কি ভূমিকা ছিল সেটিও স্পষ্ট করবে। ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মিন্নির নিয়মিত নয়নের বাসায় যাতায়াত করার খবর।

এমনকি রিফাত হত্যার আগের দিনেও মিন্নি নাকি নয়নের বাড়িতে গিয়েছিল। একথা জানিয়েছেন নয়নের মা। সর্বশেষ রিফাতের বাবার সাংবাদিক সম্মেলন ও স্থানীয়দের মানববন্ধনের পর মিন্নি গ্রেফতার হলো। খবরে প্রকাশ মানবববন্ধনের পরপরই বাবার বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে মিন্নি দাবি করেছিলেন, ক্ষমতাধর আসামিদের আড়াল করতেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। শ্বশুরকে চাপ দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করানো হয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন মিন্নি।

গত রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রিফাত হত্যায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে তার বাবার বাড়ি থেকে পুলিশ লাইনে আনার কথা জানিয়েছিলেন বরগুনার এসপি। মামলার প্রধান সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি নেওয়া হয় তখন।

মাত্র দুমাস আগে রিফাত মিন্নির বিয়ে হয়েছিল। সত্যিই যদি রিফাত খুনে মিন্নি জড়িত থাকে তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পারিবারিক জীবনে আতঙ্কিত হবার মতো বিষয়। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে পারিবারিক বন্ধন এমনিতে দিনদিন ভঙ্গুর হতে চলছে। এ ঘটনা মিন্নির উত্তরসূরি যারা পরবর্তীতে এ ধরনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন তাদের জন্য এটি একটি সবুজ সংকেত বটে।

সাংসারিক জীবনে স্বামী- স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসায় এটি সন্দেহের ক্ষত তৈরি করবে। প্রতিটি ঘটনা যথেষ্ট শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে। যুগযুগ ধরে পাশাপাশি অবস্থান করেও এক বালিশে ঘুমিয়েও হয়তো পরস্পরিক বিশ্বাস ও মন রক্ষা করা যাবে না। বুকে হয়তো চিরদিন আগলে রাখতেও ভয় হবে। সেই কথা ভেবেই হয়তো রবীবাবু বলেছিলেন,
নারীর মন,
সখা, সে তো সহস্র বছরের সাধনার ধন।

তবে মিন্নির অপরাধ প্রমাণিত হলে পৌরাণিক কাহিনীর বিভীষণের মতো তাকে মনে হবে। ঘরের শত্রু বিভীষণ। মিন্নি হবে রমণী বিভীষণ। নারী কি তার রহস্য উদঘাটনেও হিমশিম খাচ্ছেন গবেষকরা। স্বয়ং স্রষ্টা নাকি নারীর রহস্যের কারণে নারী জাতির সৃষ্টির পরে আফসোস করেছেন। নারীর ভালোবাসার কুহকে পড়ে পুরুষ সাজিয়েছে ধরণী অপূর্ব মহিমায়। কখনো ধ্বংস করেছে কত বিস্তৃত জনপদ।

ইতিহাস বলে, হেলেনের বিয়ে হয়েছিল কমপক্ষে তিন বার। রাজা মেনিলাস, প্যারিস ও তার ভাই ডাইফোবাসের সাথে। এই হেলেনকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীমের হৃদয়ের মধ্যে আদৃত থেকে দ্ৰৌপদী তাকে বল যুগিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন,

কোন কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি;
শক্তি দিয়াছে, প্রেরণা দিয়াছে, বিজয় লক্ষ্মী-নারী।

সেই নারী বীর আণ্টনির হৃদয় অধিকার করে ক্লিওপাট্র তার বল হরণ করে নিল। সত্যবানকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করেন সাবিত্রী। কিন্তু কত নারী পুরুষের সত্য নষ্ট করে তাকে মৃত্যুর মুখে নিয়ে গেছে তার সংখ্যা কিন্তু জানা নেই।

ক্যালডীয় সভ্যতার অপর নাম হলো নতুন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। সভ্যতায় ক্যালডীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান বর্ষপঞ্জী চালু ও ঝুলন্ত উদ্যান। বর্তমানে ইরাকের আল-হিরা ব্যাবিল নামক স্থানে তৎকালীন ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাঁদ নেজার ৬০০ খ্রি. পূর্বাব্দে এ ঝুলন্ত উদ্যানটি তৈরি করেন। মজার ব্যাপার হলো, নেবুচাঁদ নিজের সুনামের জন্য উদ্যানটি তৈরি করেননি। তিনি তার স্ত্রীকে খুশি করার জন্যই ভালোবেসে এই ঝুলন্ত উদ্যানটি তৈরি করেছিলেন। নেবুচাঁদের স্ত্রী বাগান ও ফুলকে খুবই পছন্দ করতেন, আর নেবুচাঁদও জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন প্রিয় স্ত্রীকে। তাই স্ত্রীর একান্ত ইচ্ছাতেই নেবুচাঁদ নেজার তৈরি করেন পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় এই ঝুলন্ত উদ্যান।

সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অমর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তাজমহলের নির্মাণ শুরু করেন ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে। বিশ হাজারেরও বেশি শ্রমিকের করস্পর্শে নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। রবীন্দ্রনাথ তাজমহলের প্রেমে পড়ে কবিতায় লিখলেন,

একবিন্দু নয়নের জল
কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল
এ তাজমহল।

বেহুলা সারারাত জেগে থেকে স্বামীকে পাহারা দেবেন বলে মনস্থ করলেন। কিন্তু মনসা তার শক্তিশালী মন্ত্র দিয়ে তাকে ঘুমে তলিয়ে দিলেন। নাগিনী এসে দেখে, বেহুলা ঘুমিয়ে গেলেও তার স্বামীকে এমনভাবে সুরক্ষা দিয়ে রেখেছে যে, শরীরের কোনো অংশেই দংশন করার উপায় নেই। তবে সামান্য অসতর্কতা থেকে গিয়েছিল। বাসর শয্যা থেকে বেহুলার চুলগুলো ঝুলেছিল নিচের দিকে। চুল বেয়ে উঠে যায় কালনাগিনী। দংশন করে লখিন্দরকে। এতে প্রাণ চলে যায় তার। মনসা দেবীর পূজা করায় প্রাণ ফিরে পেলো লখিন্দর। চোখ মেলে তাকালো বেহুলার দিকে। সুন্দর করে হাসি দিলো। আর পচে যাওয়া দেহও স্বাভাবিক হয়ে গেল। এই তো হলো স্বামী-স্ত্রীর অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধন।

কিন্তু সেই ভালোবাসায় যদি তৃতীয় পক্ষের থাকে অনুপ্রবেশ। তাহলে সেখানে অশান্তি ও রিফাত মিন্নির মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে বাধ্য। বাংলাদেশের অনেক পরিবার আছে যেখানে পারিবারিক অশান্তি স্বামী-স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্ক বিদ্যমান। কাজী নজরুল ইসলাম পূজারিণী কবিতায় বলেন,

নারী নাহি হ’তে চায় শুধু একা কারো,
এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো!
ইহাদের অতিলোভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,
যাচে বহু জন।..

শুধু নারীকে দোষারোপ করাটাও সমীচীন হবে না। পুরুষ যে ধোঁয়া তুলসী পাতা তা নয়। নজরুল আবার বললেন,

‘বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী!’

হুমায়ূন আজাদ বলেন নারী সম্পর্কে আমি একটি বই লিখছি; কয়েকজন মহিলা আমাকে বললেন, অধ্যাপক হয়ে আমার এ বিষয়ে বই লেখা ঠিক হচ্ছে না। আমি জানতে চাইলাম, কেনো? তারা বললেন, বিষয়টি অশ্লীল!

লেখক: মো. আবু রায়হান

শুধু মিন্নি নয়, অপরাধী যেই হোক তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। রিফাতের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। সেই সঙ্গে বেঁচে থাকা মিন্নির মতো অন্যরাও সতর্ক হোক। শেষ করি ‘আইন মাকড়সার জালের মত, ক্ষুদ্র কেউ পরলে আটকে যায় বড়োরা ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসে- (সলোন)।’ এমনটি যেন না হয় প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক। ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

[লেখক: শিক্ষক ও গবেষক]


সর্বশেষ সংবাদ