কাল্পনিক মেহেরুন

আমি তাঁর জন্য রোজকারের মত আজও প্রায় ২৯ টি গোলাপ আর নিজের হাতে গাঁথা তাজা বেলি ফুলের মালা নিয়ে সকালে তার বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম।

রোজ যেমন করে দিনের বৃহৎ সময়টুকু তাকে ভেবেই কেটে যায়। মাঝেমধ্যে রিকশার ঝাঁক চলে যাচ্ছে আমাকে পাশে রেখে। কোনটিতে বাচ্ছাদের মায়েরা স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের। স্যুট কোট পরা কাঁধে বই ভর্তি ব্যাগ সমেত। কোনটিতে ব্যাস্ত শহরের কর্মচারীরা হাক ডেকে রিকশাওয়ালাকে জোরে চালাও বলে গালি দিতে দিতে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কোনটিতে প্রেমিক যুগল হাত ধরাধরি করে কম গতির রিকশায় খুনসুটি করছে। এদের কারো রুপকন্যারা সদ্য স্নান সেরে আংশিক ভেজা চুলে বেলি ফুলের মালা গেঁথেছে। আবার কারো পরনে আধুনিক পোশাকে নিজেদের সজ্জিত করা।

তবে আমার মনে হতে থাকল শহরে আজকাল বেলি ফুলের বিক্রি বেড়েছে। বাড়বেই না কেন কড়া সুগন্ধি মাখা তোড়াটি যখন রুপবতিদের খোঁপায় গুজে নেয়া হয় তখন সৌন্দর্যের রঙছটা যেমন উপছে পড়ে তেমনি সুঘ্রাণে প্রেমিক মুগ্ধতায় ভাসে। প্রেমিকরা নিশ্চয়ই এটিকে সানন্দে মুঠোভর্তি করে নিবে।

একবার মেহেরুনকে সাথে নিয়ে আমি বের হয়েছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সারাদিন ঘুরে বিকেল হলে বাড়ি ফেরা। আমি বড্ড আবেগী ছিলাম তখন। একই রকম তার বাড়ির গেটে দাঁড়িয়েছিলাম। তার জন্য যত্ন করে আনা বেলি ফুলের মালাটি পকেটে নিয়ে। সাড়ে নটার দিকে মেহেরুন বের হয়ে এল। পরনে হালকা গোলাপি সিল্কের সাড়ি পরিহিত মেহেরুনকে সেদিন অন্য যেকোন দিনের চেয়ে বেশি মায়াবতী দেখিয়েছিল।

আমার খালি হাত দেখে মেহেরুন রেগে জিজ্ঞাস করে তার ফুল কই। আমি চুপ থেকে বুঝাতে চাই যে ভুলে গেছি। ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বলে আমি যাচ্ছি না তুমি যাও। কিন্তু আমি তাকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য বলতে চাই নি। পরে অনেক অনুরোধ করে তাকে রাজি করাই যে আট নাম্বার রোডের ডি ব্লকের ফুটপাতের দোকান থেকে এখনি আগে তার মালা কিনব তারপর অন্য কথা।

রিকশা নিয়ে উঠে পড়লাম। কিন্তু ততক্ষনে আমাকে মুখে যা আসছে তাই দিয়ে বকা শুনিয়ে যাচ্ছিল সে। আমি চুপ করে সব হজম করে যাচ্ছিলাম৷ কারন কথা ছিল যখন সে রেগে যাবে তার রাগ না থামা পর্যন্ত আমাকে কথা শোনাবে। আমার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে না হয় দু'চারটা কিল ঘুষি দিবে। কথা থাকত নিজের রাগ না ঝাড়া পর্যন্ত আমার কথা বলা বারণ থাকবে। ব্যাতিক্রম হলে তার রাগ বেড়ে যাবে।

কিছুদূর যেতে হুট করে যখন পকেটে থাকা বেলি ফুলের মালাটি বের করে তার সামনে মেলে ধরলাম। মেহেরুন আনন্দে চিৎকার দিয়ে আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছিল।

ততক্ষণে তার শাড়ির আঁচলটা বের হয়ে রিকশার বাম চাকার সাথে পেচিয়ে যায়। আমাকে ধরা অবস্থায় আচমকা টান খেয়ে চলন্ত রিক্সা থেকে মেহেরুন নিচে পড়ে যায়।

পেছনে মতিঝিলের ৬ নম্বর বাসটা ছিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘটনাটা ঘটে। পেছনে ফিরে মেহেরুনকে আর দেখতে পাই নি। চলন্ত রিক্সা থেকে একলাফে নেমে রাস্তার অপর পাশ দিয়ে যখন পেছনে যাই ততক্ষণে রাস্তার পাশে থাকা মানুষরা আমার আগে দৌড়ে পিস্টে থাকা লাশের কাছে দৌড়ে যায়।

গিয়ে দেখি পিচঢালা কালো রাস্তাটি তাজা রক্তে ভিজে গেছে। নিজেকে কেমন জানি পাগল মনে হয় তখন থেকে। মনে হয়েছিল পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকাটা কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে। নিজেকে ক্ষমা করতে পেরেছি কিনা জানা নেই।
তারপরে আর কোনদিন হাসতে পারি নি। মেহেরুনকে হারানোর পর অনেকদিন বিভিন্ন গলিতে ঘুরে বেড়াই যেখানে আমাদের নিত্য যাওয়া আসা ছিল। সময় বেছে বেছে স্থানগুলোতে একা বসে থাকতাম। সম্ভব হলে যেখানে যেখানে আমাদের বসা হত সেখানে বসে থাকতাম।

তারপর ডি ব্লকের ফুটপাতে নিজের একটা ফুল দোকান দেই। প্রতি জন্মদিন আসলে মেহেরুনের বয়স গুনে গোলাপ আর নিজ হাতে গাঁথা বেলি ফুলের মালা নিয়ে মেহেরুনের বাড়ির গেটে দাড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষন তার বাসার দিকে থাকি। সম্ভব হলে সারাদিন ওভাবে দাড়িয়ে থাকি। আজও দাড়িয়ে রইলাম।

লেখক: শিক্ষার্থী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ