এখন মুদি দোকানিও জিজ্ঞেস করে— বিসিএস দিয়েছ কিনা?

  © ফাইল ফটো

বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে সরকারি চাকরি। এর মধ্যে এক নম্বর পছন্দের বিসিএস ক্যাডার হওয়া। আর এ ক্যাডার হওয়ার জন্য চলে রীতিমতো পড়াশোনার যুদ্ধ। টেবিল চেয়ারে বসে নির্বিঘ্নে চার পাঁচ বছর কেটে দিতেও রাজি। তবু হতে হবে বিসিএস ক্যাডার। এ যেন মনের মধ্যে প্রচন্ড এক জেদ সামনে এগিয়ে যাবার দৃঢ় প্রত্যেয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে নিজের নাম স্বাক্ষর দিতে না পারা অজ পাড়া গায়ের মানুষটিও বিসিএসের খোঁজ খবর রাখে। গ্রামের মোড়ের মুদি দোকানীও কোন শিক্ষার্থী বাড়ি গেলে জিজ্ঞেস করে বিসিএস দিয়েছে কি না? আজকাল বিসিএসটা এমন হয়ে গেছে বিসিএসের চেয়ে ভালো ও বড় কোনো চাকরি বা পেশা বোধহয় এদেশে নেই।

তাদের কাছে মাশরাফি সাকিব গেলেও জিজ্ঞেস করবে তারা বিসিএস দিয়েছে কি না। একজন তরুণ যদি মাইক্রোসফট, গুগল কিংবা আমাজান আলীবাবা ডটকমের সিইও হয় তাতেও কিছু মানুষ স্বভাবসুলভ গভীর কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করবে সে বিসিএস দিয়েছে কি না। নাসায় কর্মরত থাকলেও জিজ্ঞেস করবে সে কি বিসিএস দিয়েছে? বাংলাদেশে চারিদিকে তরুণদের মধ্যে যেন বিসিএস বাতিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিসিএস ছাড়া তারা অন্য কিছুর কল্পনা ও আল্পনা আঁকতে পারেনা।

এ তরুণ-তরুণীরা সরকারি চাকরির শুধু উপরের মোড়ক দেখেই এত ক্রেজি। এর ভেতরের রয়েছে অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন ভাঙার আর্তনাদ। সেকি সেই আর্তনাদ শুনতে পায়? দেখতে পায় কি অসংখ্য তরুণেরর স্বপ্ন ভঙ্গের নীরব কান্না। তরুণরা কি জানে স্বাধীনতার পর কতজন এ পর্যন্ত বিসিএস ক্যাডার হয়েছে। এ সংখ্যা খুবই নগণ্য।

তরুণরা তো দেখছে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষিত বেকার বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এরমধ্যে মাত্র কয়েক শতাংশ শিক্ষিত বেকার বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে। অনেকে তিন-চার, পাঁচ বছর বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ধরা না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। অথবা শেষ পর্যন্ত বেসরকারী সরকারি কোনো ছোটখাটো চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

প্রতিবছর বিসিএস পরীক্ষায় প্রার্থী বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মহলে জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে তরুণরা কেন বিসিএস মুখী হচ্ছে। এর যৌক্তিক কিছু কারণও খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন নীতিমালা, নতুন নতুন পে-স্কেল আসার কারণে আবেদনকারীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হচ্ছে, ফলে বিসিএসে আগ্রহ বাড়ছে তরুণ চাকরি প্রার্থীদের।

এছাড়াও কিছু কারণ উঠে এসেছে। যেমন, সামাজিক মর্যাদা, বর্তমান সরকারের আমলে বড় রকমের ঝুটঝামেলা ছাড়া স্বচছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, মেধার মূলায়ন, বেতন বেসরকারি চাকরির প্রায় সমান, সরকারি চাকরিতে নিরাপত্তা, পারিবারিক চাপের কারণে, ক্ষমতার জন্য, বিয়ের বাজারে বিসিএস চাকরিজীবীর কদর বেশি, সরকারি জব হতে অবসরের পর পেনশন ও গ্রাইচুটি সুবিধা, তরুণদের পড়াশোনা শেষ করে উদোক্তা হবার মত পুঁজির অভাব এ ব্যাপারে পরিবারের সাপোর্ট না থাকাসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষিত তরুণরা সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

আজকাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ঝাঁক তরুণ মেধাবী একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিসিএস ও সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরীক্ষার দু’চারদিন আগে বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে আনা গাইড, পুরোনো হ্যান্ডনোট ফটোকপি করে কোনভাবে তারা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একটা রেজাল্ট করছে।

এদেশে সরকারি চাকরি পেতে খুব ভালো রেজাল্ট প্রয়োজন হয় না। সেজন্য একাডেমিক পড়াশোনা পাশে সরিয়ে রেখে কিছু তরুণ পুরোদস্তুর বিসিএসের পেছনে নিজেদের সঁপিয়ে দিচ্ছে। অনেক তরুণ দেখাদেখি গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। নিজের সক্ষমতা ও বিসিএস এর মতো কঠিন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঠিকমতো বেসিক জ্ঞান আছে কি না সেদিকে যেন তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।

অনার্স মাস্টার্স পাস করার পর বিসিএস ধ্যান জ্ঞান হওয়ায় অনেকেই স্বপ্নের বিসিএস নাগালে পাচ্ছে না। পদ সংখ্যা সীমিত, বিপুল প্রার্থীর কারণে অনেকের বিসিএস হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে একজন তরুণের মাসটার্স পাশের পর চার পাঁচ বছরের বিসিএসের পেছনে ছুটতে গিয়ে হারিয়ে ফেলতে হয় জীবনের মূলবান কিছু সময়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন ছুঁতে না পারার কষ্ট কিছু তরুণ হতাশায় কিংবা বিষন্নতায় নিমগ্ন হয়ে অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। অনেক তরুণ বিসিএসের মত কঠিন যুদ্ধে টিকতে না পারে ক্লান্ত হয়ে এদেশে ক্যারিয়ার না গড়ে বিদেশ মুখী হতে চায়।

এদিকে বিসিএস নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আরো ভয়াবহ। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন সহ সব ন্যায্য আন্দোলনের সূতিকাগার আজ জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা পরিহার করে অধিকাংশ শিক্ষার্থী উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের নামে বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে অধিকাংশ ছেলে মেয়ে হলে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, পাবলিক লাইবেরী, আডডায় তাদের এখন ধ্যান জ্ঞান হবু বিসিএস ক্যাডার।

ঢাবিতে ভর্তি হয়ে প্রথম বর্ষেই ছেলে মেয়েটি এখন সিনিয়রদের সাথে পাল্লা দিয়ে কাক ডাকা ভোরে কেন্দ্রীয় লাইবেরীর সামনে একটা সিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। বর্তমানে এখানে প্রায় তিন লাখ ১৮ হাজার ৭৪টি বই, ৪১ হাজার ৪৮৩টি সাময়িকী ও জার্নাল রয়েছে। বইয়ের পাশাপাশি ১৪-১৫ শতকের দুষ্প্রাপ্য পান্ডুলিপি আছে এ লাইব্রেরিতে।

দুঃখের বিষয় বিভিন্ন বই জার্নাল পেপারে ধুলির আস্তরণ পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এসব বই পড়ার পাঠক আজ অবশিষ্ট নেই। সবাই ব্যস্ত চাকরির পড়াশোনা নিয়ে।এখন গবেষণা ধর্মী পড়াশোনা ও একাডেমিক পড়াশোনা নেই বললেই চলে। যে কারণে ঢাবি আজ বিশ্বের সুনামধন্য ভার্সিটির তালিকায় ঠাঁই পায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক লেখাপড়া, গবেষণা ও বাড়তি জ্ঞান আহরণের স্থান। এখন তা ক্রমেই হয়ে উঠেছে বিসিএস তথা সরকারি চাকরির নির্বিঘ্ন পড়াশোনার স্থান হিসেবে। এখন লাইব্রেরিতে কোনো চেয়ার খালি থাকে না, বিশেষ করে কোনো সরকারি চাকরির আগে। ভোর থেকে এসে লাইনে দাঁড়ায় সবাই, চাকরির জন্য মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হয় বলে।

পরিতাপের বিষয় বিভাগের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া ছেলেটি যদি বিসিএস না দেয় কিংবা কোন কারণে উত্তীর্ণ হতে না পারে তাকেও উপহাস করা হয়। একাডেমিক অর্জনের স্বীকৃতি কিংবা প্রশংসাও জোটে না তার কপালে। সমাজ তথা রাষ্ট্রের কিছু শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিতের কাছে বিসিএসই যেন সব সফলতার মূলমন্ত্র।

যেভাবে প্রতিনিয়ত তরুণদের বিসিএস নিয়ে যেভাবে উজ্জীবিত করা হচ্ছে তা এদেশের জন্য অশনিসংকেত। প্রথমে চিন্তা করুন আপনি বিসিএস দেবেন আপনার কি সেই পরিমাণ বেসিক নলের আছে? আচ্ছা না থাকলো, অল্প সময়ে কি তা রপ্ত করতে পারবেন? আপনি পড়াশোনা শেষ করে চার পাঁচ বছর পড়াশোনা করে ক্যাডার হবেনই এমন নিশ্চয়তা কি দিতে পারেন।

পরিবারের ওপর চাপ পড়বে না তো? আপনি কি যথেষ্ট উদদোমী পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল। আপনি পড়াশোনা করে এদেশে সরকারি জব পাবেন এর কোনো নিশ্চয়তা আছে? বিসিএসে একইসঙ্গে ভাগ্য ও পরিশ্রম প্রয়োজন। এসব দিক বিবেচনা না করে হুজুগে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আপনি ভুল করবেন।

মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, আপনার কতদূর পর্যন্ত? আপনার দৌড় কত দূর তা দেখে নিন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কয় হাজার বিসিএস ক্যাডার হয়েছে? কতজন পরীক্ষা দিয়েছিল? কতজন নিয়োগ পেয়েছেন? সেই পরিসংখ্যানটা জেনে নিয়েও এগুতে বা পিছুটান দিতে পারেন।

মনে রাখবেন সবাই বিসিএস ক্যাডার হবে না। আপনার ভাগ্য ও পরিশ্রম আপনাকে একটি জায়গায় উপনীত করবে। সেখানেই আপনি পৌঁছবেন। কোনো বিসিএস মোটিভেশনাল বক্তার মুখরোচক কথায় প্রভাবিত হবেন না। আপনি যথেষ্ট সুবিবেচক ও পরিপক্ক। আপনার সিদ্ধান্ত যদি আপনি না নিতে পারেন, অন্যের দ্বারা এ বয়সে প্রভাবিত হন তাহলে বিসিএস আপনার জন্য নয়।

নিজে আত্মসমালোচনা করে দেখুন, আপনি এসবের জন্য কতটুক প্রস্তুত। কোচিংয়ের কোন ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় নয়। নিজেকে জিজ্ঞেস করেন, এই বন্ধুর পথ আপনি পাড়ি দিতে পারবেন কি না। তিন বছরের প্রস্তুতি পরীক্ষা নিয়োগ সব মিলে আরো দুই বছর ততদিনে আপনার প্রিয়জন অপেক্ষা করবে তো?

আমি নিরুৎসাহিত করছি না, শুধুমাত্র জীবনের হিসাবের সঠিক ফর্মুলা ফরম্যাট বলে দিলাম। শেষে কানে কানে বলি, এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে যখন প্রাপ্তির খাতায় শূন্য। তখন কেমন উপলব্ধি হবে? হতাশা বিষন্নতা নিজেকে গিলে ফেলবে। তখন মনে হবে বিসিএসটা কারো কারো কাছে আসলেই মরীচিকা। আলেয়ার আলো আঁধারি খেলা। কারো কাছে সোনার হরিণ। শেষ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েকটি পংক্তি দিয়ে -

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


সর্বশেষ সংবাদ