বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের শতভাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে

শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর বিষয়গুলোতে জোরালো অবস্থান নিবেন- এটিই কাম্য। আগে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এমন শঙ্কা তৈরি হলে শিক্ষকরা সরকারের ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতেন। বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশকে বাঁচাতে তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। দাবি আদায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষকরা এ আন্দোলন সংগ্রামকে তাদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন।

কিন্তু গত দেড় দশক ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির চিন্তা-ভাবনাই বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের শতভাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে। যেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেই নিতে হবে। এ বিষয়গুলোই উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজের সাথে একান্ত আলাপ চারিতায়। সাক্ষাতকারটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠকের কাছে তুলে ধরা হল-

টিডিসি: কেমন আছেন।
এস এম এ ফায়েজ: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি।

টিডিসি: শিক্ষক রাজনীতির পটভূমি নিয়ে কিছু বলুন...
এস এম এ ফায়েজ: বর্তমান সময়ের শিক্ষক রাজনীতি ও আগের শিক্ষক রাজনীতির মধ্যে এখন অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুরুর দিকের শিক্ষক রাজনীতি ছিল দেশ ও জাতির জন্য। ওই সময় শিক্ষকরা দেশের ও মানুষের স্বার্থে সরকার বিরোধী অবস্থান নিতে কুন্ঠাবোধ করত না। কারণ, বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে সরকারের অনেক ইস্যু বিশ্ববিদ্যালয়কে স্পর্শ করার পাশাপাশি দেশকে স্পর্শ করত। যার কারণে শিক্ষকরা সরকারের বিরোধিতা করত। শিক্ষকরা এ বিরোধিতাকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করত, যার ফলশ্রুতিতে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত হত। যেটি বর্তমানে হচ্ছে না। রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর বিষয়গুলোতে জোরালো অবস্থান নেয়া উচিত শিক্ষকদের। কিন্তু গত এক দশক ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির চিন্তা-ভাবনাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ অতিমাত্রায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেটি পূর্বে ছিল না। গত তিন চার বছর যাবৎ এর মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য হারানোর পাশাপাশি শিক্ষার মানও হারাবে।

টিডিসি: বর্তমান শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে শুরুর দিকের শিক্ষক রাজনীতির পার্থক্যটা আপনি কীভাবে দেখছেন?
এস এম এ ফায়েজ: শিক্ষক রাজনীতির শুরুর দিকটায় শিক্ষকরা ব্যক্তি-স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাজনীতি করতেন না। কিন্তু বিষয়টি বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। পূর্বে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ প্রাধান্য পেত না। কিন্তু বর্তমানে সেটি অতিমাত্রায় দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়গুলোই পূর্বের শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান শিক্ষক রাজনীতির বড় পার্থক্য। আর এ কারনেই মেধার প্রমাণ দেয়ার পরও শিক্ষার্থীদেরকে বাধ্য হয়ে রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে হচ্ছে। আরেকটা বিষয় উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সব সময় মনে রাখতে হবে যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ না মেধাকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। আমি আশা করছি নতুন দিনের শিক্ষক নেতারা এ বিষয়টিতে নজর দিবেন।

টিডিসি: ‘দেশের উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষক রাজনীতির ভূমিকা’ আপনি এ বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
এস এম এ ফায়েজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যারা বিশ্বমানের শিক্ষা দিতে সক্ষম। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে তারা সেটি পারছে না। আমার মনে হয় গবেষণা কার্যক্রম শিক্ষা কার্যক্রমকে খুব সহজেই বিশ্বমানে পৌঁছে দিতে পারে। অথচ আমাদের দেশে পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ নেই। বাজেটের স্বল্পতা এখানে প্রবল। কিন্তু এসব সমস্যা মোকাবেলা করেও আমরা উচ্চ শিক্ষায় সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও আমাদের দেশে শিক্ষকরা সীমিত বেতন কাঠামোর কারণে স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। আর অস্বচ্ছল জীবন নিয়ে গবেষণা কার্যক্রমে মনোযোগ দেয়া অনেক কঠিন বিষয়। উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্রদেরও রাজনৈতিক দলাদলির উর্ধ্বে থেকে নিজেদের জীবন সাজাতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে না- এ বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উপর অর্পিত দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা উচিত। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি আমরা সেটি না পারি, তবে আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের বিবেকের কাছে অপরাধী থেকে যাব।

টিডিসি: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়, ‘মেধার মূল্যায়নে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও অনেক নবীন শিক্ষক আবাসন সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন’। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
এস এম এ ফায়েজ: এটা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। আমার মনে হয় এ বিষয়টি থেকে উত্তর পেতে সবার সহযোগীতা প্রয়োজন। যদি বিস্তারিত বলি তবে এভাবে বলতে হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হলগুলোতে মেধা ও ত্যাগের মূল্য না দিয়ে দলীয় বিবেচনায় প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়। যার কারণে নতুন শিক্ষকরা প্রাথমিকভাবে হাউজ টিউটর ও পরে প্রাধ্যক্ষ হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। আগে দলীয় বিবেচনা ছাড়াও অনেক প্রাধ্যক্ষ ও হাউজ টিউটর নিয়োগের নজির ছিল। কিন্তু বর্তমানে সে ধরনের একটি নজিরও চোখে পড়ে না। তাই যদি মেধার ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেয়া হয় তবে নবীন শিক্ষকরা শিক্ষকতায় মনোযোগ দিতে পারবেন।

টিডিসি: আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে বর্তমানে যে সংকটময় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে- তা থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেতারা কী ভূমিকা রাখতে পারেন?
এস এম এ ফায়েজ: সবকিছুর উর্ধ্বে থেকে আমরা যদি নিজেদেরকে শিক্ষক হিসেবে ভাবতে পারতাম, তবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমরা ভূমিকা রাখতে পারতাম। সে ক্ষেত্রে দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের কথা শুনত। আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের প্রতি সবার আস্থা থাকত। যেমন পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে সর্বশেষ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমান বুদ্ধিজীবী শিক্ষকদের নিরপেক্ষ মতামত দেয়ার পরও সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সবমিলিয়ে আমাদের প্রতি দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা কমে গেছে। যার ফলে ভয়াবহ জাতীয় এই সংকট উত্তরণে রাজনীতিবিদদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একজন শিক্ষক একটি দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য দলের কাছে নয়। তাই জাতির এ সংকটময় মুহূর্তে শিক্ষকদের কিছুই করার নেই।

টিডিসি: ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে অধিক মনযোগী’ এ ধরনের একটি অভিযোগ সর্বমহলে শোনা যায়। এ ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এস এম এ ফায়েজ: হাতেগোনা কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকরাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে সেটি তারা আর্থিক অস্বচ্ছলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য করে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শিক্ষাদানের ব্যাপারে শিক্ষকদের অনেক বেশী কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। তবে একটা বিষয়, যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও ঠিকমত ক্লাস নেন। তবে দু একজন ভিন্ন থাকতেও পারেন।

টিডিসি: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘৭৩ এর অধ্যাদেশের কোন পরিবর্তন কি জরুরী। না কি কিছু ক্ষেত্রে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন করা উচিত। এ ব্যাপারে আপনার কি কোন সুচিন্তিত মতামত আছে?
এস এম এ ফায়েজ: ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ অত্যন্ত গণতান্ত্রিক। একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সামগ্রিক বিষয় এতে প্রতিফলিত হয়েছে। আমার মনে হয়, এটা এখন পরিবর্তনের খুব বেশি প্রয়োজন নেই বলেই আমার মনে হয়। তবে এর সঠিক বাস্তবায়নটা জরুরী।

টিডিসি: ক্যাম্পাস ও হলে শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষক নেতারা কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে আপনি মনে করেন?
এস এম এ ফায়েজ: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের সমান দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো উচিত। এ ক্ষেত্রে উপাচার্যকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। যাতে সব মতের শিক্ষার্থীরাই হলে থাকার সুযোগ পায়।

টিডিসি: শিক্ষকতা পেশা ও শিক্ষক রাজনীতিতে যারা নতুনভাবে প্রবেশ করছেন তাদের জন্য আপনার কি কোনো পরামর্শ আছে?
এস এম এ ফায়েজ: নতুন করে যারা শিক্ষকতা পেশায় আসেন তাদের রাজনৈতিক একটা পরিচয় থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেটিই যেন তার শিক্ষক পরিচয়ের উর্ধ্বে না ওঠে। এ বিষয়টিতে শিক্ষকদেরকে সজাগ থাকতে হবে। আর এ বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সিনিয়র শিক্ষকদেরকেই নিতে হবে।

টিডিসি: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোন বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
এস এম এ ফায়েজ: বর্তমানে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক উপাচার্যই রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পান। কিন্তু পদে সমাসীন হওয়ার পর পরই তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে গিয়ে কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সকলের জন্য যা কল্যাণকর, সেটিই তাকে সম্পাদন করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ৯০ ভাগ অর্থ সরকার থেকে আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে। যেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যকে নিতে হবে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অসামান্য অবদান রেখেছে, যার নজির বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনন্য বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনা করে ও এর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সকলের কাজ করা উচিত।

টিডিসি: আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়ার জন্য‘দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসে’র পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।
এস এম এ ফায়েজ: আপনাকেও ধন্যবাদ, সাথে পাঠকদেরও। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সফলতা কামনা করছি।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ