লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তি, পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন তুরস্কের

লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তি, পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন তুরস্কের

ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনকারী দেশ তুরস্ক। হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে তুরস্ক বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত একটি দেশ। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেফ এরদোগান। এই শাসনামলে তুরস্কের রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনীতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিভিন্ন ভূমিকা ও সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমান মুসলিম বিশ্বে একদিকে যেমন তুমুল জনপ্রিয়, অন্যদিকে গোটা পশ্চিমা বিশ্বের নিকট চরম সমালোচিত।

প্রায় ৭০০ বছর ধরে উসমানীয় খেলাফত বা অটোমান শাসনের কেন্দ্রভূমি ছিলো তুরস্ক। ইস্তাম্বুল শহরে বসে ইউরোপ, উত্তর অফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশাল এলাকা শাসন করতেন অটোমান সুলতানগণ। খলিফা হিসেবে অটোমান সুলতানরা সারা মুসলিম বিশ্বে বিপুল সম্মান কুড়িছেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সম্রাজের পরাজয়ের পর ১৯২৪ সালে অনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিসমাপ্তি ঘটে। জন্ম হয় সেকুলারিজম তত্ত্বের বিশ্বাসী আধুনিক তুরস্কের। ফলশ্রুতিতে, রাতারাতি মুসলিম বিশ্বে উপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ হারায় তুরস্ক। আধুনিক তুরস্কের গঠন, অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও তুরস্ককে শতবৎসরের জন্য পরাশক্তি হতে না দেওয়ার জন্য সম্পাদিত হয় ঐতিহাসিক লুজান চুক্তি।

১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে স্বাক্ষরিত হয় ১ম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তকারী লুজান চুক্তি। অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্কের প্রতিনিধি এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, গ্রিস, রোমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া ও ইতালির প্রতিনিধিদের মধ্যে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। লুজান চুক্তি অনুসারে একদিকে যেমন অটোমান সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য হয়ে উঠে, অন্যদিকে সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্কের উপর আরোপ করা হয় বেশকিছু বিধিনিষেধ। শতবর্ষের এ চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ককে আগামী একশো বছরের জন্য তাদের সামনে মাথা তুলে যাতে দাঁড়াতে পারে তা সুনিশ্চিত করা হয়।

চুক্তি অনুসারে, আধুনিক তুরস্কের সীমারেখার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শাসনকৃত এলাকা মিত্রবাহিনী নিজেদের অধীনে নেয়। ফলশ্রুতিতে, বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে আধুনিক তুরস্কের জন্ম হয়।

অন্যদিকে, তুরস্ক ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণ সাগরের সংযোগকারী বসফরাস প্রণালি জাহাজ চলাচলের উপর কোনপ্রকার বাধা প্রদান করতে পারবে না এবং কোন প্রকার শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। বসফরাস প্রণালিকে আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে পরবর্তী একশো বছরের জন্য বসফরাস প্রণালি উপর তুরস্কের কর্তৃত্ব খর্ব করা হয়। বসফরাস প্রণালিকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ধরা হয়।

আরব প্রদেশগুলোর উপর দাবী প্রত্যাহার করতে হবে তুরস্ককে এবং প্রশাসনিকভাবে সেদিকে অগ্রসর হতে পারবে না। পাশাপাশি পবিত্র মক্কা ও মদিনার কর্তৃত্ব খর্ব করা হয় তুরস্কের কাছ থেকে। চুক্তির পরবর্তী একশো বছর তুরস্ক কোনপ্রকার প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদ বাহিরের কোন দেশে অনুসন্ধান ও উত্তোলন করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশ যখন প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে সম্পদশালী, সেখানে তুরস্কের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।

বর্তমানে তুরস্ক আবার যেকোনো মূল্যে ফিরে পেতে চায় তার হারানো গৌরব ও সম্মান। আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে, কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি একশো বছরের বেশি স্থায়ী হয় না। ২০২৩ সালেই ঐতিহাসিক লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তি হওয়ার পর তুরস্কের পরিকল্পনার উপর নির্ভর করছে ইউরোপ ও এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, সামরিক ও অর্থনৈতিক নানা সমীকরণ।

তুরস্কের বিগত কয়েক বছরের সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিঃসন্দেহ দেশটির গুরুত্ব ও প্রভাব গোটা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছে। সোমালিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ, আইএস নির্মূলে ইরাকে সামরিক অভিযান, রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্ব দরবারে সোচ্চার ভূমিকা, লিবিয়ায় বিদ্রোহী সরকারের বিরুদ্ধে সামরিকবাহিনী মোতায়েন করার মাধ্যমে তুরস্ক বিশ্বদরবারে পরাশক্তি হিসেবে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের বর্তমানে সবচেয়ে বড় সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী নেতৃত্ব। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেফ এরদোগানের রাজনৈতিক দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ( একেপি) ২০০২ সাল থেকে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল।

টানা ৪ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০২, ২০০৭, ২০১১,২০১৪) জয়লাভকারী দলটি বর্তমানে তুরস্কের রাজনীতিতে নিজেদের পাকাপোক্ত অবস্থা গড়ে তুলেছে। ২০১৬ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহকে সফলভাবে নির্মূল করার পর বিরোধী শক্তিগুলোকে শক্তভাবে দমন করার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোগান পরিণত হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তিতে।

তুরস্কের রয়েছে পৃথিবীর ১১তম বৃহত্তম সামরিক বাহিনী (গ্লোবাল ফেয়ার পাওয়ার,২০২০ রিপোর্ট) । দেশটি ১৯৫২ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য হয়। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরই আকারে সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। তুরস্ক পৃথিবীর অন্যতম সামরিক অস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারী দেশ। ভবিষ্যতে তুরস্ক তার প্রভাব অন্যদেশের উপর বিস্তার করার জন্য সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। তুরস্ক বর্তমানে অফ্রিকা মহাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বহিঃবিশ্বে তুরস্কের প্রভাবকে আরো বৃদ্ধি করবে।

তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী মিডিয়া ও যোগাযোগব্যবস্থা। তুরস্কের মিডিয়া নের্টওয়ার্ক বর্তমান পৃথিবীতে তুর্কি সংস্কৃতি বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে। তুর্কি সিরিয়াল ও মুভির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। দেশটি তার মিডিয়া নের্টওয়াক ব্যবহার করে গোটা পৃথিবীতে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তুরস্কের মিডিয়া সেক্ষেত্রে অনেকখানি সফল বলা যায়।

মধ্যপ্রাচ্য সহ মুসলিম বিশ্বে প্রভাবশালী দেশ সৌদিআরব ও তার নেতৃত্বের জোট তুরস্কের এ প্রভাব বিস্তার করাকে ভালো চোখে দেখছে না। সৌদি জোটের চিরশত্রু ইরানের সাথে তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের প্রভাবকে বৃদ্ধি করেছে। ফলশ্রুতিতে, সৌদি জোট ইসরাইল ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে নিজেদের সম্পর্ক বৃদ্ধি করছে। লুজান চুক্তির মাধ্যমে কর্তৃত্ব হারানো আরব বিশ্বের উপর আবার নিজেদের আধিপত্য ফিরে পাওয়ার জন্য কৌশলী পথে হাঁটছে তুরস্ক।

তুরস্কের অর্থনৈতিক আকার বেশি বড় নয়। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে জিডিপির আকার হিসেবে তুরস্কের অবস্থান ১৯ তম। লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তির পর তুরস্ক বসফরাস প্রণালি ও ভূমধ্যসাগর ঘিরে বিভিন্ন ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। পাশাপাশি, বসফরাস প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের অর্থনৈতিক পরিসরকে আরো বৃদ্ধি করবে।

সম্প্রতি, গ্রীসের সাথে পাল্লা দিয়ে তুরস্ক ভূমধ্যসাগরে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করেছে। নিজেদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারলে একদিকে তুরস্কের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি যেমন কমবে, অন্যদিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাবে।

তুরস্কের পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাভিলাষের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে দেশটি কুর্দি বিদ্রোহী সংকট, অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির নিন্মহার, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশাল বাণিজ্য ও সামরিক অবস্থান। সেজন্য, তুরস্ককে রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তি দেশগুলোর সাথে নিজেদের কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় করতে হবে তুরস্ককে।

এসকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ থেকে তুরস্কের প্রতি বাধা নিষেধাজ্ঞা আসলেও জাতীয় ঐক্য ও শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশটি সফল হতে পারে। লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তি হইতো জন্ম দিবে নতুন তুরস্কের।

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,
নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেলঃ [email protected]


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ