ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কেড়ে নিল ২২ প্রাণ

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে দেশে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে  © সংগৃহীত

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ, রাস্তা, ব্রীজ-কালভার্টসহ অবকাঠামোর পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষি এবং চিংড়ি ঘেরসহ মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আট জেলায় অন্তত ২২ জন প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এই তাণ্ডবে প্রাথমিকভাবে প্রায় সাড়ে ১১শ’ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমান।

সুপার সাইক্লোন আম্পানের শক্তি কিছুটা হারিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে বুধবার (২০ মে) দুপুরের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে রাতে বাংলাদেশে এ ঝড় প্রবেশ করে। ঝড়ের মধ্যে প্রবল বাতাসে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন দেশের অর্ধেকেরও বেশি গ্রাহক।

এ পর্যন্ত যাদের মৃত্যুর খবর এসেছে তাদের বেশিরভাগই ঝড়ে গাছ বা ঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে যাশোরে ১২ জন, পিরোজপুরে তিনজন, পটুয়াখালীতে দুজন এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ভোলা, চাঁদপুর ও বরগুনায় একজন করে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

যশোর

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে যশোরে মা-মেয়েসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২০ মে) রাতে যশোরের বিভিন্ন উপজেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যশোরের শার্শা উপজেলায় চারজন, চৌগাছায় দুজন, বাঘারপাড়ার একজন ও মণিরামপুর উপজেলার আছেন পাঁচজন।

পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় সবাই ঘরে অবস্থান করছিলেন। ঝড়ে ঘরের ওপরে গাছ পড়ে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেনচৌগাছা উপজেলার চানপুর গ্রামের চায়না বেগম (৪৫) ও তাঁর মেয়ে রাজিয়া খাতুন (১৪), শার্শা উপজেলার সামটা জামতলা গ্রামের মোক্তার আলী (৬৫), মালোপাড়া গ্রামের গোপালচন্দ্র বিশ্বাস (৬৫), গোগা পশ্চিমপাড়ার শাহজাহানের স্ত্রী ময়না খাতুন (৩৫) ও মহিষাকুড়া গ্রামের মিজনুর রহমান (৬০), বাঘারপাড়া উপজেলার বুধুপুর গ্রামের আবদুস সাত্তারের স্ত্রী ডলি বেগম (৫০), মণিরামপুর উপজেলার পারখাজুরা গ্রামের খোকন দাস (৭০), তাঁর স্ত্রী বিজন দাসী (৬০), ওয়াজেদ আলী (৫০), তাঁর ছেলে ঈশা (১৫) ও জবেদ আলীর স্ত্রী আছিয়া বেগম (৭০)।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম জানান, যশোরের বিভিন্ন উপজেলার ১২ জন মারা গেছেন। তাদের নাম-পরিচয়সহ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানিয়ে যশোর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।


পিরোজপুর

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মধ্যে মঠবাড়িয়া উপজেলায় দুই জন এবং ইন্দুরকানী উপজেলায় একজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মোজাহারুল ইসলাম।  নিহতেরা হলেন- মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের মজিদ মোল্লার ছেলে শাহজাহান মোল্লা (৫৫) ও আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামে মুজাহার বেপারীর স্ত্রী গোলেনুর বেগম (৭০) এবং ইন্দুরকানী উপজেলার উমিদপুর এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে শাহ আলম (৫০)।

পটুয়াখালী

আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীতে গাছ পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) এক সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

গলাচিপা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, বুধবার সন্ধ্যায় গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি এলাকায় ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ছয় বছরের শিশু রাসেদ নিহত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সন্ধ্যায় উপজেলার পানপট্টি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খরিদা গ্রামের শাহাজাদা মিয়ার ছেলে রাসেদ (৬) মায়ের সঙ্গে আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছিল। পথে ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ঘটনাস্থলে রাসেদের মৃত্যু হয়। রাসেদের মাও আহত হন।

চাঁদপুর

চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে আম কুড়াতে গিয়ে ঝড়ের মধ্যে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে জান্নাত বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাতে ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে বলে বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মনসুর আহম্মেদ জানিয়েছেন।

ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহে রাতে ঝড়ের মধ্যে ঘরের উপর গাছ ভেঙে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ। তিনি বলেন, রাত ১০টার পর ঝড়ের দাপট বাড়লে সদর উপজেলায় হলিধানী গ্রামে একটি গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে নাদিরা বেগম নামে ৫৫ বছর বয়সী ওই নারীর মৃত্যু হয়।

সাতক্ষীরা

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরা সদরে গাছ ভেঙে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, বুধবার সন্ধ্যার পর জেলা শহরের কামালনগরে আমগাছ গাছ ভেঙে পড়ে ওই গৃহবধূর মৃত্যু হয়। তবে নিহতের পরিচয় জানাতে পারেননি তিনি।

ভোলা

চরফ্যাশনে ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুরে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার প্রধান সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ আইচা থানার ওসি হারুন অর রশিদ জানান, ছিদ্দিক ফকির নামের ৭০ বছরের ওই বৃদ্ধ বয়স্ক ভাতা আনার জন্য ভাড়া করা মোটরসাইকেলে উপজেলা সদর চরফ্যাশনের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঝড়ে একটি গাছ ভেঙে পড়লে তিনি গুরুতর আহত হন। উদ্ধার করে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বরগুনা

সদর উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়ার পথে এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। শহীদুল ইসলাম নামের ৬৪ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। পরীরখাল বাজারে রেস্তোরাঁ চালাতেন তিনি।

উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ সেলিম জানান, এ ইউনিয়নের পরীরখাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে শহীদুল ইসলামের মৃত্যু হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে হৃদরোগে ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ