Thedailycampus

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী টিউশন ফি কিভাবে দেবে?

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে ১০৫ টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে এবং সেখানে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছে। ২০১৭ সালে দেশে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩। সেখান থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৯২। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৭ হাজার ৪৫৯।

বর্তমানে ২০২০ সালে নতুন পুরাতন মিলিয়ে ১০৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী সুশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছে এবং হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর একটা বড়ো অংশ উঠে এসেছে মফস্বল কিংবা গ্রামের উচ্চমধ্যবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত ঘর থেকে।টিউশন ফির তারতম্য ও শিক্ষার মানের উপর ভিত্তি করে এসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে।

বরাবরের মতোই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও টিউশন ফির খাতটা বেশ অবহেলিতই থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টী বোর্ড বছরে বছরে টিউশন ফি বাড়িয়ে চলছে অথচ শিক্ষার মান কিংবা গুনগত কোনো উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভাষ্যমতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান; শিক্ষার্থীদের শতভাগ টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে ব্যয় হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে নামে বেনামে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের অর্থ উত্তোলনের ব্যাপারটি গত বছর বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো। অথচ বাবার পেনশনের সামান্য টাকা কিংবা ছোট ব্যবসার লভ্যাংশের টাকা দিয়েই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বেশিরভাগ ছাত্রের টিউশন ফি দিতে হয়।

বর্তমানে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চলছে অঘোষিত লকডাউন। ফলে বন্ধ হয়েছে শিল্প কারখানা, বন্ধ দোকান পাট।এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এদেশের কয়েক কোটি পরিবার। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবার লক্ষণও খুবই ক্ষীণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের ক্ষতির ক্ষত শুকিয়ে উঠতে অন্ততপক্ষে বছরখানেক সময় লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪ লক্ষ শিক্ষার্থীর পরিবারের কথাটা নতুন করে চিন্তার সময় এসেছে।

বেশির ভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ অথবা ৪ মাসে সেমিস্টার, সেক্ষেত্রে আগামী মে-জুন মাসে তাদের স্পিং সেশনের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে থাকে। পরীক্ষার পূর্বেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর সমস্ত টিউশন ফি পরিশোধ করতে হয়। যখন দেশের প্রতিটি কারখানা, দোকান, ব্যবসা ইত্যাদি সমস্ত কিছু বন্ধ আছে, এমতাবস্থায় উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সন্তানদের নিরবিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা একটি জটিল আকার ধারণ করবে।

২০১৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। তখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যবসায়ী। সমান হিস্যা ছিল শিক্ষাবিদদের। আর প্রায় এক-পঞ্চমাংশের উদ্যোক্তা ছিলেন রাজনীতিবিদ বা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাদবাকিদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বা এনজিও উদ্যোক্তারা।এনারা সবাই দেশের গন্যমান্য, প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিকভাবে বিত্তশালী। সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে এই আশাতে যে গ্র্যাজুয়েটরা একদিন তাঁদের কর্মদক্ষতার বলে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে সেই টাকা বহুগুণে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ছাত্র এই কাজটি করে চলেছে সরকার থেকে একটি পয়সাও না নিয়ে। এতোদিন তারা সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড কারোর কাছেই হাত পাতেনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকার অথবা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেশের প্রায় চার লক্ষ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী।

দেশের জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এতো বিস্তৃত জায়গা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সু্যোগ এখন আর নেই, কারণ জায়গার পরিমাণ সীমিত । দেশের মানুষের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সক্ষমতা বেড়ে চলছে কিন্তু সরকারিভাবে সুযোগ কমেছে তাই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়মুখী। তবে অদৃশ্য এক জাঁতাকলে আমরা সবাই বন্দি এখন। জয়পুরহাট থেকে ঢাকাতে সবজি এনে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে যে বাবা তার ছেলেকে টিউশন ফি দিতো, তিনি আজ পারছেন না; যে বাবার ৩টা বাস প্রতিদিন খুলনা থেকে চট্রগ্রাম যেতো তিনিও নিরুপায়, ছোট গার্মেন্টস দিয়ে অর্ডার বাতিল হওয়া বাবার হাস্ফাশ কিংবা শপিং মলের দোকানের আয় দিয়ে পরিবার ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগানো বাবাও আজ নিরুপায়।

মফস্বল কিংবা গ্রাম থেকে উঠে আসা এইসব শিক্ষার্থীদের শেষ ভরসার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড। বর্তমান অচলাবস্থার কথা চিন্তা করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব একমাত্র এই দুই কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে পারে। আপনাদের পূর্ণ সহযোগিতা ও সাহায্যই পারে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথটা বেগমান করতে। সেক্ষেত্রে চলতি সেমিস্টারের টিউশন ফি মওকুফই হতে পারে সর্বোত্তম পন্থা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অফ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।