সাক্ষাৎকারে অধ্যক্ষ আবুল হাসান

চট্টগ্রাম কলেজকে বিশ্বমানের গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছি

প্রফেসর মো: আবুল হাসান  © টিডিসি ফটো

প্রফেসর মো: আবুল হাসান। দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ। গত ২৪ মার্চ জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ২০১৯ সালে জেলা পর্যায়ে চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন প্রফেসর মো: আবুল হাসান। গত বছরের ২১ অক্টোবর এ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন তিনি। চলতি বছরে ১৫০ বছরে পদার্পণ করা এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সর্বত্র জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নানা অগ্রগতি, সাফল্য ও কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অধ্যক্ষ প্রফেসর মো: আবুল হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের চট্টগ্রাম কলেজ প্রতিনিধি এম ওমর ফারুক আজাদ-


টিডিসি: কেমন আছেন।
মো: আবুল হাসান: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি।

টিডিসি: জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হওয়ায় কেমন অনুভূতি আপনার?
মো: আবুল হাসান: এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এ মহান কৃতিত্বের জন্য আমি গর্বিত আর এই গর্বের অংশীদার চট্টগ্রাম কলেজের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষকমন্ডলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। বিরাট এই অর্জনের জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়ার পাশাপাশি আমি মনে করি এতে করে আমার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। এই কলেজের জন্য কিছু করে যেতে চাই কারণ এই কলেজে আমার দাদা, বাবা, আমি ও আমার মেয়ে চার প্রজন্ম লেখাপড়া করেছে।  তাই এই কলেজের কাছে আমি আজন্ম ঋণী। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ সবার কাছে সহযোগিতা চাইবো যাতে এই কলেজের লেখাপড়ার মান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারি।

টিডিসি: চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন সময়ের কোন স্মৃতি কি আপনার মনে আছে?
মো: আবুল হাসান: আমি এই কলেজের পাঁচ বছর শিক্ষার্থী ছিলাম।তখন বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করতাম। এইচএসসি থেকে সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন আমি আর আমার বন্ধু (শোয়েব যিনি এখন ইংরেজী বিভাগের প্রফেসর) একটি দেয়ালিকা বের করি শেকসপিয়রকে নিয়ে। ইংরেজি এই দেয়ালিকার নাম ‘এভর্ণ’। যখন অনার্সে পড়তাম তখন থেকে নিয়মিত শেকসপিয়র ডে, মিলটনস ডে পালন করতাম।

টিডিসি: এবারের বইমেলায় আপনার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলো। আপনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
মো: আবুল হাসান: আমি ছোট থেকেই লেখালেখি করছি। কারণ আমার বাবাও সাহিত্যিক ও কবি ছিলেন। এবারের বইমেলায় ‘সোনার মাটি’ নামে আমার একটি মৌলিক কবিতার বই বের হয়েছিলো। এটি ছিল দ্বিতীয় গ্রন্থ। এর আগে প্রথম গ্রন্থটি ছিল পারিবারিক যৌথ প্রকাশনা। এছাড়াও আমি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার। ভবিষ্যতেও সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।

টিডিসি: আপনার অধ্যাপনা জীবনের অর্জন ও সম্মাননা সম্পর্কে যদি বলতেন।
মো: আবুল হাসান: আমি ২০১৭ সালে ঢাকার ‘একুশ সংসদ’ থেকে শিক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এওয়ার্ড, ইঞ্জিনিয়ার খালেক ফাউন্ডেশন থেকে অধ্যক্ষ রওশন আকতার হানিফ পদক লাভ করি। এছাড়াও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে ট্রেনিং করে এসেছি-এসব আমি জীবনের অর্জন মনে করি।

টিডিসি: চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাবার পর আপনি কি কি ভুমিকা রেখেছেন। তার কয়েকটি যদি বলতেন? 
মো: আবুল হাসান: আমি প্রথমে এসেই ‘প্রিন্সিপাল অনার এওয়ার্ড’ ঘোষণা করেছি। আমাদের কলেজে যেসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মার্কস পাবে তাদের এই এওয়ার্ড দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম। অনেক শিক্ষার্থী এখন পরীক্ষায় খুব ভালো করছে এবং সর্বোচ্চ মার্কস এর জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতাও শুরু করে দিয়েছে। তাছাড়া এ বছরের জুনের দিকে চট্টগ্রাম কলেজের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। তার মধ্যে ‘সোনালী ঐতিহ্য’ নামে একটি ম্যাগাজিন ও ‘আয়না’ নামে একটি এলবাম বের করছি। এ উপলক্ষে ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর একটি ম্যুরাল ও প্রধান ফটকের পাশে একটি ফোয়ারা স্থাপন করা হবে। আর কলেজের কিছু কিছু জায়গায় আগে ময়লা জমে থাকতো। আমিমি সেগুলি পরিষ্কার করে বিভিন্ন জায়গায় বসার জন্য টাইলস ফিটিং সিড়ি ও নান্দনিক বেঞ্চ তৈরি করে দিয়েছি যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে বসে পড়াশোনা ও গ্রুপ স্টাডি করতে পারে। আমি আসার পর ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশের লক্ষে অনেক ক্লাব চালু করেছি তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-ফটোগ্রাফি ক্লাব, ড্রামা ক্লাব, আবৃত্তি ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব। আমার সহকর্মীরা এসব ক্লাবগুলো এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

টিডিসি: একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে ও ভাষা সংগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজের অবদান কেমন ছিলো?
মো: আবুল হাসান: সকল আন্দোলন সংগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজের অবদান রয়েছে। যদি ভাষা আন্দোলনের কথা বলি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার অধ্যক্ষ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইসহাক যিনি বাংলা কলেজের প্রতিষ্টাতা ছিলেন। ৫২'র সময় তিনি এই কলেজের ছাত্র ছিলেন।  এছাড়াও তিনি তমদ্দুন মজলিসের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ পোস্টার লেখার কারণে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কলেজ অধ্যক্ষকে চার্জ করায় শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইসহাককে বহিষ্কার হতে হয়েছিলো। এছাড়াও এম. এ আজিজ যিনি চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রতিভা মুৎসুদ্দী যিনি ২০০২ সালে শিক্ষাবিদ হিসেবে একুশে পদক লাভ করেছিলেন, মাহবুবুল আলম চৌধুরী যিনি ততকালীন পুর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর চট্টগ্রাম কলেজে এসে বক্তৃতা দানকালে আরবী হরফে বাংলা প্রচলনের কথা বললে এর প্রতিবাদ করে কলেজ ছেড়েছিলেন এরা সবাই এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়াও ৭১’ এর স্বাধীনতা সংগ্রামেও এই কলেজের অনেক ছাত্র-ছাত্রী সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রণ করেছিলেন।

টিডিসি: প্রায় চার বছর ধরে কলেজের হোস্টেল বন্ধ থাকায় মফস্বল থেকে আসা হতদারিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব হোস্টেল পুনরায় চালু করার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা?
মো: আবুল হাসান: চট্টগ্রাম কলেজ একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।  তাই চট্টগ্রাম বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদের এখানে পড়ার ইচ্ছে থাকে ।  কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যখন তারা  দেখে হোস্টেল বন্ধ তখন অনেকে হতাশার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র মেধাবীরা শিক্ষার্থীরা।যারা বাইরে মেসে থেকে লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয়। সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টারমহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে আসলে এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। এ বছরের ইন্টারমিডিয়েট ভর্তির আগেই হোস্টেলগুলো খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।

টিডিসি: ডাকসু নির্বাচনের পর দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্টানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদ নিয়ে কোন আলোচনা হচ্ছে কি?
মো: আবুল হাসান: ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ছাত্র রাজনীতির একটা স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় চাকসুও হবে। যোগ্য নেতৃত্ব তৈরী করতে শুধু ডাকসু আর চাকসু নির্বাচন নয়, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। চাকসু নির্বাচনের পরপরই আমরাও কলেজ ছাত্র সংসদ আয়োজনের প্রস্তুতি নিব।

টিডিসি: চট্টগ্রাম কলেজের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আপনার কর্মপরিকল্পনা জানতে চাই?
মো: আবুল হাসান: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে আমাদের কলেজ তৃতীয় স্থানে রয়েছে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এটাকে উন্নীত করে প্রথম অবস্থানে নিয়ে যাওয়ায় আমার প্রথম তার্গেট। তাছাড়া কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও ছাত্র-ছাত্রীদের স্কীল ডেভেলপ করার মাধ্যমে চট্টগ্রাম কলেজকে বিশ্বমানের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছি।

টিডিসি: দীর্ঘ দেড়শো বছরের প্রাচীন চট্টগ্রাম কলেজের ইতিহাস ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে আপনার পরিকল্পনা কি।
মো: আবুল হাসান: অবশ্যই পরিকল্পনা আছে। আমরা একটা আর্কাইভ করবো। পুরোনো অধ্যক্ষ যেখানে বসতেন সে বিশাল রুমে আর্কাইভ করে ভাষা আন্দোলন হতে নিয়ে ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধ, চট্টগ্রাম কলেজের দেড়শো বছরের ইতিহাস ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্য সে আর্কাইভে রাখার চিন্তা-ভাবনা করছি।

টিডিসি: দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। এর পেছনে কি আপনি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি আছে বলে মনে করেন?
মো: আবুল হাসান: শিক্ষাব্যবস্থার কিছুটা ত্রুটি রয়েছে। কারণ আমাদের দেশে পেশাভিত্তিক শিক্ষাদান হয়না।  যার কারণে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে গিয়ে হিমশিমে পড়ে যায়। এজন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পেশাভিত্তিক করা উচিত। তাছাড়া শিক্ষিত তরুণরা চাইলে অনলাইনে স্কুল খোলে কিংবা বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে পারে। আর আত্মকর্ম সংস্থানে যদি তারা মনোনিবেশ করে আমি মনে করি বেকারত্ব দূর হবে।

টিডিসি: একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কি উপদেশ থাকবে?
মো: আবুল হাসান: তাদের উদ্দেশ্যে বলবো তারাতো চাকরি খুঁজবেনি। কিন্তু চাকরি যদি না পায় তারা যেনো আত্মকর্মসংস্থানের জন্য অনলাইনে কিংবা খামার ব্যবসার মতো সৃজনশীল কিছু করেন। এতে করে বেকারত্ব গুছিয়ে নিজের একটা উপার্জনের রাস্তা খোলার পাশাপাশি দেশ অনেক এগিয়ে যাবে।

টিডিসি: আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়ার জন্য দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।
মো: আবুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ, সাথে পাঠকদেরও। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সফলতা কামনা করছি।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ