প্রতিনিয়ত কেন এতো ধর্ষণ?

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ উন্নয়নে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সাথে দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মানও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দেশ যতই উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে অপরাধও তার দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে দিন দিন ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অফিস, রাস্তা-ঘাট, বাস কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। সুযোগ পেলেই বিকারগ্রস্ত পুরুষদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে নারী। ধর্ষণের শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কিশোর বয়সের মেয়েরা। এরপরেই রয়েছে অল্পবয়সী মেয়ে শিশুরা যাদের প্রতিরোধের শক্তি-সাহস কোনটাই নেই।

প্রতিদিন কত মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। যারা সামনে এসে বিচার চায় আর যারা হত্যার শিকার হন তাদের খবরই আমরা শুধু জানতে পারি। লোকচক্ষুর অন্তরালে এমন হাজারো ঘটনা হয়তো আমারা জানতে পারিনা। বিগত কয়েক বছর যাবত ধর্ষণ হত্যা এসব এখন দেশে প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ হত্যার পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। গত কয়েক বছরে সারা দেশে ধর্ষণ সংখ্যা অকল্পনীয়।

বিগত পাঁচ বছরের ধর্ষণের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ৭০৭টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৩৮৭টি, গণধর্ষণ ২০৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১৩ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৮১টি। ২০১৫ সালে মোট ধর্ষণ ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৮৪টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৯৪টি।

২০১৬ সালে মোট ধর্ষণ ৭২৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪৪টি, গণধর্ষণ ১৯৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৩৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৮ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৬৫টি। ২০১৭ সালে মোট ধর্ষণ ৮১৮টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫৯০টি, গণধর্ষণ ২০৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৪৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১১ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৪টি। ২০১৮ সালে মোট ধর্ষণ ৭৩২টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫০২টি, গণধর্ষণ ২০৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৩, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৭ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৩টি।

আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মোট ধর্ষণ ৩৫৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ২৫৬টি, গণধর্ষণ ৯৪, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ১৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৬ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৫৫টি।(সূত্র দৈনিক ইত্তেফাক)।পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় ধর্ষণ কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমাদের দেশে ধর্ষণের স্বচ্ছ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থাকলেও ধর্ষকরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও বিশ্বায়নের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের দরুন ইন্টারনেট, ফেসবুক, যৌন উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও, টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে যৌন উত্তেজনাপূর্ণ ছবি দেখে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। অধিকাংশ ধর্ষক কোন না কোন ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের দৌরাত্ম অনেক। রাজনীতির প্রভাব এবং যথাযথ শাস্তি না পাওয়ার কারণে অন্যরাও অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে যেতে অনেকটাই উৎসাহ বোধ করছে। ভয়ের কারণেও অনেকে মামলা করতে পারছেন না ৷ ক্ষমতা আর বিত্তের কাছে বিচার প্রার্থীরা অসহায় হয়ে পড়ছেন ৷ আর যারা অপরাধী, তারাও জানে যে তাদের কিছু হবেনা ৷ তাই তারাও নিবৃত্ত হয় না৷''

ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে এমন খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক মর্যাদার ক্ষুণ্ণ হবার ভয়ে অনেককে মুখ খুলতে দেখা যায় না। এছাড়া ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির কারণে অনেকে কোন অভিযোগই দাখিল করে না। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এসব ধর্ষণের পিছনে অনেকটাই দায়ী। দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজ স্বার্থ রক্ষায় অপরাধীদের পক্ষ অবলম্বন করে বিচার প্রার্থীদেরকে হয়রানি করে থাকে।

প্রতিনিয়ত এসব ধর্ষণের কারণ হতে পারে যথাযথ ভাবে আইনের প্রয়োগ না হওয়া। তাছাড়া সামাজিকভাবেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না ৷ আর মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত অনেক মামলারই বিচার হয় না ৷ কারণ শেষ পর্যন্ত নানা উপায়ে ভিকটিমকে বিরত রাখা হয়৷ সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে দেয়া হয় না ৷

একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৪টি। এসময় মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি। সাজা হয়েছিল ১১০টি মামলায়। অর্থাৎ বিচার হয়েছিল ৩ শতাংশের কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনের ফাঁক-ফোকর এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে সঠিক বিচার পান না ভুক্তভোগীরা। ধর্ষণ মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। পুলিশি তদন্তে ত্রুটি এবং অবহেলা ছাড়াও এর পেছনে কাজ করছে নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।

ধর্ষণের এমন লাগামহীন চিত্র দেখে বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাসহ শিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

ধর্ষণের জন্য ধর্ষক ই দায়ী। সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি বিশেষ করে নারী সচেতনতা। যথাযথ আইন প্রনয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সবার আগে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। আমাদের দেশে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় সাধন করতে হবে তাহলে অপরাধ কর্মে তাদের বিবেক বাধা দিবে। ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে কারণ ধর্ম ভাবনা তথা নৈতিক চেতনা মানুষের আচরণ সংশোধনে যতো সহজে ফলপ্রসূ হতে পারে তা অন্য কোনো উপাদানে লক্ষ্য করা যায়নি। এছাড়াও উপদেশ ও পরামর্শমূলক সেমিনারের আয়োজন করলে ফলপ্রসূ হতে পারে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
ইমেইল: [email protected]

 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ