সাদা চামড়া না হলে আবেগটা ঠিক আসে না!

লেখা-১: দিন দিন বস্তা পচা আবেগে বাঙালি ভাইরাল এক জাতিতে পরিণত হয়েছে। আজ সারাদিন ফেসবুক ওয়াল জুড়ে সাদা চামড়ার এই ডাক্তার দম্পতির নামে কিছু ছবি ভাসছে যারা নাকি বাংলাদেশের ডাক্তার সমাজকে লজ্জায় ফেলে দিছে। এত সহজ?

কাইলাকুড়ি হেলথ কেয়ার প্রজেক্টের এড্রিক বেকার সাহেবকে আমি নিজে ফোন দেই ২০১৩ সালে। উত্তরার আমির কম্প্লেক্সের একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে আমি উনার সাথে দেখা করি । উদ্দেশ্য উনার স্বাস্হ্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে সেবা প্রদান। কিন্তু কথা বলে জানতে পারি সেটা মূলত চালায় প্যারামেডিকসরা। আমি উনার নাম্বার পাই প্রথম আলোর ছুটির দিনের মাধ্যমে। ইত্যাদির প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উনি ডুনেডি শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করেছেন। বলতে চাই ওটাগো মেডিকেল কলেজ না। University of Otago এর under এ Dunedin School of Medicine. সেখানে এমবিবিএস কোর্সই নাই। চাইলে যে কেউ ওয়েবসাইটে ঘুরে আসতে পারেন। মিডিয়া যে কাউকে রাতারাতি হিরো বানায়। এড্রিক বেকার সাহেব ভাল মানুষ। কিন্তু মিথ্যা তথ্য দেয়াটা মিডিয়ার কতটুকু যৌক্তিক?

উনি একজন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটের (আমি) হাতে দায়িত্ব দিতে চাননি। কিন্তু আজকের ভাইরাল নিউজটা এমন যে ১৬ কোটি বাঙালির মধ্যে ১ জন মানবতাপূর্ন ডাক্তার নাই। যিনি উনার প্রজেক্টটা চালাবেন? What a joke!

আমার ফাইনাল পরীক্ষার সময় জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম জীবনে এতিম আর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে ভিজিট নিব না। আর প্র্যাক্টিস লাইফে সংখ্যাটা কম ছিল না। পথশিশুদেরটা বাদই দিলাম। ওটা অগণিত। আমি এরকম ফালতু একটা সংবাদের নিন্দা জানাই। তীব্রভাবে জানাই। আমি লজ্জিত না, হওয়ার প্রশ্নই আসে না। মিডিয়া কিভাবে ডাক্তারকে জনগণের কাছে ভিলেন বানায় তার প্রমাণ।

(ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)

লেখা-২: সম্ভবত এই দম্পতি বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে গুণীজন এবং প্রসংশায় ভাসছেন। আর সমগ্র বাংলাদেশের ডাক্তাররা লজ্জায় ভেসে যাচ্ছে! ২০১৬ সালের মে মাসে আমি কাইলাকুড়ি গিয়েছিলাম। খুব সুন্দর পরিবেশ। বাংলাদেশে মাটির ঘরের এরকম হাসপাতাল আর আছে কিনা সন্দেহ আছে। সেখানে যারা কাজ করে মোটামুটি তাদের সবার সাথেই আমার দেখা হয়। মূলত ডায়াবেটিসসহ আরো কিছু অন্য রোগের অল্পসংখ্যক রোগীদের সেখানে রেখে ট্রিটমেন্ট করানোর ব্যবস্থা আাছে। আগেই বলে রাখি ইত্যাদি বা অন্য মিডিয়ার মাধ্যমে ওই হাসপাতালের নাম আমি জানিনি। কৌতুহল বা জানার আগ্রহ নিয়ে ওখানে আমি যাইনি, গিয়েছিলাম ১১ বছর বয়সী ডায়াবেটিসের রোগী নিয়ে। ওখানে মূলত গরীব রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীর মাধ্যমে হাসপাতালটি পরিচালিত হয় এবং সেবার মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার লক্ষণীয়।

সপ্তাহে একবার গণস্বাস্থ্য মেডিকেলের দুজন ডাক্তার সেখানে আসে। বাকী বা পুরো সময়টা মেডিক্যাল এসিস্টেন্ট দিয়ে সব কাজ চালানো হয়। আজ দেখলাম আমেরিকান ডাক্তার দম্পতি হাসপাতাল চালাচ্ছেন।

২০১৩ সালে ইত্যাদির প্রচারেরও আগে ডা. মোস্তাফিজ নামের একটা ভদ্রলোক প্রথম আলোর মাধ্যমে জানতে পেরে আগ্রহী হয়ে ডা. এড্রিক বেকারের সাথে ঢাকায় দেখা করেন। তিনি তখনো ডিপ্লোমা প্যারা মেডিকসরা দ্বারা ওই হাসপাতাল চালাচ্ছিলেন, কিন্তু এড্রিক সাহেব কোন গ্রাজুয়েট ডাক্তারকে দায়িত্ব দিতে চান নাই।

আরেক ডা. মো. শাহ আলম। সৌদি আরবের মদিনা হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ছিলেন। ভালোবেসে দেশের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য বিলাসী জীবন ছেড়ে ফিরে আসেন জন্মভূমি বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের কুমিরাতে নিজ এলাকায় চালু করেন বেবী কেয়ার নামে স্বল্প খরচের একটি হাসপাতাল। নিজ এলাকায় হাসপাতাল খুললেও প্রতিদিন নগরীর চান্দগাঁও বাসা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে এ হাসপাতালের দেখভাল করতেন। কিছুদিন আগে এই ভদ্রলোক খুন হন। তখন কেউ লজ্জায় ভাসেনি।

আরেকজন ডাক্তার অধ্যাপক মনসুর খলীল। জীবনের পুরো সময়টা মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও দরিদ্র মানুষের পেছনে দিয়ে গেলেন। সরকারি চাকরি করতেন। মারা যাওয়ার পর ব্যাংকে পাওয়া গিয়েছিল মাত্র দু’হাজার টাকা। এই খবর কোন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেও আমি শুনিনি । তখনো কেউ লজ্জায় ভাসে নি।

কিন্তু তবু আজ বাংলাদেশের ডাক্তারদের কারনে ফেসবুকে পুরো দেশ লজ্জায় ভেসে যাচ্ছে। সাদা চামড়া বা অবাঙালি না হলে আমাদের আবেগটা ঠিক আসে না! 

লেখক: ডা. মু. রিয়াদ ভূঁঞা রাজীব, খুলনা মেডিক্যাল
২০১২-১৩ সেশন এর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত

লেখা-৩ আসল কথা বলি। কাইলাকুড়ী আমার খুব ভালবাসার এবং ভাললাগার জায়গা। এখানে আমি ৪ মাস থেকেছি, খেয়েছি, কাছ থেকে দেখেছি, সব কিছু জানার চেষ্টাও করেছি। সব ইনফরমেশন হয়তো জানি না কিন্তু যা জানি তার ৩০% এসেছে ইত্যাদি অনুষ্ঠানে। এই সেই ইত্যাদি যা দেখে সারাদিন মাথায় ঘুরতো ‘পিউ পিউ অবিরাম চুপিচুপি’। আজ এই ইত্যাদির একটা প্রতিবেদনে থেকে কয়েক হাজার গালাগাল হজম করেছি, নতুন উল্লাসে মানুষের ডাক্তারদের মুন্ডুপাত করতে ইচ্ছাপোষণ করতে দেখেছি, দেখছি। ঘটনা কিছুই না আসলে, ৫/৬ মিনিটের প্রতিবেদনটা আর একটু ইনফরমেটিভ হলেই এমন হতো না। ভুলটা কার আমি জানি না, Sujit Rangsa দাদা, Pijon Nongmin দাদা হয়তো ভাল বলতে পারবেন।

আমি নাদান মানুষ, যেটুকু জানি তা হল BNSB eye hospital, Mymensingh কাইলাকুড়ীর চোখের রোগীদের দেখেন, বিনামূল্যে ছানি অপারেশন করেন, চশমা দিয়ে দৃষ্টি শক্তি উন্নতিতে সাহায্য করেন। প্রতিবেদনে এইটুকু আসতে পারতো। আমাদের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের দুইজন করে ডাক্তার সম্ভবত ২০১৩ সাল থেকে পালাক্রমে কাইলাকুড়ীতে ২৪/৭ সার্ভিস দেন বিনামূল্যে। সেই সূত্রে আমি সেখানে ছিলাম ৪ মাস। যখন এই প্রতিবেদনের শুটিং হচ্ছিল তখনো আমাদের দুইজন ডাক্তার ওখানে আছেন। ছোট বড় যেকোন অপারেশনে গণস্বাস্থ্য দেয় ৭৫% ছাড় (কম বেশি হতে পারে)। যেকোন ধরনের জটিল কেসের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ আছে ছায়ার মতো।

ডায়বেটিস রোগীদের জন্য বারডেম আছে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বারডেমের নামটা অন্তত বলা উচিৎ ছিল এই প্রতিবেদনে। বছরের ৬ মাসের ইনসুলিন বারডেম ফ্রী দেয় কাইলাকুড়ী হাসপাতালের রোগীদের জন্য এবং বাকি ৬ মাস নামমাত্র মূল্যে দেয়া হয়।

এছাড়াও এদেশের আনাচে কানাচে শত শত ডাক্তার কোন না কোনভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রাখছে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ। এইটুকু কথা যদি ইত্যাদিতে বলতো আর না হয় এক মিনিট সময় বেশিই লাগতো! প্রতিটা ডাক্তারের চোদ্দগুষ্টির সবাই অন্তত গালাগাল থেকে বাঁচতো। শ্রদ্ধেয় হানিফ সংকেতের কাছে আরো ইনফরমেটিভ কিছু আশা করে অনুষ্ঠানটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। (গালাগালিগুলো আসলে একটু আধটু গায়ে লাগে। দূর্ভাগ্যবশত আমিও ডাক্তার হয়ে গেছি কিনা তাই!)

ডা. জহির উদ্দীন বাবরের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ