Thedailycampus

এতিমের ভুয়া তালিকা, ৫ লাখ টাকা উত্তোলন

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আমিনুল শেখ বিদ্যুৎ–মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। তাঁর স্ত্রী পারুল বেগম গৃহিণী। তাঁদের ছেলে ওমর আলী ডোবরা-আল-গফুরিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্র। সম্প্রতি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ অনুদান সংগ্রহের এক আবেদনে আমিনুল ও পারুলকে মৃত দেখিয়েছে। ওমর আলীকে এতিম হিসেবে দেখানোর জন্য তারা এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে।

শুধু ওমর আলীই নয়; অভিযোগ উঠেছে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ২৬ জন শিক্ষার্থীকে এতিম হিসেবে উপস্থাপন করে ২০১৮–১৯ অর্থবছরে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা তুলেছে। গত ২৯ আগস্ট এ বিষয়ে স্থানীয় ৯ ব্যক্তি জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের সূত্র ধরে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাদ্রাসার ৪৩ জন এতিমের নামে চলতি বছরের জুনে ও গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দুই কিস্তিতে ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা তোলা হয়। অর্থ বরাদ্দের চেক হয় মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সদস্যসচিব ও মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের নামে। তাঁদের মধ্যে যে কেউ টাকা তুলতে পারেন।

সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও এতিমখানাটি ২০০৪ সালের মার্চ মাস থেকে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট ফান্ড পাওয়া শুরু করে। এরপর থেকেই এতিমখানার প্রতি ৪৩ জন এতিমের বিপরীতে এক হাজার টাকা করে অনুদান পায়।

ভুয়া এতিমের তালিকা নিয়ে অভিযোগকারীদের একজন জানান, এতিমখানাটিতে এতিম আছে ১৭ জন। কিন্তু তারা যেহেতু ৪৩ জনের নামে অর্থ বরাদ্দ পায়, সে জন্য ভুয়া ২৬ জন এতিমের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগকারীদের মধ্যে বোয়ালমারী সাতোর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলতি বছর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হজ করতে যান। ওই সময় তালিকা তৈরি করা হয়। মাদ্রাসারই এক শিক্ষক ভুয়া তালিকা তৈরির কথা জানালে স্থানীয় কয়েকজন মিলে বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পান। এরপরই জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের কাছে এ বিষয়ে প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়।

এতিমখানাটি এর আগেও এমন তালিকা তৈরি করে সরকারি বরাদ্দ তুলেছে কি না, সে তথ্য জানাতে পারেনি জেলা সমাজসেবা কার্যালয়। তবে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যে তালিকা দেয়, সেখান থেকে এতিমদের তালিকা ধরে যাচাই-বাছাই করা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তা করা হয়ে ওঠে না।

আর অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর ইসলাম গত রোববার বলেছেন, ‘তালিকা তৈরিতে কিছু ভুল হয়েছে। সংশোধন করে নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে।’

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের করা এতিমদের তালিকা ধরে গত রোববার বোয়ালমারীর গোবরা, লক্ষ্মীপুর ও রামনগর এলাকা ঘুরে ২৬ জন এতিমের মধ্যে পাঁচজনের পরিবারের বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। এসব বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বাবা-মা উভয়েই জীবিত আছেন। পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পরিবার দাবি করেছে তারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ানোর ইচ্ছা থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি করিয়েছেন। পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে টাকাও দেন তাঁরা। হেফজ বিভাগের ওমর আলীর বাবা আমিনুল শেখের দাবি, প্রতি মাসে সন্তানের খাওয়া ও মাদ্রাসার বেতন বাবদ মাদ্রাসার সুপারকে এক হাজার টাকা দেন। এ ছাড়া পরীক্ষার ফি ও দেন তিনি।

মিনহাজ নামের অপর এক শিক্ষার্থীর বাবা নিজাম শেখ একজন কাঠমিস্ত্রি। মা আসমা বেগম গৃহিণী। টিনের ঘরে সৌরবিদ্যুতের বাতি জ্বলছে। মিনহাজের বড় ভাই কাঠের সামগ্রী প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মিনহাজের বাবা নিজাম শেখ বলেন, তিনি তাঁর ১২ শতাংশ জমিতে কৃষিকাজ করেন। মিনহাজ মাদ্রাসার পাশের একটি বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করে। তার খরচের জন্য মাসে তিন শ টাকা করে পাঠানো হয়।

এতিমের তালিকায় থাকা আজিম মল্লিকের বাবা ওদুদ মল্লিক রিকশাচালক। মা আকলিমা মিল কারখানায় কাজ করেন। বোয়ালমারীর লক্ষ্মীপুর গ্রামে আজিমের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, আজিমদের নিজেদের বাড়ি ছাড়াও ছয়টি টিনের ঘর আছে, যেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সন্তানকে এতিম দেখিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অর্থ সংগ্রহের তালিকা তৈরি করার কথা শুনে নিজাম শেখ হেসে বলেন, ‘বেঁচে থাকা মানুষকেও মৃত দেখানো আবার কেমন ভণ্ডামি? এ কাজ তারা কেন করেছে, তারাই ভালো বলতে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এতিমখানা ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শাহ্ মুহাম্মদ খালিদ-বিন-নাসের বলেন, ‘আমি হজে থাকার সময় অন্য একজন তালিকাটি তৈরি করেছেন। তাতে কিছুটা ভুল হয়েছে। কিন্তু আমি কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাৎ করিনি। সংশোধিত তালিকা সমাজসেবা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।’

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা প্রকাশ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘ভুয়া এতিমের তালিকা তৈরির বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে তদন্তের চিঠি পেয়েছি। দ্রুতই তদন্ত শুরু করা হবে।’ (সূত্র: প্রথম আলো)