জাবির লৌহমানবীর এ কেমন গণঅভ্যুত্থান?

  © টিডিসি ফটো

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান হ-য-ব-র-ল অবস্থায় চলছে। এসব খবর প্রায়শ পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে ভিসিদের দুর্নীতির খবর যেন নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮তম ও দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এই সময়ে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি নিয়ে বেশ আলোচিত হয়েছেন৷ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে তিনি নাকি কোটি টাকা ঈদ বকশিস দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাদের৷ সেই চাঁদার শেয়ার নিতে গিয়ে ফেঁসে গিয়ে পদ খুঁইয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতা শোভন-রাব্বানী৷

লেখক: মো. আবু রায়হান

ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতির তদন্তের দাবী উঠেছে৷ অভিযোগ তিনি চাঁদা দেয়া ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারির কাজ দিয়েছেন তার স্বামী, ছেলে এবং আত্মীয়- স্বজনদের।এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর নামের প্ল্যাটফর্মে সোচ্চার হন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা ৷ আগস্ট মাসের শেষের দিক থেকে তারা আন্দোলন শুরু করেন৷ দুর্নীতির অভিযোগে জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন চলছে। ভিসির বিরুদ্ধে অপসারণ দাবিতে সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে তাকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা।

এদিকে আজ টানা ১১ দিন প্রশাসনিক ভবন অবরোধ এবং দশম দিনের মতো সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফলে ভিসি কার্যালয়ে যেতে পারছিলেন না। সর্বশেষ আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলায় আট জন শিক্ষকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল এসে আন্দোলনরতদের ওপর হামলা চালায়।

তারা এলোপাতাড়ি মারধর করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়৷ এসময় একাধিক শিক্ষককেও চ্যাংদোলা করে দূরে নিয়ে ফেলতে দেখা যায় তাদের। এ সময় ভিসিপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তারা ধর ধর জবাই কর স্লোগান দিয়ে হামলায় উসকানি দেয়। হামলা চলাকালে ভিসির বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশকে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। পরে দুপুর ১টার দিকে পুলিশ, শাখা ছাত্রলীগ, ভিসিপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের কড়া পাহারায় নিজ গাড়িতে করে বাসভবন থেকে বের হন ভিসি। তাদের কড়া পাহারায় পুরাতন প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয়ে ৭-৮ মিনিট অবস্থান করেন তিনি। পরে সেখান থেকে নতুন প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।

সেখানে তিনি বলেন, “আমার জন্যে এটা অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন। এই কারণে যে... মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে যারপরনাই আমাকে অপদস্থ করা হয়েছে। অসম্মান করা হয়েছে। কিন্তু, কোনো প্রমাণ ছাড়াই। যদি প্রমাণ পায় তাহলে যা বিচার হবে আমি মেনে নিবো।” তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি দেশে একটা জাগরণের সময় এসেছে এবার যে, আমরা সত্য কথা বলার কোনো জায়গা পাবো কী না? তখনই পাবো যখন মানুষ জেগে উঠবে। আজকে সেই মানুষের জেগে উঠা আমরা দেখেছি। আমি কৃতজ্ঞ আমার সহকর্মীদের কাছে, আমি কৃতজ্ঞ আমার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে। আমি কৃতজ্ঞ সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে, বিশেষ করে ছাত্রলীগের কাছে। তারা দায়িত্ব নিয়ে এই কাজটি করেছে।”

আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাবিষয়ক এক প্রশ্নের উত্তরে ভিসি বলেন, “এটি গণঅভ্যুত্থান......। যে ভিসির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ সে ব্যক্তি এখনো স্বপদে বহাল থেকে এ আস্ফালন করার সাহস পান কোথায় থেকে? অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে উভয়েই সমান অপরাধী। তাহলে একই অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা পদ ছাড়া হলেও ফারজানা ইসলাম কেন এখনো ভিসি পদে? তার খুঁটির জোর কোথায়? পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান এক দশক দোর্দণ্ডপ্রতাপে ক্ষমতায় থেকেও তার শেষ রক্ষায় হয়নি। জনগণের প্রতিবাদের বিস্ফোরণে গণঅভ্যুত্থানে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে ছিলেন। সেটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। ৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ গণঅভ্যুত্থানে টিকতে না পেরে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। এসব ছিল গণঅভ্যুত্থানের নমুনা। আজ ভিসি ফারজানা কিছু ভাড়া করা গুণ্ডা পান্ডা দানবদের দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও আহত করে অবরুদ্ধ দশা থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের কি না চমৎকার ভাবে বললেন গণঅভ্যুত্থানে আমি মুক্ত হয়েছি। এজন্য তিনি তার পোষা দানবদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কি নির্লজ্জ বেহায়া! লাজ শরমহীন একজন ভিসি। চোরের মায়ের বড় গলা। বেশরম মায়া মমতাহীন একজন হৃদয়হীনা। এই যদি হয় ভিসির গণঅভ্যুত্থানের নমুনা? তাহলে প্রকৃত গণঅভ্যুত্থানের চেহারায় আবরণ পড়ে যায়। একজন উচ্চ শিক্ষিতা ও ভিসি হিসেবে গণঅভ্যুত্থান কি জিনিস সেটা কি জানেন? না সবই ধান্দা। চেতনার রঙ মাখিয়ে পগারপারের চিন্তা। শেষ রক্ষা হবে বলে মনে হয় না।

আজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তুলে আপনি আপনার পদ থেকে শিগগিরই অপসৃত হবার পথ সুগম করে দিলেন। এখন শুধু প্রতীক্ষার পালা। দাপট দেখিয়ে স্বীয় পদে টিকে থাকাকে গণঅভ্যুত্থান বলে না ওহে কোমলমতি শিশু ।ক্ষমতার মোহে আর কত অন্ধ হবেন? যেদিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দুর্বার আন্দোলনের কাছে টিকতে না পেরে, রাতের অন্ধকারে বাসভবনের পেছনের খিড়কি দিয়ে জীবন হাতে নিয়ে পালাবেন, যেদিন আপনার চারিদিকে চাটুকার মোসাহেবদের আনাগোনা থাকবে না, সেদিন হবে আসল গণঅভ্যুত্থান। আজ যা হয়েছে তা হলো একজন দুর্নীতিবাজ ভিসির পতনের পূর্বে লৌহমানবী হয়ে উঠার সূচনা। পতনের বীজ বপনের অভিষেক। ২০১৪ সালে নিয়োগ পেয়ে জাতিকে উদ্ধার করে ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে দুর্নীতিবাজের তকমা পেয়েও পদত্যাগ না করে আপনার বিরুদ্ধমতের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন ও নির্যাতন করে লৌহ মানবী হবার খেতাবটিও আজ আপনি বাগিয়ে নিলেন।আপনি পারেন বটে!

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ