এরশাদের মৃত্যু ব্যথিত করিয়াছে যাহা

নয় বছর ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা এক সময়ের সেনাশাসক এইচএম এরশাদ আর নেই।আজ সকালে তিনি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত কারণে রোগ শোকে ভুগছিলেন।সেই সময়ের এ প্রতাপশালী সামরিক শাসক বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ও সমালোচিত।যার শাসনামলে বাংলাদেশের সিংহ ভাগ উন্নয়ন হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এ স্বৈরশাসকের মৃত্যুর পূর্বের দিনগুলো খুব একটা সুখকর ছিল না বলে সোসাল মিডিয়ায় রাষ্ট্র হয়েছে ।তাঁর জীবন সায়াহ্নের কয়েকটি বিষয় দারুণভাবে ব্যথিত করেছে।

শেষ দিনগুলোতে তাঁর চরম অর্থ সংকটের কথা শুনেছি। এমনকি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ অর্থাভাবে এরশাদের চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না বলে সংসদকে অভিহিত করেছিলেন। অথচ এইচএম এরশাদ জীবদ্দশায় ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তার নগদ টাকার পরিমাণ ২৮ লাখের মতো লিখেছিলেন।হলফনামায় এরশাদ বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার ৩৭ লাখ ৬৯ হাজার ৪৬ টাকা জমা রয়েছে। বিভিন্ন শেয়ারে তার বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৪ কোটি ১০ হাজার টাকা। তার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ও এফডিআর ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা; ডিপিএস রয়েছে ৯ লাখ টাকার।এরশাদ লিখেছিলেন, গুলশান ও বারিধারায় তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার দাম এক কোটি ২৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। এর বাইরে ৭৭ লাখ টাকা দামের একটি দোকান রয়েছে তার। নয় বছরের শাসকের অর্থ সংকট চলছে সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য?

নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পরেও বর্তমান সময়ে সরকারের সুযোগ সুবিধা ভোগকারী পতিত স্বৈরশাসকের নিচের খবরটি পড়ে যারপরনাই কষ্ট অনুভূত হয়েছিল। নিজের জন্য কবরের জায়গা খুঁজছেন জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এইচএম এরশাদ। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়া এরশাদের পরামর্শে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন গত কয়েকদিনে রাজধানী ও আশপাশে কবরের জন্য একাধিক সম্ভাব্য স্থান সরেজমিনে দেখেছেন।

কবরের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনে যাওয়া একাধিকজন গণমাধ্যমকে জানান, এরশাদের ইচ্ছা মৃত্যুর পর যেন ঢাকায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেক্ষেত্রে কবরের কাছে যেন মসজিদ, মাদ্রাসা থাকে। এরকম উপযুক্ত স্থান পাওয়া না গেলে রংপুরে সমাহিত করার কথা জানিয়ে রেখেছেন তিনি।এরশাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ইতোমধ্যে বনানী কবরস্থানে স্থায়ী জায়গা কেনার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে রাজধানীর বারিধারায় আমেরিকান সেন্টারের কয়েকশ গজ উত্তরে একটি মাদ্রাসা ও এতিম খানার কাছে জায়গা দেখা হয়েছে। এছাড়া পূর্বাচলের কাছেও একটি জায়গা দেখে এসেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোনোটিই এখনও চূড়ান্ত হয়নি।"আজকেই জাতি জানতে পারবে সাবেক এই শাসকের শেষ ঠিকানা। যেখানে তিনি চির শায়িত হবেন।

শিক্ষক ও গবেষক মো. আবু রায়হান

"বিদায়ের সেহনাই বাজে নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে, সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে এই যে বেঁচে ছিলাম দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয় সবাইকে অজানা গন্তব্যে, হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি অজান্তেই চমকে ওঠি জীবন, ফুরালো নাকি! এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…’ (রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ)

রাজনীতিতে অনিশ্চিয়তা সৃষ্টি আর ডিগবাজির জন্য বিখ্যাত এইচএম এরশাদ বিভিন্ন সময়ে সকাল বিকাল স্ববিরোধী বক্তব্যে জনগণ ছিল বিরক্ত। তাঁর রাজনীতিতে অবস্থান বিতর্কিত বক্তব্য জনগণের মধ্যে হাস্যরসের রসদ জুগিয়েছে। তেমনি তাঁর মৃত্যু নিয়েও চলেছে গুজব। জীবিত এরশাদের মৃত্যু অনেক সময় গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজনীতিতে এরশাদের দুর্বল অবস্থানের কারণে তাঁর রাজনীতিতেও ছিল নিস্তেজ ও শক্তিহীন অবস্থান। এরশাদের শক্তিহীন অবস্থানের কারণে বাংলার আকাশেও বিভিন্ন সময়ে উঁকি দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও কালো মেঘের ঘনঘটা।কখনো কখনো জোর করে বানানো হয়েছে অসুস্থ রোগী। প্রকৃতপক্ষে সেই সময়েই এরশাদের রাজনীতিতে শারীরিক মৃত্যু ঘটেছিল। আজ তার আত্মার মৃত্যু ঘটলো।"ভীরুরা মরার আগে বারে বারে মরে। সাহসীরা মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে। ” (উইলিয়াম শেক্সপিয়র)

বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বলা হয়েছে, এরশাদের মৃত্যুর গুজব ছড়াচ্ছে পরাজিত শক্তি, দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অপশক্তি, দলের মালিক হতে চায় এমন সুবিধাবাদীরা। লোভিরা তাদের লোক দিয়ে এমন গুজব ছড়াচ্ছে।একই সঙ্গে দল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরশাদকে নিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অবশেষে সব গুজব তর্কবিতর্ক কানাঘুষার অবসান ঘটিয়ে পরপারে মহান প্রভুর সান্নিধ্য পাড়ি জমালেন তিনি।মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথায় শেষ করি, “ জম্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে? চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে?”

লেখক: আবু রায়হান
শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ