‘ওই ঘটনার পর আমাদের গেস্টরুম নেয়ার সাহস হয়নি বড়ভাইদের’

তারেক হাসান নির্ঝর  © ফাইল ফটো

২০১৩ সালে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়তাম। থাকতাম আল-বেরুনী হলের কমনরুমে (গণরুম)। হলে ওঠার পর প্রায় রাতেই ৪১ ব্যাচের ভাইয়েরা আমাদের রুমে আসতেন। অভিনব সব উপায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা র‍্যাগ দিতেন আমাদের। আমি খানিকটা ত্যাড়া ছিলাম বলে র‍্যাগ অন্য সবার চেয়ে বেশি খেতাম। এক শীতের রাতে আমাকে সোয়েটার খুলে বাইরে ঠাণ্ডার মধ্যে রড ধরে ঝুলে থাকতে বলছিলেন ৪১ ব্যাচের একাধিক ভাই (নাম মনে আছে)। বাধ্য হয়ে মিনিট দশেক ঝুলেও ছিলাম। পরে একজন গিয়ে নামিয়ে আনেন।

৪১ এর ভাইরা যখন গেস্টরুম নিতেন, এতোটাই অসহ্য লাগতো যে, প্রায়ই আমার মনে হতো, ছেড়ে দেই এই পড়াশোনা, কি হবে পড়াশোনা করে! মানসিক নির্যাতনে পাগল হবার দশা ছিলো। তবে সময়ের সাথে সাথে র‍্যাগের মাত্রা কয়েকমাস পর কমে গিয়েছিলো। গেস্টরুমও তেমন হতো না। এর মধ্যেই ক্যাম্পাসে বহু ছাত্রের সাথে পরিচয় হয় আমার, কোন কোন শিক্ষক আমাকে স্নেহ করাও শুরু করে দিয়েছেন।

আমাদের হলে থাকার বয়স যখন ছয় মাস প্রায়, তখন হঠাৎ একরাতে ডাক পড়লো গেস্টরুমের। গেস্টরুম হবে আল-বেরুনী হলের ৪ তলা ভবনের ছাদে। আমিসহ আমার আরও ৫০ জন ব্যাচমেট গেলাম সেখানে। আমাদের সামনে ছিলেন ৪১ ব্যাচের অন্তত ২০ জন ভাই। সেদিন খুব মন খারাপ ছিলো আমার। আমার আম্মার খুব জ্বর ছিলো। আম্মার সাথে ফোনে কথা বলে ভাইদের গেস্টরুমে গিয়েছিলাম।

প্রথমেই ডাক পড়লো আমার। ৪১ ব্যাচের এক বড়ভাই (নাম বলবো না) আমাকে দেখেই আমার বাবা-মা তুলে ইয়া বড়ো এক গালি দিলেন (অশ্রাব্য, তাই লিখলাম না)। আমিও রাগ সম্বরণ করতে পারিনি একদম। আমার মনে হয়েছিলো, আজই আমার জাহাঙ্গীরনগরে শেষদিন। হয় থাকবো এখানে, নইলে বিদায় বলবো। বড়ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে পাল্টা উত্তর দিলাম, “এই শুয়োরের বাচ্চা, আর একটা গালি দিলে, বুক বরাবর লাত্থি মেয়ে চার তলা থেকে ফেলে দেবো একদম।”

আমার উত্তর শুনে আমার ব্যাচমেটরা এবং সিনিয়ররা সবাই খানিকটা সময়ের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলেন। প্রথমবর্ষের একটা ছেলে প্রতিবাদ করবে, এটা তখন একেবারেই অস্বাভাবিক। বিষয়টা বুঝতে পেরে, সিনিয়ররা আমাদের সবাইকে রুমে ফিরে যেতে বলেন। ওই ঘটনার পর আর কখনো আমাদের ব্যাচের গেস্টরুম নেওয়ার সাহস হয়নি বড়ভাইদের।

(ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ