ভারতের মুসলমানদের জন্য পরবর্তী দুঃসংবাদ!

  © টিডিসি ফটো

ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকার এবং তাদের দোসর শিবসেনা আরএসএস রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমার কয়েকটি লেখায় সে বিষয়গুলো আগে তুলে ধরেছি। এবার মোদীর বিজেপি সরকার মুসলমানদের টার্গেট করে আরও কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে আলোকপাত করবো। চরম হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ধারাবাহিকভাবে মুসলিম বিরোধী কার্যকলাপ সুচারুরূপে সম্পন্ন করছে।

মুসলমানদের প্রতিষ্ঠান, রীতিনীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানতে তারা আদা জল খেয়ে লেগেছে ।বিশ্বের প্রায় ৯৬ টি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র রয়েছে। তবে অনেক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রও ধর্মীয় ভাবাদর্শ প্রদর্শন করে। তার উত্তম উদাহরণ ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । ১৯৭৬ সালে ভারতের সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী অনুসারে, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা মূলত পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে আলাদা।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বাবরি মসজিদ নিয়ে আদালতের পক্ষপাতমূলক রায়ের ফলে ভারতীয় আদালত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের রক্ষকের ভূমিকা হারিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম নেই, এবং এটি কেবল ধর্মের ভিত্তিতেই বৈষম্য বা নাগরিকদের পক্ষ সমর্থন করে না। বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার সাইনবোর্ড ধরে রাখতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের আদালতে তিন তালাক নিষিদ্ধের রায় ও সর্বশেষ বাবরি মসজিদ নিয়ে আদালতের আবেগী ও ষড়যন্ত্র মূলক রায়। যেখানে যুক্তির চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে খুশি করতে ফরমায়েশী রায় দেওয়া হয়েছে। এ রায়ের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হলো বাবরি মসজিদের জমি নিয়ে প্রহসনের রায় দেওয়া হলেও ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ১৯৯২ সালে বারবি মসজিদ ভাঙ্গার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কিছুই উল্লেখ করেনি।

অবশ্য এ নিয়ে একটি মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস যে পরিকল্পিত এবং সেখান রাম মন্দিরের যে অস্তিত্ব ছিল না তা হলফ করে বলা যায়।১৫২৮ সালে রাম মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরী হয়েছে বলে কথিত আছে। দীর্ঘদিন হিন্দুরা নিশ্চুপ ছিল এমনকি তারা রাম মন্দির নিয়ে কখনো মুখ খুলেননি ।বাবরি মসজিদের জমির মালিকানার পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ সুপ্রিমকোর্ট স্বীকার করেছে। অযোধ্যায় ১৫২৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

১৯৪৯ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়ের বিষয়টিও বিচারকরা স্বীকার করেছেন। হঠাৎ গত শতাব্দী থেকে হিন্দুত্ববাদী ভাবধারা পুনর্জাগরণে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে এই ইস্যুটি সামনে আনা হয়। এতে বিজেপি ও চরম হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বেশ সুবিধা পেয়েছে।বাবরি মসজিদ ধবংসের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সমাজের বহুভাষী, বহুধর্মী, বহু সংস্কৃতি-সম্পন্ন চরিত্রকে আঘাত করা হয়েছে। এসব বাঁচিয়ে রাখবার একমাত্র উপায় ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা ও প্রসার। এই মুহূর্তে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভারতের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ, এবং তাঁদের মধ্যে ১৪.২% মুসলমান সম্প্রদায়ের। বিভিন্ন পরিসংখ্যান মতে, আগামী কয়েক বছরে এই সংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশিতে গিয়ে দাঁড়াবে। এরমধ্যে মুসলমানদের হার ২০ শতাংশ হবে।

মোদীর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের ভারতে কোণঠাসা করে রাখার সব আয়োজন পুরোদস্তুর চলছে।এরমধ্যে গো রক্ষার নামে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা, নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন। বিজেপি দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার কুৎসিত চেহারা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে। কেননা এবছরের ৫ অগাস্ট এবং ৯ নভেম্বর বিজেপি সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দুটো দিন হলেও এ দুটো দিন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য চরম আঘাতের দিন। মুসলমানদের জন্য দিন দুটো কষ্টের ও বেদনার। মোদীর সরকার ৫ই আগস্ট হঠাৎ একটি আদেশে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে দেয়। এতে কাশ্মীরসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের তিনমাস পর ৯ নভেম্বর ভারতের সুপ্রিমকোর্ট বাবরি মসজিদের ভূমির মালিকানা নিয়ে বিতর্কিত মামলায় হিন্দুদের পক্ষে রায় দেয়। ফলে প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো বাবরি মসজিদ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এ রায়ের ফলে বিজেপির বাবরি মসজিদের জায়গায় একটি রাম মন্দির নির্মাণ নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং আশা পূরণের পথ সুগম হলো।এতে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে সরে চরম হিন্দুত্ববাদের দিকেই এগিয়ে গেল। ভারতে চরম হিন্দুত্ববাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এখন দুটো পক্ষ কাজ করছে।

এক. বিজেপি ও জোটের মিত্রসহ চরম হিন্দুত্ববাদী দলগুলো। দুই. সহযোগী হিসেবে আছে ভারতীয় আদালত। ভারতের আদালত এতদিন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ রক্ষার রক্ষক হলেও আজ এধারা থেকে সরে এসে চরম হিন্দুত্ববাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে ২০১৮ সালে ভারতের মেঘালয়ের হাইকোর্টের এক রায়ের পর। সেখানে এক রায়ে বলা হয়, ধর্মের ভিত্তিতে যেহেতু দেশভাগ হয়েছিল, তাই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা উচিত।কেউ যেন ভারতকে আরেকটি ইসলামিক দেশে পরিণত করার চেষ্টা না করেন, তাহলে সেটা হবে ভারত আর বিশ্বের ধ্বংসের দিন, এমন কথাও লেখা হয়েছে মেঘালয় হাইকোর্টের ঐ রায়ে। এই রায়টি দিয়েছিলেন বিচারপতি সুদীপ রঞ্জন সেন।

বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডার তালিকায় ছিল সংবিধানের ৩৭০ ধারা, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং মুসলিম পারিবারিক আইন রদ করে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু।বিজেপি দুটো লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে, এখন তাদের টার্গেট ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দিওয়ানি আইন।হিন্দুত্ববাদী বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহারে অভিন্ন দিওয়ানি বিধি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছিল।একই দেশে দু'রকম আইন থাকতে পারে না এই যুক্তি দেখিয়েছে তারা৷ এছাড়া অভিন্ন দিওয়ানি বিধি কার্যকর না হলে দেশে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা অসম্ভব বলে তাদের অঅভিমত ৷বিজেপি আগামীতে দুটো প্রধান টার্গেট নিয়ে এগুবে।

প্রথমত: অভিন্ন দিওয়ানি আইন, ভারতের দিওয়ানি আইনে বিয়ে, পরিবার, সম্পত্তির ভাগাভাগি - এরকম কিছু বিষয়ে ধর্মীয় রীতিনীতি এবং বিধি নিষেধকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।বিশেষ করে মুসলমানদের পারিবারিক আইন নিয়ে চরমপন্থী হিন্দু দলগুলোর রয়েছে ঘোরতর আপত্তি। এবছরে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের রায়ে তিন তালাক প্রথা 'অসাংবিধানিক' বলে ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।পাঁচ সদস্যের ওই সাংবিধানিক বেঞ্চের দুই সদস্য আপাতত তিন তালাক প্রথা বন্ধ রেখে নির্দিষ্ট আইন তৈরির জন্য সরকারকে নির্দেশ দিলেও অন্য তিন বিচারক এই প্রথাকে সরাসরি অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। তাঁরা একে অনৈইসলামিক বলেও ঘোষণা করেন।

পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চটিতে পাঁচজন ভিন্ন ধর্মের বিচারক ছিলেন। একজন মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, পার্শি ও হিন্দু ধর্মের বিচারক ছিলেন। তিন তালাক প্রথা নিয়ে ভারতে বিতর্ক বহুদিনের। ভারতের প্রধানমন্ত্রীসহ বিজেপি'র শীর্ষ নেতারা বারবার তিন তালাক প্রথা তুলে দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।তালাক মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত একটি প্রথা। এই মামলা একজন হিন্দু নারীর দায়ের করা একটি মামলা চলাকালীন সময়ে এর সূচনা হয়েছিল। হিন্দু নারী তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ পেতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন।

সেই মামলার শুনানি চলার সময়েই ওই নারীর বিরোধী পক্ষের আইনজীবী মন্তব্য করেছিলেন যে আদালতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কথা হচ্ছে কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় আইনে এমন অনেক কিছু রয়েছে যেসব আইনে মুসলমান নারীদের অধিকার হরণ করে।এরপর তালাক নিয়ে আদালতে মামলা করা হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত কর্তৃক তিন তালাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।ভারতের মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডসহ যারা তিন তালাক প্রথার সমর্থন করেন, তাদের কথায় কোনো আদালতই তালাক প্রথা নিয়ে বিচার করতে পারে না।

নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার যে অধিকার মুসলমানদের রয়েছে, তাতে কোনো আদালতই হস্তক্ষেপ করতে পারে না বলে তাদের মত।কয়েক বছর আগে করা এক জরিপে দেখা যায় যে, দশটি রাজ্যের অধিকাংশ মুসলিম নারীই চান তিন তালাক প্রথা উঠে যাক।অন্যদিকে, ভারতে তিন-তালাকের বৈধতা নিয়ে যখন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলছিল সেসময় সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডিবেটস ইন ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিআরডিডিপি) জরিপে দেখা যায়, ভারতের মুসলিম সমাজে তিন তালাক দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা একেবারেই নামমাত্র, ১ শতাংশেরও কম। ১৬,৮৬০ জন মুসলিম পুরুষ এবং ৩৮১১ জন নারীর ওপর এই সমীক্ষাটি চালানো হয়।

দ্বিতীয়ত: বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন বিল। এবারের লোকসভার শীতকালীন অধিবেশন শুরু হচ্ছে তার কার্য-তালিকায় নাগরিকত্ব সংশোধন বিল রাখা হয়েছে।এই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনে প্রস্তাব করা হয়েছে - বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘু (হিন্দু, বৌদ্ধ, পার্সি বা খ্রিস্টান) যারা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা চাইলে ভারত নাগরিকত্ব পাবেন। কোনো মুসলমানের সেই সুযোগ থাকবে না।

এছাড়া বিভিন্ন নাগরিকপঞ্জি ও আইনের মাধ্যমে মুসলমানদের বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে পুশ ইন করতে চায় ভারত সরকার। যেমন আসামের বাঙালীরা এখন মহাসঙ্কটের মুখোমুখি। এনআরসির মাধ্যমে ১৯ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে অধিকাংশ বাঙালী মুসলমান তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি এনআরসির মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের দেশ ছাড়া করার ঘোষণা দিয়েছে। যাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করছে।

এখন দেখার বিষয় ভারত এসব কিভাবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সম্পাদন করতে পারে। এখন ভারতের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চরম হিন্দুত্ববাদীদের বিচলিত করে তুলছে। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ভারতীয় আদমশুমারিতে দেখা গেছে যে, হিন্দুরা জনসংখ্যার ৭৯.৮ শতাংশ এবং মুসলমানরা ১৪.২ শতাংশ, যা এক পঞ্চমাংশের কম। এই আদমশুমারিতে এটাও দেখা গেছে, দেশটির জনসংখ্যা বিবেচনায় হিন্দুদের জন্মহার ০.৭ শতাংশ কমেছে এবং মুসলমানদের জন্মহার ০.৮ শতাংশ বেড়েছে।আদমশুমারি অনুসারে ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ভারতের দ্রুত বর্ধমান ধর্ম ছিল ‘ইসলাম’। যা বৃদ্ধির হার ছিল ২৪.৬ শতাংশ এবং একই সময়ে হিন্দু ধর্ম বৃদ্ধির হার ছিল ১৫.৮ শতাংশ।ভারতে দ্রুত মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও হিন্দুবাদীরা সদা তৎপর।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


সর্বশেষ সংবাদ