‘জাতীয় কবি’র সাংবিধানিক স্বীকৃতি কি মিলেছে নজরুলের?

  © সংগৃহীত

‘বল বীর -/বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!’

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি একাধারে বিদ্রোহী, মানবতা ও নারীমুক্তির কবিও। আবার তিনি প্রেম ও বিরহের কবি। ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, গীতিকার ও সুরকার। আজ শনিবার তার ১২০ তম জন্মজয়ন্তী। বাংলা সালের হিসেবে প্রতিবছর ১১ জ্যৈষ্ঠ এ দিবসটি পালন করা হয়। কবির জন্মজয়ন্তী পালন করা হচ্ছে নানা আয়োজনে। রাষ্ট্রীয় আয়োজনের পাশাপাশি থাকবে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি।

নজরুল বিদ্রোহ করেছেন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বলেছেন, ‘চির উন্নত মম শির’। কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত লিখেছেন অবিরত। স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারা দুরন্ত মানুষটির লেখা বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত।

সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার ও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার অগ্নিঝরা কবিতা ও গান মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিল অনন্ত প্রেরণার উৎস। যখন গণতন্ত্র ও মানবতা বিপন্ন হয়ে পড়ে, সাহস সঞ্চয় করি বিদ্রোহী কবির ছন্দ থেকে। নজরুল ছিলেন বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার ক্ষুরধার লেখনীর মধ্যে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সমাজ বদলের মন্ত্রণা সুস্পষ্ট।

নজরুল ইসলামের বেড়ে ওঠা ও তার সাহিত্যচর্চার পরিমণ্ডলের সাথে বাংলাদেশ গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। তিনি প্রথম পূর্ব বাংলাকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন ‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম’। বাংলাদেশের চেতনাকে তিনি লালন করতেন। তাই তাকে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে এর কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি এখনো নেই।

কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম হওয়ায় অবজ্ঞার শিকার হয়েও সমাজ বদলে গোটা উপমহাদেশের মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তুলে ধরেছেন কবিতায়, নিপীড়িত মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাই তো তিনি লিখেছেন,

‘...জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারে মহাজন কয়,
সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।
মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,
মাটির মালিক তাহারাই হন
যে যত ভণ্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান।
নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান।...’

নিজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে কবর দেয়া হয়। আজ ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই প্রিয় কবির মাজার ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে তার মাজার।

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে এসেছেন অনেকবার। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুরে কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে তার। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন প্রচণ্ড অভিমানী। একদা কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুর গ্রামে বন্ধু আলী আকবর খানের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সে বাড়ির আদরের দুলালী নার্গিসের সাথে তার বিয়ে হয়। পরে বিচ্ছেদ ঘটে।

শেষে মানিকগঞ্জের মেয়ে পিতৃহারা হওয়ায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে বসবাস করা তরুণী প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন নজরুল। প্রমীলার ঘরেই তার সন্তানদের জন্ম। তিন সন্তানের একজন মারা গেছেন আগেই। নাম ছিল বুলবুল।

জাতিসত্তা, নবচেতনা ও প্রেমের কবি নজরুল ছোটবেলায় দুখু মিয়া নামেই পরিচিত ছিলেন। কাজ করতেন রুটির দোকানে। পড়িয়েছেন মক্তবে। যাত্রা দলের জন্য গান লিখেছেন। এত কিছুর মধ্যেও তার হাতেই সৃষ্টি হয়েছে গান, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প আরো কত কী! রাজনীতিক কবি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন পত্রিকা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে দুরন্ত এই শিশুটির জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে। পরে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন গোটা ভারত উপমহাদেশের মানুষের মুক্তি ও চেতনার কবি। বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলে, শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শক্তিমান লেখনীর মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খেটেছেন। তিনি লিখেছেন,

বল বীর -/ বল মহা বিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর!...

রাষ্ট্রীয় শোষক গোষ্ঠীর আনুকূল্য চাননি তিনি। জমিদারির প্রত্যাশাও ছিল না। তাই অকপটে বলে গেলেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান/তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’

বাংলা ভাষার ঐশ্বর্য এবং নিজস্ব পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে নতুন এক বিস্ময়ের সূচনা করা এ মহান মানুষটি শেষ জীবনে বাকশক্তিহীন ছিলেন। অসুস্থ নজরুল ইসলামকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লজ’ ডিগ্রি দেয়া হয়।

১৯৭৬ সালে কবিকে দেয়া হয় অমর একুশে পদক। ওই বছরই তিনি চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২৯ আগস্ট পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ইন্তেকাল করেন।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ