রমাদান : অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাম্যের বিশ্লেষণ

আধ্যাত্মিকতা চর্চা ও তাকওয়ার অনন্য উদাহরণ হিসেবে রমাদানের পথচলা বহু প্রাচীন। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে; "হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী হতে পার।" (বাকারাহ্:১৮৩)

রমাদানে রহমত ও শুদ্ধাচারের সাথে সাথে অর্থনৈতিক বরকতও রয়েছে। রমাদান ও রমাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সম্যক অবগত আছি। তাই অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি। অর্থনৈতিক গুরুত্বের আলোচনায় দুইটি প্রচলিত মতবাদে দুইটি বিষয়কে প্যারামিটার হিসেবে উল্লেখ করে আলোচনা করেছে।

যেমনঃ ১. পুঁজিবাদী মতবাদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিকে প্রধান করে তার চিন্তা ও পরিকল্পনা সাঁজিয়েছে। ২. অন্যদিকে সমাজতন্ত্রীরা অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলে। যদিও তাদের প্রায়োগিক বাস্তব উদাহরণ নেই, নেই তাদের চলার আলো।

অর্থনীতি গতিপ্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে উপরিউক্ত দুইটি মতবাদ দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি কিংবা স্নায়ুবিক যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। আমি দেখানোর চেষ্টা করব, রমাদানে ইসলামী অর্থনীতি একই সাথে উন্নয়ন ও সাম্যের মধ্যে সমন্বয় করেই সুষম অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের অনন্য নজির স্থাপন করছে। রমাদান আসলেই মুসলিম মিল্লাতের ঘরে ঘরে অন্যান্য মাসে প্রায় অপ্রচলিত কিছু কিছু দ্রব্য যেমন: ছোলা, মুড়ি, দই-চিড়া, খেজুর, শরবতসহ অন্যান্য ফলের ব্যাপক চাহিদা ও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সাথে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় ভাত-মাছ-মাংস সহ অন্যান্য দ্রব্যও ব্যাপকহারে বেচা-কেনা হয়।

একটি প্রতিবেদন দেখলে রমাদানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা হবে। প্রতিবেদনে বলা আছে বাংলাদেশ এবারের রমাদান মাস উপলক্ষে ছোলা, মটর ও মসুর ডাল, সয়াবিন ও পাম তেল, চিনি ও খেজুরে ১১২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করছে, যা সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার সমান।

এসব পণ্য এসেছে বিশ্বের ২৮ টি দেশ থেকে। আলোচ্য সময়ে ছোলা আমদানি ৯ কোটি ১২ লাখ ডলারের, যা ৭৮০ কোটি টাকার সমান। নথিপত্রে এ বছর চার মাসে ১১ টি দেশ খেজুরের ব্যবসা করেছে ২ কোটি ডলার বা ১৮৩ কোটি টাকা। (তথ্যসূত্র : প্রথম আলো ১৪ মে ২০১৯)

অর্থনৈতিক উন্নয়নের হালকা ধারণা নিয়ে এবার একটু ভিন্ন দিকে নজর দিই। রমাদানের শেষে খুশীর ঈদে জামা-কাপড়সহ মানুষের ব্যবহৃত পোশাকের কেনাবেচা চলে হরদম। হাটে-বাজারে বিক্রেতাদের ব্যস্ততাই বলে রমাদান ও ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। শুধু পোশাক নয়, সেমাই-নুডুলস সহ অন্যান্য পণ্যের ব্যাপক ও বিস্তৃত চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। আরও মনে রাখতে হবে রমাদানে ইফতার করানো এবং বিভিন্ন দ্রব্য সাদকা হিসেবে আদান-প্রদান করায় স্বাভাবিকভাবে রমাদানকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকে।

রমাদানে অর্থনৈতিক সাম্যের আলোচনার পূর্বে একটি ঘটনার কথা বলি। প্রথম রমাদানের রাতে এক ভাইয়ের সাথে চা খেতে খেতে আড্ডা হচ্ছিল। ভাই বলছিলেন, রমাদানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভ্রাম্যমাণ খুচরা ব্যবসায়ীরা, যারা অন্যান্য "ফুড স্ট্রীট" নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। তখন কথা শুনে মনে হল রমাদানের অর্থনীতিতে সাম্যের অভাব রয়েছে। এতদসংক্রান্ত লিখতে গিয়ে মনে হল আদপে উক্ত মনে হওয়াটি সঠিক নয়।

আসুন চিন্তাগুলো আলোকপাত করি। রমাদানে "স্ট্রীট ফুড" বিক্রি প্রায় বন্ধ থাকলেও, রাতে সালাতুত তারাবীহ পড়তে মসজিদে যাওয়ার ফলে স্ট্রীট ফুডের চাহিদা থাকেই। বিক্রি কম কিংবা বন্ধ থাকলেও রমাদানের শিক্ষা হচ্ছে দান-সাদাকার। তাই অসচ্ছল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ধনীদের সম্পদ থেকে তাদের প্রাপ্য হক পায়, যাতে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠে।

যাকাত বছরের যেকোন সময় দেওয়া যায়। কিন্তু, অধিক সওয়াবের আশায় মুসলমানরা সাধারণত রমাদানেই যাকাত প্রদান করে। আর যাকাতই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সাম্যতা ফিরিয়ে আনার অন্যতম পথ ও পন্থা। সাদাকাতুল ফিতরের মাধ্যমেও অর্থনৈতিক সাম্যতার পথ পাওয়া যায়। বিদেশে বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্যে রমাদানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্যের মূল্যছাড় লক্ষ্য করা যায়। আর বলা চলে মূল্যছাড়ের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। রমাদানই শিক্ষা দেয় দ্রব্যমূল্যের দাম সহনশীল রাখতে। রমাদানের আধ্যাত্মিক শিক্ষাই উদ্ভাসিত হয়ে ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে ধনীদের ইফতার করার নির্দেশের মাধ্যমে সাম্যভাব প্রতিষ্ঠার তাগিদ নিহিত। এ সকল চিন্তাই বলে, রমাদান অসাম্য অর্থনীতির কথা বলে না।

আমরা দেখতে পেলাম ব্যাপক চাহিদা-যোগান ও সহযোগিতা-সহমর্মিতার মাধ্যমে রমাদান মধ্যবর্তী কল্যাণকামী অর্থনৈতিক পথে সন্ধান দেয়। রমাদানের অর্থনীতির বিশ্লেষণ করলে আমরা বিভক্ত দুই মেরুর অর্থব্যবস্থার মাঝামাঝি একটা যৌক্তিক পথ খুঁজে পাবো। পরিশেষে স্মরণ রাখা দরকার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রমাদানের গুরুত্বের আলোচনা পাওয়া যায় না বরং, রমাদানের আধ্যাত্মিক শিক্ষার অধ্যয়নে অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও মধ্যবর্তী কল্যাণকামী অর্থনীতির সন্ধান পাওয়া যায়।

লেখক, শিক্ষার্থী ১০ম ব্যাচ, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য