শহর ছাড়ছে মানুষ: গ্রামীণ অর্থনীতি কি আরও বেগবান হবে?

বিশ্বে স্নায়ু যুদ্ধের অবসান ঘটেছে অনেক আগেই। আর এখন চলছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক যুদ্ধ। বাংলাদেশকেও এ যুদ্ধে বাধ্য হয়ে অংশ নিতে হচ্ছে। আপনি পেশীশক্তিতে দুর্বল কিন্তু অর্থ থাকলে পেশীশক্তিও আপনার হয়ে যাবে। এখন পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন। যার উৎসই অর্থ!

বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে- ঢাকার অনেক মানুষ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের রিপোর্ট বলছে তারা বেড়াতে যাচ্ছেন না বরং স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন গ্রামে। একটি রিপোর্টে একজন বলছিলেন, ‘৫০ বছর ধরে ঢাকায় থাকছি কিন্তু শহরটাকে আপন করে নিতে পারিনি। কয়েকমাসের ভাড়া দিতে পারিনি। দু’মাসের ভাড়া ম্যানেজ করে কোনরকমে বাড়িওয়ালাকে বুঝ দিয়ে আজ চলে যাচ্ছি’।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপ বলছে, করোনার কারণে দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে, অস্থায়ী কিংবা খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের সঙ্গে নিয়োজিত কর্মীরা এই ঝুঁকিতে পড়েছেন। তবে এটি ২০১৬-১৭ শ্রমশক্তি জরিপের উপাত্ত পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে কর্ম হারানোর ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকের সংখ্যা আরো বাড়বে এটা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে টানা দুই মাসের অধিক সকল কলকারখানা বন্ধ থাকায় একটি বিরাট সংখ্যার মানুষের আয়রোজগারে চরম মাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে এটি স্বাভাবিক স্বীকারোক্তি। প্রায় সব কলকারখানা শহর কেন্দ্রীক হওয়ায় পরিবার নিয়ে ভাড়ায় থাকতে হচ্ছে এসব কর্মীদের। এই করোনাকালে ভাড়াবাসা কিংবা মৌলিক খরচ গুলো দুই-তিনমাস চালানোর মতো সঞ্চয় নেই বলেই বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন শহর ছেড়ে।

অনেকেই এই চলে যাওয়াকে বেহিসেবী জীবন, অপরিকল্পিত খরচ কিংবা আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয়ের অভ্যাসকে দায়ী করলেও এই মধ্যবিত্ত/নিম্নবিত্তের পরিবারগুলো স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবেই হউক সংকটে পড়েই বাধ্য হয়ে গ্রামে মাইগ্রেন্ট হচ্ছেন। যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মধ্য আয়ের উন্নয়নশীল এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্প বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পের মধ্যে অন্যতম একটি। কিন্তু করোনা সংকটে এটি অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের। তবে আশার বাণী হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি খাতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করেছে। যা অর্থনীতির এই সংকট মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০% প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। আর শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ মানুষই কৃষি কাজে। গ্রামীণ অর্থনীতির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে, তাই এর উন্নয়নের দিকে কঠোর নজর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

স্মরণকালের মহাদুর্যোগ ও সঙ্কটেও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি কৃষিখাত এগিয়ে চলেছে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। একপ্রকার নীরব বিপ্লব ঘটছে গ্রামে গ্রামে। এই সংকটেও স্বাচ্ছন্দ্য, উদ্দীপনা, উদ্যম ও শক্তি নিয়ে দিনরাত মাঠে পরিশ্রম করে অর্থনীতির চাকা ঘুরাচ্ছেন কৃষকরা।

বর্তমানে বিদেশ থেকে যে রেমিটেন্স আসছে তার সিংহভাগই অর্জন করছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। শহর থেকে আসা মানুষ এবং চাকরি হারানো বিদেশফেরত নাগরিকদেরকে উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করা গেলে তা হবে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন মাত্রা।

শহর ফেরত এই জনগোষ্ঠী যদি গ্রামীণ পরিবেশে দুধ, মাংশ, ডিম ও মৌসুমি সবজি উৎপাদনে কাজে লাগানো যায় তাহলে দেশীয় আমিষসমৃদ্ধ খাবার ও শাকসবজির অনেকটাই চাহিদা মিটানো সম্ভব। পাশাপাশি গত কয়েকবছরে জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য পর্যায় এসেছে। তাই এসব খাতে করোনাকালে উৎসাহ প্রদান করা গেলে অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিলেরও ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এসব ভর্তুকি ও ঋণের স্বচ্ছতা নিশ্চিতসহ সঠিক সময়ে কৃষকদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছাতে পারলে এই করোনা সংকটে গ্রামীণ কৃষকরা বর্তমান এই মন্দাগ্রস্ত অর্থনীতির বড় হাতিয়ার হবে। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ করা গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করে এমন সব প্রণোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হলেই তা হবে সবচেয়ে বেশি জনকল্যাণমুখী।

এই সময়ে অনুৎপাদিত ও অলাভজনক খাতে তুলনামূলক কম বরাদ্দ দিয়ে কৃষি খাতকে চাঙ্গা করার প্রয়োজন। যেমন জাতীয় বাজেটের প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যা এ মুহূর্তে দেশীয় অর্থনীতির জন্য কৃষি থেকে বেশি জরুরি নয়। এই খাতকে কমিয়ে কৃষিতে বরাদ্দ বাড়াতে পারে।

করোনার এই স্বাস্থ্যঝুঁকির সময় ঘরোয়া ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প অনেক বেশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করবে। আবার এই সময়ে কুটির শিল্পের চর্চা করা শুরু করলে পূর্ববর্তী সময়ে ধ্বংসের সম্মুখীন হওয়া কুটির শিল্প আবার পুনরুজ্জীবিত করার বড় সুযোগ তইরি হবে। যা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

আবার গ্রামীণ অর্থনীতির নন-ফার্ম সেক্টকেও মূল্যায়ন করতে হবে। সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত নয় অর্থাৎ রিকশা, ভ্যান, অটো/সিএনজি চালাক কিংবা স্থানীয় বাজারের দোকানীরাও গ্রামীণ অর্থনীতির আয় বৃদ্ধি করেন। পরোক্ষভাবে জড়িত এই কর্মজীবীরাও বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতি বহুলাংশে চাঙ্গা করছে।

কোভিড-১৯ জন্য বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব সমস্যা ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছে। যা আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বেকারত্ব সমস্যার নতুন চাপ। গ্রামীণ বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বেশি প্রয়োজন। তাই করোনার প্রভাবে বেকারত্বের হার হ্রাস করতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনীতিতে নুতন কিছু যোগ হবে।

শহর ফেরত এই দক্ষ জনগোষ্টিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন বিস্ফরণ ঘটবে। কৃষিনির্ভর একটি পরিবারে ৫ জন সদস্যের মধ্যে একজন কর্ম হারালে সেটিকে বেকারত্ব না বলে বিকল্প উপায়ে কর্মজীবীও বলা যাবে। যদি তিনি গ্রামে ফিরে পরিবারের কৃষি কাজে সহযোগিতা করে। চাকরি হারানো সেই ব্যাক্তি পরিবারের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি। তিনি পরিবারের কৃষিতে যোগ দিলে তাদের নির্দিষ্ট জমির উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এতে করে তার আনুপাতিক উপার্জন হয়ে যাবে। এভাবেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বেকারত্ব গুছানো সম্ভব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে শ্রম বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কর্মহীন বেকারত্ব সংকটকে সমস্যা না ভেবে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করে সম্ভবনায় রূপ দিলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো বেগবান করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যা শুধু গ্রামীণ অর্থনীতিকেই নয় বরং দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্যও অনেক সুফল বয়ে আনবে বটে।

লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইলঃ [email protected]


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ