করোনায় ঘরে বসে অবসর সময় যেভাবে কাজে লাগাবেন

  © সংগৃহীত

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণের দরুন মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। পৃথিবীর অনেক দেশে সারি সারি লাশের স্তুপ। সেই তুলনায় আমরা অনেক ভালো আছি। জানি না অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। ইতোমধ্যে সতর্ক পদক্ষেপ  হিসেবে সরকারি বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। সচারাচর এ ধরনের ছুটি আমাদের জীবনে খুব কম আসে।

ঈদ ও ধর্মীয় উৎসব ছাড়া আমাদের জীবনে এমন ছুটি বিরল। করোনা আমাদের এনে  দিয়েছে এমন অবকাশ ও কারো জন্য মরণ। এই  দু:সময়ে আমরা নিজেদের ব্যাপৃত রাখতে পারি  বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে। পরিবারকে সময় দিতে পারি, সেই সঙ্গে একজন মুসলিম হিসেবে ইসলামের বিভিন্ন হুকুম আহকাম পালনে নিজেকে অনেক বেশি ব্যস্ত রাখতে পারি।

যেহেতু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আমাদের এই সুযোগ সেহেতু ছুটির এই সময় করোনা মহামারির হাত থেকে রক্ষা পেতে বেশি বেশি  আল্লাহকে স্মরণ করতে পারি। আল্লাহ পাক বলেন, ‘অতএব, যখন অবসর পান পরিশ্রম করুন এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।’ (সুরা আলাম নাশরাহ, আয়াত ৭-৮)।

এ সময় একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে মানা।  তাই এই সময়টুকু আমরা বিভিন্ন ইতিবাচক কাজে ব্যয় করতে পারি। এ সময়টুকু যেন বৃথা নষ্ট না হয় সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। ফরাসি প্রাবন্ধিক  Hector Berlioz বলেন, ‘Time is a great teacher, but unfortunately it kills all its pupils’।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘দুটো  নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ খুব উদাসীন। তা হলো – স্বাস্থ্য এবং ভালো কাজের জন্য অবসর সময়। ( বুখারী )। হাদীসে এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন কোন বান্দা চারটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত সামনে যেতে পারবে না- সে তার জীবনকালে কোন কাজে ব্যয় করেছে, তার যৌবনকাল কোথায় ক্ষয় করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে আয় করে কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করেছে কি না। উল্লিখিত হাদীসের চার বিষয়ই সময়ের সাথে সম্পর্কিত।’

জীবনের অর্থ খোঁজা অবসর জীবন মানেই মৃত্যুর অপেক্ষা নয়। অবসরের সময়টুকুও অর্থবহ করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। জনকল্যাণ, পরিবারের সদস্য বা কাছের মানুষদের জন্য কিছু করা কিংবা কোনো শখ পূরণে মনোযোগী হওয়া যেতে পারে।

আরবিতে একটি প্রবাদ আছে , ‘সময় সে তো জীবন, সুতরাং তাকে হত্যা করো না ‘ অবসর সময়টুকু কেন কাজে লাগাবেন। হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য তুমি নিজের অবসর সময় তৈরি কর ও ইবাদতে মন দাও; তাহলে আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্যকে দূর করে দেব। আর যদি তা না কর, তবে-তোমার হাতকে ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব কখনোই দূর হবে না।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

বর্তমান ছুটিতে থাকাবস্থায় এই অবসর সময়ে আপনি যা  বেশি বেশি করতে পারেন-

১.বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা

২. নফল ইবাদত করা

৩. কুরআন তেলাওয়াত করা

৪.সুযোগ থাকলে ওয়াজ-নসিহত শোনা

৫. ধর্মীয় গ্রন্থাবলী পাঠ করা

৬ .অতীতের সব পাপের জন্য খাঁটি তওবা করা

৭.পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া ও তাদের সচেতন করা

৮.প্রতিবেশীদের মধ্যে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা

৯.যেহেতু অনেক দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ এসময় কর্মহীন ও অনাহারে থাকে তাদের পাশে সাধ্যানুযায়ী দাঁড়ানো

১০.ব্যস্ততার জন্য আপনি এতোদিন যাদের ঠিকমতো খোঁজ খবর নিতে পারেননি ফোনে তাদের খোঁজ খবর নিন এবং আপনি যেভাবে আপনার সময় ব্যয় করছেন তা তাদের অবগত করতে পারেন

১১. এ সময় কারো বাসায় বেড়াতে যাবেন না এবং কাউকে বাসায় আসতে দাওয়াত করবেন না।সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন

১২. সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া

হযরত মায়মুন বিন মাহরান (রা.) হতে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) বলেন, ‌পাঁচটি বিষয়কে পাঁচ বিষয়ের পূর্বে গণিমত মনে কর ১. বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকালকে, ২. অসুস্থ্যতার পূর্বে সুস্থতাকে, ৩. ব্যস্ততার  পূর্বে অবসর সময়কে, ৪. দারিদ্র্যের পূর্বে সম্পদশালীতাকে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে হায়াতকে। (তিরমিজি, মুসলিম, মুস্তাদরেকে হাকেম, বয়হাকি)।

হাদিসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-ও বর্ণণা করেছেন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেন, ‘তুমি দেরি করতে পারো, কিন্তু সময় করবে না। শেষ করি সুরা আসরের বঙ্গানুবাদ দিয়ে,  কসম যুগের (সময়ের)। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে  সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের। (সুরা আসর, আয়াত ১-৩)।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ