আমি মা হতে চলেছি

‘আমি মা হতে চলেছি’ পাড়ার অমল ডাক্তারের এমন মন্তব্যে বাবা স্থির হয়ে রইলেন আর মায়ের মরা কান্না। শুধু মুচকি মুচকি হাসছিলেন পাশের বাড়ির চাচি। ছেলে কি মেয়ে হবে তা জানার ইচ্ছে কারও হলো না,পাছে অসতীর খবর নগর পের য়ে শহরে পৌছায়। সেই ভয়ে আর দ্বিতীয় বার ঝুঁকি নেননি বাবা। আমার পেটের খবর জানবার, আমার মনের কথা শোনবার।

বইয়ে মুখ গুজে থাকা বাড়ন্ত যৌবনের চপলা মেয়েটির অনেক কিছুই জানা হয়ে উঠেনি নারীত্বের, বুঝা হয়ে উঠেনি সতীত্বের। শুদ্ধ, কী করে হলো অশুদ্ধ? মমতাময়ী মায়ের স্নেহের দৃষ্টি মুহুর্তে অগ্নিমূর্তিতে হাজারও প্রশ্নে ক্রুদ্ধ। যে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেলো আঠারো বছরের সতীত্ব, পড়াশোনায় নাম ডাক ফেলা গ্রামে আলো ছড়ানো সকল কৃতিত্ব।

যখন বাড়ি ফিরলাম ততক্ষণে চাচির মুচকি হাসিতে এ বাড়ি ও বাড়ি করে দশবাড়ি ছড়িয়েছে, আর দুদিন পর দশগ্রামে। বাবা কাছে আসেন না,মা চোখের জল মুছেন। দেয়ালের পাশে কত কথা হয়,কখনো ফিসফিসিয়ে আবার কখনো বা হাক ডাক ভুলে- তোমরা যাই বলো আমার আগে থেকেই মনে হচ্ছিল এ মেয়ে বংশের চুনকালি মাখবেই।

ওর কথা আর ঠোটের কিলবিল হাসিতে যখন পাশের বাড়ি ছাড়িয়ে যেতো,তখনই বুঝেছি এই মেয়ে হবে বজ্জাতি। আরও দুচারজন চেনা গলার সহমতের কুটিল হাসি, এ মেয়ে পোড়ামুখো, সর্বনাশী। আমার হাসি আর পাশের ঘরও ছাড়ায় না, বজ্জাতি হয়েছে আজ লজ্জাবতী। ঘরের কোনে সে হাসির আত্নহতি,কখনো না আনমনে হেসে ফেলি,আমি যেন নির্লজ্জা,পাপিষ্ঠা, অসতী।

স্কুলে শিক্ষকরা বুঝালেন, ফার্স্টগার্ল ছিলে বটে, কিন্ত যা গিয়েছে রটে এ বেলায় আমাদের ক্ষতি টা আর নাইবা করলে। নানার বাড়িতেও এ খবর পৌঁছেছে ঝড়ের বেগে,বাকী আত্নীয়রাও এতক্ষণে হয়তো বাকী নেই। না,এই চার দেয়াল ছাড়া যাওয়ার জায়গা হলো না এই উঠতি যৌবনের এক পাপিষ্ঠা যুবতির। দিন যায়, মা চোখ মুছেন। বাবাকেও আজকাল খুব দেখা যায় না।

আজকাল 'এক ঘরে' হবার রব উঠেছে এই অসতীর বাড়ি। চাচা-চাচিও আর এ বাড়ির ত্রিসীমার ছায়া মাড়ান না সমাজে অশুচি হবার ভয়ে। আদর্শ শিখতে আসা রিতা-রাতুলেরও আজকাল দেখা মেলে না। অসতীর কোন আদর্শ নেই। অসতীর সাথে মিশলে অসতীই তো হওয়ার কথা। বাদ যায়নি পাশের মসজিদের পেটমোটা কাটমোল্লার ফতুয়া। অসতী বা দৈত্যপুত্রের জানাজা হলেও তিনি নাপাকি লাগাতে চান না সাদা জোব্বায়, আর বেচে গেলে আরও আসবে নতুন ফতুয়া ধর্ম রক্ষায়।

আমার প্রিয় কবিতা লেখার খাতা,ছবি আকার রং তুলি, আর পড়ার চেয়ার টেবিল আর বইয়ের তাক,স্কুলে গান,কবিতার প্রথম পুরস্কারের ক্রেস্ট। সৌখিন সুপিচের জায়গাটাই এখন জেলখানার চারদেয়ালে বন্দি, অসতীর দৃষ্টি জানালার সামনে কামিনি গাছটাও পেরোয় না। কবিতার খাতা নেই,শুধু পেন্সিলে স্কেচ করি এক অদ্ভুত শিশুর। পেটে ব্যথা বাড়ছে,হয়তো দৈত্যপুত্র নড়ছে, থাক কীভাবে বলা যায় পাপের হুংকার,সমাজের জঞ্জাল।

চোখ বুঝে দাত কামড়ে আছি, মরি কিবা বাঁচি। স্রষ্টা কী চাইছেন সেটাও আমার কাছে পেটের সন্তানের মতই অস্পষ্ট। অসতী নাকি দ্বিতীয় মেরি? কেউ এসে বললেন,ছেলেটা কে? আমিও তো তাই ভাবি কোন ছেলেটা? ডুবে ডুবে জল আর এমন নেকামো। মা বাবার কথা একেবারো ভাবলি না, এ মুখ দেখাস কী করে? বললাম, কী ভাববো তাদের জন্য? ... হাতে চুনের বাটি ছুড়ে ফেলে দু লাফে অদৃশ্য হলেন সেজো খালা।

আমার নির্বাক হাসি, চোখের জলে ভাসি না, চোখের জল শুকিয়ে গেছে আরও কয়েক সপ্তাহ আগেই। অমল বাবুর দেয়া তিন মাস পাড় হয়ে যাবে, পৃথিবী আধার করে আসবে এক পিশাচী শিশু। যে হবে শিংওয়ালা এক চোখা দৈত্যের ওয়ারিশ খাবলে খাবে সমাজ, ধর্ম ও আমাদের পৃথিবীর সভ্যতা। তার মৃত প্রসবে হতে পারে কিছুটা মুক্তি, ছি ছি করা সমাজ ও ধর্ম পাবে তৃপ্তি। আর আমার মৃত্যুতে হবে শিয়াল-কুকুরের সৎকার। না, দিন বাড়লেও পেট ততটা বাড়েনি।

সেই তিনমাস পাড় কিন্ত দৈত্য দেখার তর সইছে না কারও আর আমারও। মা ও এতদিনে কঠিন,সয়ে উঠেছেন মানুষের ভয়। বাবা চাননি এই সুখ্যাতি সহরে ছড়াক,তাই ব্যথার ট্যাবলেট সেই অমল বাবুর। কিন্ত আজ যে সে ব্যথা পেটের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে গেছে,আর্তনাদে ছড়িয়ে গেছে শ্বাস।

জ্ঞান ফিরে অসতী নিজেকে আবিষ্কার এক আধুনিক নগর হাসপাতালে। মায়ের আর্তনাদ আরও বেশি,তবে কি মৃত দৈত্যের জন্ম দিয়েছে সে। না, তাহলে তো আনন্দে আত্মহারা আত্মহত্যায়। পেট কাটা হয়েছে, সেলাই সাজিয়েছে চুলের বেনুনির মত, কত্তদিন বেনী করা হয়না অসতীর। স্কুলে যাওয়ার আগে মা করে দিতেন। কমল বাবু সব জেনে জানালেন হত্যা করেছেন একটি জীবন, আফসোস আর দু,মাস আগে হলেও... এখন বড়জোর আর তিন মাস।

মায়ের সাথে এবার কঠিন হৃদয়ের বাবার চিৎকার। স্রষ্টার হিসেব চমৎকার। অমল বাবুর তিনমাসের পর এবার কমল বাবুর তিন মাস। তিন মাস পর... শুনেছি, অসতীও হেসেছিল। অমল বাবুর মত কমল বাবুর কথা কিন্ত বিফলে যায়নি,তিন মাসেই কমল বাবুর কথা ফলেছে, সমাজ, ধর্ম আর দেশাচারের পরিবারকে হেসে প্রমাণ করেছে অসতীর সতীত্ব।

অমল বাবুর ঘোষিত শিংওয়ালা দৈত্যের সন্তান অথবা পেটে আসে নি কোন দ্বিতীয় মেরি পুত্র ইসা।
এসেছিল এক সাধারণ টিউমার থেকে তিন মাসে ছড়িয়ে যাওয়া ঢালপালা গজানো এক পাকস্থলী ক্যান্সার। হাতুড়ে অমল বাবু আর সমাজের চোখে যা ছিল অবৈধ, নিষিদ্ধ, দৈত্যপুত্র জারজ সন্তান।

লেখক: কলামিস্ট ও নাট্যাভিনেতা
ইমেইল:[email protected]


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ