এই অভিবাসী সংকটের শেষ কোথায়?

দারিদ্র্য, বেকারত্ব, যুদ্ধ, উন্নত জীবনের প্রত্যাশাসহ নানাবিধ কারণে সারাবিশ্বব্যাপী অভিবাসীদের ঢল নেমেছে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার (আইওএম) এক প্রতিবেদনে এই অভিবাসী স্রোতকে ‘সর্বনাশা যাত্রা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আসলেই এই যাত্রা সর্বনাশী। এই যাত্রার দুর্বিষহ ও হৃদয়বিদারক চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আয়লান কুর্দি ও ভ্যালেরিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর চিত্র।

আয়লান কুর্দি ও ভ্যালেরিয়ার মৃত্যু চিত্র শুধু আমাদের একথাই স্বরণ করিয়ে দেয় মানবিকতা কি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে? হয়তবা, হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার পর থেকে অভিবাসন সংকট প্রকট থেকে প্রকটতর রূপ ধারণ করেছে।

ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কেন কুচিনেল চলতি সপ্তাহে ‘ফেস দ্য নেশন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বলেন, প্রায় ১০ লক্ষ অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর আদেশ পাওয়া গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রদত্ত এই আদেশ যদি সত্যি বাস্তবায়িত হয় তাহলে অভিবাসী সংকট আরো বাড়বে বৈকি। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে যেমন আইএস নামক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আর্বিভাব ঘটেছে ঠিক একইভাবে মাথা তুলে দাড়িঁয়েছে এই অভিবাসন সংকটও।

নিরাপদ জীবনের সন্ধানে সিরিয়া থেকে তুরস্কের পথে যাত্রায় যেমন আয়লান কুর্দি প্রাণ হারিয়েছে, তেমনি উন্নত জীবনের সন্ধানে প্রাণ হারিয়েছে এল সালভাদরের ভ্যালেরিয়া ও তার বাবা। ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ৩২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে এক হাজার ৬০০টি শিশু এবং যাদের বয়স ছয় মাসের মতো। ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের কারণে ইউনিসেফের পরিসংখ্যান মতে, ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা ৫ লাখ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১১ লাখে দাড়িঁয়েছে।

জাতিসংঘের ২০১৫ সালে দেয়া তথ্য মতে, বিশ্বে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ৪০ লাখ। ২০১৭ সালে যা বেড়ে দাড়িঁয়েছিল ২৫ কোটি ৮০লাখে। এই পরিসংখ্যান দুইটি অভিবাসী সংকটের প্রকটতা অনুমানে আমাদের নিশ্চয় সহায়তা করতে সক্ষম। গত কয়েক বছরে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

তবে, পিছিয়ে নেই এশিয়াও। শুধুমাত্র, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের কারণে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পাশ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ এই কাজের মাধ্যমে উদারতার পরিচয় দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান বাংলাদেশের জন্য সম্ভবপর নয়। উচ্চ বেকারত্ব হারের কারণে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে অনেকে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে। বাড়তি অভিবাসীর চাপে ইউরোপের দেশগুলো সন্দিহান হয়ে পড়েছে।

অভিবাসনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিনিয়োগমন্ত্রী। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে দেয়া অভিমতে, তারা আরো বলেন অভিবাসনের প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক সুযোগগুলোর অভাব। তার কথার সূত্র ধরে বলা যায় যে, যুদ্ধের পাশাপাশি উচ্চ বেকারত্বের হারও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির অভাবেও অতিমাত্রায় অভিবাসী সংকট দেখা যাচ্ছে।

তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দেয়া তথ্য মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোতে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ নিজভূমি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাবে। উপরোক্ত, সকল তথ্য অভিবাসী সংকটের করুণ ধারনা যেমন দিচ্ছে, তেমনি চিন্তার উদ্রেকও করছে। অভিবাসন এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও এই মানব ঢল নিয়ন্ত্রণের কোনো বৈশ্বিক পদ্ধতি নেই। এই কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন তার ইচ্ছেমতো অমানবিক পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন। তেমনি অন্যরা তার দ্বারা উৎসাহিত হচ্ছেন।

এভাবে চলতে থাকলে আরো আয়লান ও ভ্যালেরিয়া চিত্রের অবতারণা হবে। পাশাপাশিভাবে, ধ্বংস হবে মানব সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বৈশ্বিক রূপ। একারণে, অভিবাসন সংক্রান্ত একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অসমতা নিরসনের চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, যুদ্ধের পরিবর্তে বৈশ্বিক শান্তির জন্য কাজ করতে হবে। চতুর্থত, জাতিগত সংঘাত ও দাঙ্গাগুলোকে নিরূৎসাহিত করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলগুলোতে খাবারের পর্যাপ্ত সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে।

তবে উদোগগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য রাঘব বোয়ালদের সঙ্গে নিতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে যারা যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসা করে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে, যাতে তারা যুদ্ধমুক্ত বিশ্বের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। নতুবা আয়লান, ভ্যালেরিয়া চিত্রের অবতারণা হবে বার বার।

লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ডক্টর মালিকা কলেজ, ঢাকা


মন্তব্য