হায়রে আমড়া, কেবল আঁটি আর চামড়া

বাংলাদেশের আজ সবকিছু যেন নিয়ন্ত্রণহীন। মুখ থুবড়ে পড়ছে সবই। ঈদে বাড়ি ফেরার টেনশন। একটা টিকেটের জন্য নাকাল দশা। চব্বিশ ঘন্টায় বাড়ি ফেরা। কত কি? তারপরও যখন বলে স্বস্তিতে মানুষ বাড়ি ফিরছে। তখন স্বস্তিতে চরম স্বস্তি বোধ করে শরমে মুখ লুকায়। ঈদের দিন কুরবানির পর আরেক কাণ্ড চামড়ার দাম নেই। পানির দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে।

গত ৩১ বছরের ইতিহাসে চামড়ার দাম এত নীচে কখনো নামেনি। কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গরীবের হক যে এভাবে লোপাট করল তা অবশ্য পরিষ্কার। অনেকে ক্ষোভে অভিমানে চামড়া মাটিতে পুঁতে প্রতিবাদ করছে। এটাই তো বাঙালির সহজ প্রতিবাদের ভাষা। কিছুদিন আগে কৃষকেরা ধানের দাম না পেয়ে যেভাবে ধান রাজপথে ঢেলে, ক্ষেতে ধান সমেত গাছ আগুনে পুড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিল। এমন প্রতিবাদ যুগযুগ ধরে চলছে চলবে তবুও শোষকের শোষণ শেষ হবে না। তাদের টনক নড়বে না। টনক নড়বে তখন যখন তাদের জীবন ঘুড়ির নাটাইয়ে টান পড়বে।তাদের খাসলতের বদল কখনো বদল হয় না একটু জিরিয়ে আবার তারা শোষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই ঈদের আগে ঢাকার একটি শপিং মলে গেলাম, ডিসপ্লেতে ওয়ালেট দেখে কৌতূহলবশত হাতে নিয়ে চোখ স্থির হয়ে গেল ওয়ালেটের দাম দেখে। যদিও এর চেয়েও বেশি দামের ওয়ালেট আছে বনানী গুলশান জনপদের বাসিন্দাদের জন্য। আমার মত ছাপোষা মানুষের জন্য এত নামিদামি ব্রান্ডের ওয়ালেট না। গুলিস্তান, মিরপুর গোল চত্বরের ওয়ালেটই আমার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সেরা। গতকাল থেকে মাথায় একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে একটা ওয়ালেটের দাম যদি ১৬০০ টাকা হয় তাহলে একটা আস্ত চার পা বিশিষ্ট গরুর চামড়ার দাম কত হতে পারে? হিসেব মিলাতে পারিনি।

রাজশাহী ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন সেইসময় একটি প্রশ্ন এসেছিল হায়রে আমড়া, কেবল আঁটি আর চামড়া, সেদিন এই প্রবাদ প্রবচনের অর্থ কি হতে পারে জানা ছিল না। আন্দাজে দিয়েছিলাম অন্তঃসারশুন্য বস্তু। পরে যখন মিলিয়ে দেখলাম সঠিক হয়েছিল এতে আনন্দের সীমা ছিল না। না পড়ে, না জেনেও সেদিন কমনসেন্সের জোরে উত্তরটি পেরেছিলাম। কিন্তু এই গরুর চামড়ার দামের এতো অধোগতির হিসেব আমি কিছুতেই মিলাতে পারছি না। ঢাকার একজন নাকি ৩০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে ২০ টাকা দামে চামড়া বিক্রি করেছেন।

কিছু বলার নেই হয়তো পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানবো আন্তর্জাতিক বাজার মন্দা যাচ্ছে সেই ঢেউ বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে চামড়া শিল্প তছনছ করে দিয়েছে। করার কিছু ছিল না। সামনের বছর ঠেকানো হবে ইনশাআল্লাহ।গার্মেন্টস, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া, হিমায়িত মাছ এবং সামুদ্রিক খাদ্য বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানির খাত। দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ চামড়া কোরবানির পশু থেকে প্রতিবছর সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। প্রতিদিনের মাংস সরবরাহের জন্য জবাইকৃত পশুর চামড়া ছাড়াও বিবাহ ও অন্যান্য উৎসবাদি উদযাপন থেকে বাদ বাকি ৪০ ভাগ চামড়া সংগৃহীত হয়ে থাকে।

দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশ তার নিজস্ব বাজার ও রপ্তানির জন্য চামড়া এবং চামড়াজাত সামগ্রী উৎপাদন করে আসছে। কাঁচা চামড়া এবং সেমিপাকা চামড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি সামগ্রী হিসেবে গণ্য। চর্মজাত সামগ্রী যথা জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, হাত মোজা, ব্যাগ, মানি ব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট ইত্যাদি রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে জানিয়েছিলেন। অথচ গত অর্থ বছরে রপ্তানি খাতে পোশাক শিল্পী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও চামড়া শিল্পের অবস্থান ততটা সুখকর নয়।যদিও সরকার ২০১৭ সালে চামড়াকে চামড়াকে ‘বর্ষ পণ্য’ (প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার) ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পুরনো একটা পরিসংখ্যান সম্ভবত বছর দুয়েক আগের হবে বাংলাদেশ ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ কিন্তু মাংস উপাদানে নাকি পঞ্চম। একবার বিসিএসে পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল কুষ্টিয়া গ্রেড কি? বেশ কয়েকটা অপশন ছিল। এদেশে তো জন্তু জানোয়ারের নামে কাউকে ডাকলে সচারাচর ক্ষেপে না। যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, লায়ন ইত্যাদি। কিন্তু কাউকে ছাগল গরু বলে সম্বোধন করলে কিন্তু নিস্তার নেই।

বিসিএসের সেই প্রশ্ন দেখে কুষ্টিয়ার এক বন্ধুকে কুষ্টিয়া গ্রেড বলায় মন খারাপ করেছিল যথেষ্ট মাইন্ড করেছিল। বিশ্ব বাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ হিসেবে পরিচিত। মন খারাপ করাটায় স্বাভাবিক। সবকিছু দিয়ে ইয়ার্কি ফাজলামি চলে না এ আরকি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দুবছর আগের হিসাব মতে, আড়াই কোটির বেশি ছাগল আছে বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে। এর ৯৫ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল। দেশের প্রায় এক কোটি লোক ছাগল পালন করে। এবছর ছাগলের চামড়ার দামও তো নেই। অনেকেকে গরুর সঙ্গে ছাগলের চামড়া ফ্রি দিয়ে দিয়েছেন। চামড়ার দামের এই ধস গরীব মানুষের হক নষ্টের এ প্রতিযোগিতার অভিশাপ বেশ কিছুদিন পোহাতে হবে জাতিকে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। গতকাল চামড়ার দামের এ অবস্থা দেখে কিছু লিখতে মনটা উসখুস করছিল তাই মনের দুঃখে লিখে ফেললাম ছড়া না কবিতা হলো জানি না। এসময় সুকুমার, সতেন্দ্রনাথ দত্তকে খুব প্রয়োজন ছিল।

পেতাম যদি চামড়া ছাড়া গরু
কিসের কসাই চামড়া কেনা গুরু?
সিন্ডিকেটের জট থাকতো না
গরীব দুঃখীর হক থাকতো না
টানা হেঁচড়ার দিন থাকতো না,
সবাই থাকতো খুশি,
সেই খুশিতে গরু খেত খৈল আর ভূষি।

গরুর চামড়ার দাম দিয়ে কি করবেন? গরীবের হক নষ্ট  হয়েছে। ওরা দুবেলা না খেয়ে পুষে নিতে পারবে। কিন্তু জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি তা কি উত্তরণ ঘটবে? হয়তো সস্তার চামড়াগুলো বস্তা বন্দি হয়ে দাদাদের দেশে যাবে। যে দাদা বাবুরা গরুর মাংস ভক্ষণ করেন না। গরু মাতা বলে সম্মান করেন। সেই মায়ের ছালের জুতো পরে দাদারা গয়া কাশী তীর্থ করে বেড়াবেন অবলীলায়। 

আমরা সব সয়ে সর্বংসহা এখন। কোন কিছুই আমাদের আর কাবু করতে পারে না।গন্ডারের চামড়া মোটা বলে দিয়ে তা দিয়ে ঢাল বানানোর রেওয়াজ দুনিয়ার অনেক দেশেই ছিল। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের সৈন্যদের ঢালগুলোও তৈরি করা হতো নাকি গন্ডারের চামড়া দিয়ে। আমাদের নিজেদের চামড়াও হয়ে গেছে গন্ডারের চামড়ার মতো। খুব বেশি পুরু ও শক্ত। কেউ খোঁচা ও চিমটি কাটলেও উফ আ অনুভূতি জাগে না। সব যেন ভোঁতা হয়ে গেছে।

সব অন্যায় অনাচার দেখেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে সব সয়ে যাচ্ছি। প্রতিরোধ প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলছি এই সুযোগে শকুনেরা ভক্ষণ করছে আমাদের মাংস, লোপাট করছে অর্থ। আমরা যেন নির্বিকার নির্লিপ্ত! গন্ডারকে নাকি চিমটি কাটলে এক সপ্তাহ পর ব্যথা অনুভূব করে। আমরা বোধ হয়, জীবনে কখনো কারো কষ্টের, চিমটির ব্যথা অনুভব করবো না। কারণ গরুর চেয়ে আমাদের চামড়া দামি ও গন্ডারের চেয়ে বেশি পুরু। পরিশেষে বলতে ইচ্ছে করছে হায়রে আমরা কেবল আঁটি আর চামড়া।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


মন্তব্য